ঈদযাত্রায় যে তিন দুর্ঘটনা নাড়িয়ে দিল গোটা দেশকে
ঈদ মানে ঘরে ফেরা, ঈদ মানে প্রিয়জনের সঙ্গে মিলন। কিন্তু চলতি ঈদযাত্রায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া তিনটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আনন্দের এই সময়কে শোকের গভীর ছায়ায় ঢেকে দিয়েছে। নদী, রেললাইন আর নদীপথ তিন জায়গাতেই প্রাণহানির ঘটনা দেশজুড়ে নাড়া দিয়েছে মানুষকে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে রাজধানীর সদরঘাটে। ঈদের আগে বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সদরঘাটের ১৪ নম্বর পন্টুনের কাছে ঢাকা–ইলিশা (ভোলা) রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে একটি লঞ্চ যাত্রী তুলছিল। এ সময় ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট রুটের ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামের একটি লঞ্চ সেটিকে ধাক্কা দেয়। দুটি লঞ্চের সংঘর্ষের ঘটনায় মো. সোহেল (২২) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে।
এ ঘটনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এমভি জাকির সম্রাট–৩ লঞ্চের পেছনের কোণের আঘাতে ‘আসা যাওয়া–৫’ লঞ্চের দুজন যাত্রী পিষ্ট হন। একজনকে পানিতে পড়ে যেতে দেখা যায় এবং অন্যজন লঞ্চের বাইরের অংশে পড়ে থাকেন। পুলিশের কোতোয়ালি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ফজলুল হক জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সোহেলের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার শ্বশুর মিরাজ ফকির এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং শাশুড়ি রুবা ফকির আহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা শিহাব সরকার জানান, দুর্ঘটনার পর দুজন ডুবুরি নদীতে নেমে নিখোঁজের সন্ধান করলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। রাত হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে এবং পরদিন সকালে আবার অনুসন্ধান শুরু করার কথা জানানো হয়েছে।
ঈদযাত্রার আরেকটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায়। শনিবার ঈদের রাত তিনটার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লেভেলক্রসিংয়ে ‘মামুন স্পেশাল’ নামের যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে একটি ট্রেনের সংঘর্ষে নারী-পুরুষ-শিশুসহ ১২ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও ২০ জন। বাসটি প্রায় এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যায় ট্রেনটি।
আরও পড়ুন: একের পর এক নদী থেকে তোলা হচ্ছে মরদেহ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের নামাজ শেষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্বজনদের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলেন একদল মানুষ। রাত তিনটার দিকে পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিং উন্মুক্ত দেখে বাসটি রেললাইনের ওপর উঠে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি মেইল ট্রেনের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়। বাসের অধিকাংশ যাত্রী সে সময় ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তাদের চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। ঘটনাস্থলেই ১২ জন নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মো. বাবুল চৌধুরী (৫৩), নজরুল ইসলাম রায়হান (৩৩), ঝিনাইদহের লাইজু আক্তার (২৬) এবং তার দুই শিশু সন্তান খাদিজা আক্তার (৬) ও মরিয়ম আক্তার (৪), যশোরের সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও তার স্ত্রী কোহিনূর বেগম (৫৫), চাঁদপুরের তাজুল ইসলাম (৬৮), লক্ষ্মীপুরের সায়েদা (৯), ফসিয়ার রহমান (২৬), সোহেল রানা (৪৬)সহ আরও অনেকে।
এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পটি ঝিনাইদহের মহেশপুরের পিন্টু হোসেনের। ঈদের দিন স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হন তিনি। পরে ব্যক্তিগত কারণে ঢাকায় নেমে গেলেও স্ত্রী লাইজু আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে একই বাসে থেকে যান। সেই বাসই কুমিল্লায় ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান লাইজু ও তার দুই কন্যা সন্তান। জীবনের শুরুতেই মা হারানো পিন্টু এবার হারালেন স্ত্রী ও দুই সন্তানকেও। পরিবহণে কাজ করা এই মানুষটি এখন বেঁচে আছেন শুধু স্মৃতি নিয়ে।
ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায়। বুধবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটিতে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে মাত্র সাতজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন।
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সাহায্যে রাতে বাসটি টেনে তোলার কাজ শুরু হয়। বাসের দরজাগুলো ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে এবং ভেতর থেকে স্কুলব্যাগ, জুতা, ভ্যানিটি ব্যাগসহ যাত্রীদের ব্যক্তিগত সামগ্রী ভেসে উঠতে থাকে। রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ জানান, এখন পর্যন্ত দুই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৬ জন পুরুষ রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রিয়তমার মেহেদি রাঙা হাত, আদরের সন্তান—দিন শেষে আমাদের লাশের দাম ২৫ হাজার
নিহতদের মধ্যে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী জোহরা অন্তি ও তার স্বামী সৌম্য, বিউএফটির শিক্ষার্থী সাইফ আহমেদ ও তার স্ত্রী, সিআরপির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএইচপিআইয়ের শিক্ষার্থী নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সোমা ও তাদের সন্তানসহ আরও অনেকে রয়েছেন। একই দুর্ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান এবং তার ভাগ্নের মরদেহও পরে উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার সময় একই বাসে রাইয়ানের মা, বড় বোন ও ভাগ্নে ছিলেন। এর আগে তার মায়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং বড় বোন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন।
বাসের এক যাত্রী আব্দুল আজিজুল জানান, তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও তার স্ত্রী ও সন্তান এখনও নিখোঁজ। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন, উদ্ধারকারী জাহাজ ও ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করেছে। তাদের দাবি, সময়মতো উদ্ধার অভিযান শুরু হলে প্রাণহানি আরও কম হতে পারত।
নদীপথ, রেললাইন ও ফেরিঘাট একই ঈদযাত্রায় তিনটি দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের মানুষের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ ঘরে ফিরতে পারেননি, কেউ ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে, আর কেউ বেঁচে থেকেও হারিয়েছেন জীবনের সবকিছু।