কেউ ১২ বছর, কেউ ১৫— নায়েমেই যুগ পার করছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা
জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন) পদে কর্মরত রয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর কবীর। ২০১০ সালের ১৯ ডিসেম্বর নায়েমে যোগদান করেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৫ বছর। তবুও তিনি এখনো নায়েমেই রয়েছেন। সরকারি চাকরিবিধি বলছে, ৩ বছর পর বদলি বাধ্যতামূলক। তবে নায়েম ঢাকা কার্যালয়ে যোগদানের পর এখানেই খুঁটি গেড়েছেন এ কর্মকর্তা।
কীভাবে এত দীর্ঘ সময় নায়েমে রয়েছেন; সেই প্রশ্ন করা হলে মো. জাহাঙ্গীর কবির কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংস্থাটির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. ওয়াসীম মো: মেজবাহুল হকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন এ কর্মকর্তা।
শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক সাবিহা ইয়াসমিন নায়েমের সহকারী পরিচালক (কমন সার্ভিস) পদে কর্মরত রয়েছেন। ২০১৩ সালের ১৪ মে নায়েমে পদায়ন করা হয় তাকে। এরপর কেটে গেছে ১৩ বছর। এখনও নায়েম ঢাকা কার্যালয়েই কর্মরত রয়েছেন তিনি। ১৩ বছর ধরে নায়েম ঢাকা কার্যালয়ে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবিহা ইয়াসমিন জানান, তার ঠান্ডা লেগেছে। তিনি কথা বলতে পারছেন না। পরে কল করে কথা বলবেন।
শুধু এই দুই কর্মকর্তাই নয়; সরকারি চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে দীর্ঘদিন ধরে নায়েম ঢাকা কার্যালয়ে চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির আরও ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় চাকরির ফলে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, তথ্য গোপন করে এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে নায়েমে খুঁটি গেড়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের এসব কর্মকর্তা।
শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর নায়েমের নানা পদে পরিবর্তন এসেছে। তবে বছরের পর বছর ধরে নায়েমে কর্মরত ছিলেন; এমন অনেক কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। এমনকি নায়েমে যোগদানের পর কয়েকজন কর্মকর্তা এক যুগেরও বেশি সময় পার করেছেন। সরকারি চাকরিবিধি এবং শিক্ষা ক্যাডারদের বদলি-পাদায়ন নীতিমালা উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ধরে এসব কর্মকর্তা নায়েমে খুঁটি গেরে বসেছেন। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
‘মাউশিতে সংযুক্তি হিসেবে এখানে কয়েকজন প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য পদেও কয়েকজন রয়েছেন। তবে তারা কীভাবে এতদিন এখানে চাকরি করছেন সে বিষয়টি মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে। কেননা বদলি বা পদায়নের বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখভাল করে।’— প্রফেসর ড. ওয়াসীম মো: মেজবাহুল হক, নায়েম মহাপরিচালক
২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল শিক্ষা কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়ে নীতিমালা ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা একই দপ্তর বা সংস্থায় একনাগাড়ে তিন বছরের বেশি সময় থাকতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, কোনো কর্মকর্তাকে একটি দপ্তর থেকে অন্য কোনো দপ্তর বা সংস্থায় বদলি করা যাবে না। মধ্যবর্তী সময়ে তাকে কলেজে ন্যূনতম দুই বছর চাকরি করতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, একজন কর্মকর্তা সমগ্র চাকরিজীবনে অনধিক তিনবার, তবে ছয় বছরের বেশি সময় কোনো দপ্তর বা সংস্থায় কর্মরত থাকতে পারবেন না। অবশ্য জরুরি প্রয়োজনে সরকার কোনো কর্মকর্তাকে যে কোনো সময় যে কোনো দপ্তরে বদলি করতে পারবে। তবে এসব নিয়ম কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। নায়েম কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ বিধির কোনো প্রয়োগই হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে নায়েমের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘নায়েম দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে মূলত দীর্ঘদিন ধরে থাকা কর্মকর্তাদের কারণে। তারা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িয়ে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি নিয়ে তদন্তও হয়েছে। তবে কোনো এক কারণে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নায়েমে ১১ বছর ১৭ দিন কর্মরত থাকার পর অবসরোত্তর ছুটি ভোগ করছেন প্রফেসর স্বপন কুমার সাহা। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি নায়েমের ঢাকা কার্যালয়ে যোগদান করেছিলেন। এরপর এখান থেকেই পিআরএল-এ গেছেন এ কর্মকর্তা।
