তিনি নীরব ছিলেন, কিন্তু পৃথিবীকে বলে গেছেন অনেক কথা
কিছু মানুষ কথা বলেন শব্দ দিয়ে, কেউ কেউ লেখেন অক্ষরে। আবার এমন কিছু শিল্পী আছেন, যারা কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেও পৃথিবীকে অনেক কথা বলে যান। ফরাসি মূকাভিনয়শিল্পী মার্সেল মার্সো ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী। তাঁর শরীর ছিল ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি ছিল বাক্য, আর নীরবতা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চারণ।
২০০৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পৃথিবী হারায় মূকাভিনয়ের এই কিংবদন্তিকে। কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু তাঁর শিল্পের মৃত্যু নয়। মার্সেল মার্সো চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট ‘বিপ’ আজও মঞ্চে হাঁটে, থামে, পড়ে যায়, উঠে দাঁড়ায়, ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখে এবং মানুষের অসহায়তা ও আশার গল্প বলে। ‘বিপ’ কোনো নির্দিষ্ট দেশের মানুষ নয়; সে যেন পৃথিবীর সব মানুষের প্রতিনিধি। তাই মার্সোর প্রয়াণ দিবস শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করার দিন-ই নয়; এটি মূকাভিনয়ের শক্তি, সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে ভাবার দিন।
মার্সেল মার্সো এমন এক সময়ে শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন, যখন পৃথিবী যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানবিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন-মানুষের ভাষা অনেক সময় মানুষকে বিভক্ত করে, কিন্তু শরীরের ভাষা মানুষকে একত্র করতে পারে। ভাষা, জাতি, ধর্ম, ভূগোল-এসবের সীমারেখা অতিক্রম করে একজন মানুষের কান্না, হাসি, ভয়, বিস্ময় কিংবা ভালোবাসা অন্য একজন মানুষ বুঝতে পারে।
এই জায়গাতেই মূকাভিনয়ের অসাধারণ শক্তি। মূকাভিনয়ের জন্য কোনো অনুবাদ প্রয়োজন হয় না। একজন শিল্পী যখন অদৃশ্য দেয়াল স্পর্শ করেন, অদৃশ্য দরজা খোলেন, বাতাসের বিরুদ্ধে হাঁটেন কিংবা শূন্যে হারিয়ে যাওয়া কাউকে খোঁজেন-দর্শক তাঁর শরীরের ভাষা পড়তে শুরু করেন। শব্দ না থাকলেও গল্প তৈরি হয়। সংলাপ না থাকলেও অনুভূতি পৌঁছে যায়।
মার্সোর সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্ট চরিত্র ‘বিপ’ যেন এই সার্বজনীন ভাষার প্রতীক। সাদা মুখ, কালো পোশাক, চোখের চারপাশে অভিব্যক্তির তীব্রতা এবং শরীরের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ-‘বিপ’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে মার্সো একজন সাধারণ মানুষের আনন্দ, দুঃখ, একাকিত্ব, স্বপ্ন, ব্যর্থতা ও সংগ্রামকে মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে হাস্যরস যেমন ছিল, তেমনি ছিল গভীর মানবিক বোধ।
মার্সোর শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই-মূকাভিনয় মানে শুধু নীরবে অভিনয় করা নয়; মূকাভিনয় হলো নীরবতার ভেতর অর্থ সৃষ্টি করা। আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে মার্সোর এই দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন চারদিকে শব্দের বিস্ফোরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য বক্তব্য, ছবি, ভিডিও, মন্তব্য ও বিতর্ক আমাদের ঘিরে থাকে। আমরা ক্রমাগত কথা বলছি, কিন্তু সত্যিই কি একে অপরকে শুনছি? তথ্যের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া কি একইভাবে বাড়ছে?
এই প্রশ্নের সামনে মূকাভিনয় আমাদের থামতে শেখায়। মূকাভিনয় শব্দের বিপরীতে নীরবতাকে দাঁড় করায় না; বরং নীরবতার ভেতর একটি বিকল্প ভাষা আবিষ্কার করে। যেখানে একজন শিল্পী কথা না বলেও বলতে পারেন-যুদ্ধ চাই না, হত্যা চাই না, প্রকৃতি ধ্বংস করো না, মানুষকে ঘৃণা করো না, পৃথিবীকে বাঁচাও।
বর্তমান পৃথিবীর যুদ্ধ, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু সংকট, বৈষম্য ও মানবিক সংকটের সময়ে মূকাভিনয় তাই কেবল একটি পারফর্মিং আর্ট নয়; এটি হয়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী মানবিক ও সামাজিক শিল্পভাষা।
একজন মূকাভিনয়শিল্পী যখন যুদ্ধের দৃশ্য শব্দ ছাড়া মঞ্চে তুলে ধরেন, তখন দর্শককে কোনো ভাষা বুঝতে হয় না। যখন একজন শিল্পী গাছ কাটা, নদী দখল কিংবা প্লাস্টিক দূষণের গল্প শরীরের মাধ্যমে প্রকাশ করেন, তখন দর্শকের সামনে একটি দৃশ্যমান প্রশ্ন দাঁড়ায়-আমরা আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে কী করছি?
