কত টাকা দেবেন ঈদ সালামি, কত হওয়া উচিত?
ঈদুল মানে আনন্দ, উৎসব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলনমেলা। আর এই আনন্দের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ঈদি বা সালামি। নতুন পোশাক পরে ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, তারপর বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম—আর তার পরেই শুরু হয় ঈদির প্রতীক্ষা। ছোটদের কাছে ঈদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলোর একটি যেন এই সালামি পাওয়াই।
ঐতিহ্যগতভাবে ঈদ সালামির প্রচলন বহু পুরোনো। বড়রা ছোটদের প্রতি ভালোবাসা ও স্নেহের নিদর্শন হিসেবে অর্থ প্রদান করেন, যাকে বলা হয় ঈদি বা সালামি। সময় বদলেছে, জীবনযাত্রার ধরণ পাল্টেছে, কিন্তু এই প্রথা এখনও অটুট। বরং আধুনিক সময়েও ঈদ সালামির আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। এখনো ছোটরা ঈদের দিন বড়দের কাছে ভিড় করে, সালামি নেওয়ার আশায়।
শুধু ছোটরাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে বয়সে বড় হলেও সম্পর্কের দিক থেকে ‘ছোট’ হলে সালামি পাওয়ার রীতিও রয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ও অবস্থানই নির্ধারণ করে কে কাকে সালামি দেবে। ফলে ঈদ সালামি শুধু অর্থ লেনদেন নয়, এটি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
ঈদের দিন আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি ঘোরা, সেমাই-পায়েসসহ নানা মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন—সবকিছুর মধ্যেই সালামি দেওয়া-নেওয়ার একটি বিশেষ আবহ তৈরি হয়। অনেকের কাছে এটি ঈদের আনন্দের অন্যতম মূল অনুষঙ্গ।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—ঈদ সালামি আসলে কত হওয়া উচিত?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। কারণ, সালামির পরিমাণ নির্ভর করে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর। একসময় যেখানে ৫ বা ১০ টাকার সালামিতেই শিশুদের মুখে হাসি ফুটত, সেখানে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই অঙ্ক বেড়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী ছোটদের জন্য ৫০ টাকা, আর তুলনামূলক কম জুনিয়রদের ক্ষেত্রে ১০০, ২০০, ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকা পর্যন্ত সালামি দেওয়া যেতে পারে। তবে টাকার পরিমাণ কম হলেও যদি নতুন নোট হয়, তাহলে সেটাই বেশি আনন্দ দেয়। এ ক্ষেত্রে ১০/২০/৫০টাকা দুই-তিন নতুন নোটই যথেষ্ট।’
দেশের প্রথম সারির একটি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত শামীম হক বলেন, ‘ঈদ এলেই ছোট-বড় সবাইকে সালামি দিতে হয়। এতে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি কাজ করে। টাকার পরিমাণ কম হোক বা বেশি—নতুন নোট পেলেই সবাই খুশি হয়।’
একই কথা বলেন ব্যাংক কর্মকর্তা আসিফ নিয়াজ। তিনি জানান, ‘ছোটবেলায় ১০ টাকা সালামি পেয়ে আমরা অনেক খুশি হতাম। কিন্তু এখন ৫০০ টাকা দিয়েও অনেক সময় সন্তুষ্টি আসে না। অনেক ক্ষেত্রে এক হাজার টাকাও দিতে হয়। তবে টাকার অঙ্ক যাই হোক, নতুন টাকা হলে আনন্দটা অন্যরকম হয়।’
অন্যদিকে, ছোটদের কাছে ঈদ সালামির আনন্দ একেবারেই আলাদা। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সারিয়া ইসলাম সাদিয়া জানায়, ‘ঈদের দিন আব্বু-আম্মু, নানা-নানি সবার কাছ থেকে সালামি পাই। সেই টাকা দিয়ে ঘুরতে যাই। ঈদ সালামি পেতে আমার খুব ভালো লাগে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদ সালামির মূল উদ্দেশ্য অর্থের পরিমাণ নয়, বরং ভালোবাসা ও সম্পর্কের বন্ধনকে দৃঢ় করা। তাই সালামির অঙ্ক নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা বা চাপ তৈরি না করে, সামর্থ্য অনুযায়ী আন্তরিকতার সঙ্গে দেওয়া-নেওয়াই হওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সত্যি বলতে ঈদ সালামি আসলে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কে বাঁধা নয়। এটি একটি অনুভূতি—ভালোবাসা, স্নেহ আর আনন্দ ভাগাভাগির এক সুন্দর মাধ্যম। টাকার অঙ্ক ছোট হোক বা বড়, ঈদের আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে এই বিনিময়ের আন্তরিকতায়।