০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:১৬

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: স্বৈরতন্ত্রের মুক্তির দিন

রাসেল হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এদিন সিপাহি-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে সংঘটিত এ বিপ্লব দেশের রাজনৈতিক গতিধারায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছরের আগস্টের শেষ দিকে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত হন। অন্যদিকে জেনারেল ওসমানীকে রাষ্ট্রপতির সামরিক উপদেষ্টা করা হয়।

এরই মধ্যে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রেক্ষাপটে এ অভ্যুত্থানের সূচনা হয়। এর প্রথম পর্যায়েই জিয়াউর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি করা হয় এবং সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশে এক আতঙ্কজনক ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়ে বের হওয়া মিছিল এবং ভারতীয় প্রচারমাধ্যমের অতি উৎসাহ ও উচ্ছ্বাসের কারণে জনমনে অভ্যুত্থানটির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ধারণা তৈরি হয়। ১৫ আগস্ট-পূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় জনগণের একাংশের মধ্যে শঙ্কা, ভীতি ও ক্ষোভ দেখা দেয়। ফলে অভ্যুত্থানকারীরা শুরুতেই জনসমর্থন হারান।

অন্যদিকে, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি ক্ষুদ্র অংশের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়ায় বাহিনীর বৃহত্তর অংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে সিপাহিদের মধ্যে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে, বিশেষত সিপাহিদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁকে অপসারণ ও বন্দি করার ঘটনা সিপাহিদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাঁরা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করেন।

৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনে গিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেপ্তার করেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভা বাতিল ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন। ওই দিনই প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিকে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ৬ নভেম্বর গভীর রাতে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ ও ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়ে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। বিপ্লবীরা প্রথমে জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন। এরপর তাঁকে কাঁধে তুলে উল্লাসের মধ্য দিয়ে পুনরায় সেনাপ্রধানের পদে বরণ করে নেওয়া হয়। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ ও তাঁর কয়েকজন অনুসারী।

৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে। সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহণে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব সংহতির নজির সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্নে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ এ দিনের ঘটনাপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সেই থেকে ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

উল্লেখ্য, ৭ নভেম্বরের আগেই খন্দকার মোশতাক আহমদের স্থলে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে নতুন পরিবর্তন আসে। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধানের পদে ফিরে আসার পাশাপাশি উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন।

৭ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ভাষণে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’ তিনি জানান, দেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর ও আনসারসহ সংশ্লিষ্টদের অনুরোধে তাঁকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আশ্বাস দিয়ে তিনি সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, স্থলবন্দর, বিমানবন্দর, নৌবন্দর, যানবাহন ও কলকারখানা স্বাভাবিকভাবে চালু রাখার কথা বলেন।

এর মধ্য দিয়েই জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিষেক ঘটে। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের স্থলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরদিন ২২ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে দেওয়া রেডিও ও টেলিভিশন ভাষণে তিনি অতীতে দেশের বিভিন্ন সময়ে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতির গুরুদায়িত্ব পালনে জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেন। একই ভাষণে তিনি গণতন্ত্রের প্রতি নিজের ও তাঁর সরকারের বিশ্বাসের কথা জানান এবং নির্বাচিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেন। পাশাপাশি দেশের মানুষের মন-মানসিকতা, আশা ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে প্রয়োজনীয় শাসনতান্ত্রিক সংশোধনীর কথা জানান। অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও তাঁর ভাষণে উঠে আসে। একই ভাষণে পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল সংবিধান সংশোধনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সংশোধিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়—সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র।

এই সাংবিধানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রীয় দর্শন, রাজনীতি ও জাতিসত্তাগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে নতুন ধারার সূচনা হয়। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা এ পরিবর্তনের সঙ্গে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার সামঞ্জস্যের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়।

২০২৬ সালের নভেম্বরেও দেশ থেকে স্বৈরাচারের বিপদ পুরোপুরি কেটে যায়নি। প্রতি মুহূর্তে প্রতিবিপ্লবের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে দেশ ও জাতি। নির্বাচিত সরকারকে বিতর্কিত করার মতো পরিস্থিতি তৈরির জন্য স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অংশ ধ্বংস করে গেছে। দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য ও সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে এ বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর হতে পারে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সার্বিক মুক্তির অন্যতম প্রেরণা। সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে আজও তাৎপর্য বহন করে।

লেখক: রাসেল হোসেন
সভাপতি, গোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতি।

  • মতামত লেখকের নিজস্ব