প্রফেসর মনোয়ারা খাতুন নায়েমে যোগ দিয়েছেন ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। দর্শনের এ অধ্যাপক সংযুক্তি হিসেবে নায়েমে রয়েছেন। দর্শনের এ অধ্যাপক বর্তমানে নায়েমে প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। নায়েম ঢাকা কার্যালয়ে তার চাকরির বয়স হয়েছে ১২ বছর ৬ মাস।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর মনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘বর্তমানে আমি মাউশিতে সংযুক্তি আছি। আমার চাকরির মেয়াদ আর অল্প কিছুদিন। সরকার চাইলে আমাকে বদলি করতে পারে।’ এত বছর কীভাবে এখানে থেকেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার রেখেছে বলেই থেকেছি।’
প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপক রুবাবা রহমান নায়েমের ঢাকা কার্যালয়ে যোগদান করেন ২০১৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। এখানে পদায়নের ৬ বছর ১১ মাস হলেও এখনো ঢাকা কার্যালয়েই কর্মরত রয়েছেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তথ্য গোপন করে থেকেছি কিনা সেটি কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে। এভাবে এতদিন পর এ বিষয়ে কথা বলতে আমি আগ্রহী নই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর মনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘বর্তমানে আমি মাউশিতে সংযুক্তি আছি। আমার চাকরির মেয়াদ আর অল্প কিছুদিন। সরকার চাইলে আমাকে বদলি করতে পারে।’ এত বছর কীভাবে এখানে থেকেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার রেখেছে বলেই থেকেছি।’
প্রাণীবিদ্যার প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আসমা আক্তার খাতুন ২০১০ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি নায়েমে কর্মরত রয়েছেন। ১৫ বছর ২ মাস ধরে তিনি নায়েমে রয়েছেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মো. শওকত আলী খান নায়েমের ঢাকা কার্যালয়ে রয়েছেন ৮ বছর ৫ মাস ধরে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. সাইদুর রহমান কোতোয়াল নায়েমে যোগদান করেন ২০১৪ সালের ২০ মার্চ। সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ে ১১ বছর ৩ মাস ধরে কর্মরত রয়েছেন তিনি। আরেক প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ শামসুন আক্তার সিদ্দিকী নায়েম ভবনে কর্মরত রয়েছেন ১০ বছর ১১ মাস ধরে। তিনি যোগদান করেছিলেন ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর।
শেখ মোহাম্মদ আলী প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ৮ বছর ৬ মাস ধরে নায়েম ভবনে কর্মরত। প্রশাসন ও অর্থ শাখা প্রফেসর ড. শাহ্ মোঃ আমীর আলী ২০২১ সালের ২৮ জুলাই নায়েমে যোগদান করেন। ৪ বছর ১১ মাস ধরে তিনিই নায়েম ভবনেই রয়েছেন। অধ্যাপক মো. সাইদুজ্জামান ৬ বছর ৯ মাস ধরে নায়েমে কর্মরত। এছাড়া প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন শাখার সহকারী পরিচালক গোলাম মাহমুদ ৩ বছর ১১ মাস ধরে নায়েমে কর্মরত রয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নায়েম মহাপরিচালক প্রফেসর ড. ওয়াসীম মো: মেজবাহুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মাউশিতে সংযুক্তি হিসেবে এখানে কয়েকজন প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য পদেও কয়েকজন রয়েছেন। তবে তারা কীভাবে এতদিন এখানে চাকরি করছেন সে বিষয়টি মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে। কেননা বদলি বা পদায়নের বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখভাল করে।’
এ বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।