মার্সোর শিল্প আমাদের শেখায়, প্রতিবাদের জন্য সবসময় উচ্চকণ্ঠ হতে হয় না। কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর প্রতিবাদ উচ্চারিত হয় নিঃশব্দে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও মূকাভিনয়ের এই সম্ভাবনা ব্যাপক। আমাদের সমাজে নানা সংকট আছে-পরিবেশ দূষণ, নদী দখল ও দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য, যুদ্ধবিরোধী চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের সংকট। এসব বিষয় নিয়ে মূকাভিনয় মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে মূকাভিনয় হতে পারে সৃজনশীল চিন্তা, শরীরচর্চা, আত্মপ্রকাশ এবং সামাজিক সচেতনতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
আমাদের দেশে মূকাভিনয়ের দীর্ঘদিনের চর্চা থাকলেও এটি এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগতভাবে যতটা বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ ছিল, ততটা হয়নি। মূকাভিনয়কে অনেক সময় শুধু বিনোদন কিংবা ছোট পরিসরের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার অংশ হিসেবে দেখা হয়। অথচ এটি একটি স্বতন্ত্র পারফর্মিং আর্ট হিসেবে আরও বিস্তৃতভাবে চর্চা ও গবেষণার দাবি রাখে।
মার্সেল মার্সোর সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল মূকাভিনয়কে একটি সুসংগঠিত শিল্পভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি শরীরের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, গতি, স্থিরতা, ভারসাম্য, মুখের অভিব্যক্তি ও কল্পিত বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ককে শিল্পের নির্দিষ্ট ব্যাকরণে পরিণত করেছিলেন। তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-নীরবতারও ব্যাকরণ আছে, শরীরেরও বাক্য আছে, আর মঞ্চে স্থির দাঁড়িয়ে থাকাও কখনো কখনো একটি সম্পূর্ণ সংলাপ হয়ে উঠতে পারে।
আজকের প্রজন্মের মূকাভিনয়শিল্পীদের জন্য মার্সো তাই শুধু একজন অনুসরণীয় শিল্পী নন; তিনি একটি শিল্পদর্শন। তবে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ তাঁর অভিনয়ভঙ্গির অনুকরণ করা নয়। বরং তাঁর কাছ থেকে শিখতে হবে শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা, শরীরের ভাষাকে আয়ত্ত করার কঠোর অনুশীলন, মানুষের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা এবং সময়ের প্রশ্নকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করার সাহস।
মার্সো আমাদের দেখিয়েছেন, শিল্পীর শরীরও একটি প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে। তাঁর নীরবতা ছিল শূন্যতা নয়; বরং অর্থে পরিপূর্ণ। সেই নীরবতার মধ্যে ছিল মানুষের হাসি, কান্না, ক্ষুধা, ভয়, ভালোবাসা, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।
আজ যখন পৃথিবী শব্দে পরিপূর্ণ, তখন হয়তো আমাদের আরও বেশি করে প্রয়োজন সেই নীরবতার, যে নীরবতা আমাদের শুনতে শেখায়।
শাওন মাইম একাডেমির পক্ষ থেকে আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মূকাভিনয়কে শুধু মঞ্চের একটি পরিবেশনা হিসেবে নয়, একটি স্বতন্ত্র শিল্পচর্চা ও মানবিক ভাষা হিসেবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে মূকাভিনয়ের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও সৃজনশীল চর্চার সুযোগ তৈরি করতে হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মূকাভিনয়ের কর্মশালা, প্রদর্শনী, উৎসব এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃত হওয়া দরকার।
মার্সেল মার্সোর প্রয়াণ দিবসে তাই তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হতে পারে তাঁর শিল্পকে জীবন্ত রাখা-নতুন শিল্পী তৈরি করা, নতুন গল্প বলা এবং নীরবতার ভাষায় আমাদের সময়ের সত্যগুলো তুলে ধরা। কারণ, পৃথিবীতে যতদিন মানুষ থাকবে, ততদিন তার অনুভূতি থাকবে। আর অনুভূতির ভাষা সবসময় শব্দের ওপর নির্ভর করে না।
মার্সেল মার্সো আমাদের সেই কথাটিই শিখিয়ে গেছেন।
তিনি নীরব ছিলেন। কিন্তু তাঁর নীরবতা আজও কথা বলে।
আর যতদিন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, ভালোবাসার কথা বলবে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির স্বপ্ন দেখবে এবং একটি সুন্দর পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা করবে-ততদিন মূকাভিনয়ের সেই নীরব ভাষায় মার্সেল মার্সোও আমাদের সঙ্গে কথা বলে যাবেন।
শাহরিয়ার শাওন, মূকাভিনয় শিল্পী
ই-মেইল: shawonmime@gmail.com