প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্বপ্নের সার্ক: সদস্যদেশগুলোর মিলনমেলা আজ ফুটবল মাঠে বন্দী, রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনর্জাগরণের দায়িত্ব নেবেন কে?
আগামীকাল থেকে বাংলাদেশে শুরু হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় ফুটবল আয়োজন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দীর্ঘ আট বছর পর আবারও এই প্রতিযোগিতার আয়োজক হচ্ছে বাংলাদেশ। বিকেলে ভারত ও পাকিস্তানের ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে এবারের আসরের। একই দিন রাত ৮টায় স্বাগতিক বাংলাদেশ মাঠে নামবে ভুটানের বিপক্ষে। এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে সার্কভুক্ত ছয় দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভুটান। ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে নেপাল এবার অংশ নিতে পারছে না। আগামী ১৭ নভেম্বর ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ১২ দিনের এই ফুটবল আয়োজন।
ফুটবলের মাঠে এই যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উন্মাদনা আর একসঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ, সেটিই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে ভারত-পাকিস্তান চির বৈরিতা আছে, সীমান্তবিরোধ আছে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনও আছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও ফুটবলের এই প্রতিযোগিতা থেমে নেই। দেশগুলো একে অপরের মুখোমুখি হয়, জয়-পরাজয় মেনে নেয়, আবার পরবর্তী প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ফিরে আসে।
অথচ রাজনীতির মাঠে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। যে দক্ষিণ এশিয়াকে একটি অভিন্ন সহযোগিতার কাঠামোয় নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সেই সার্ক আজ কার্যত উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপেক্ষায়। একসময় যে সংস্থা আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, তার শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না প্রায় এক যুগ ধরে। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতায় আটকে আছে দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত অগ্রযাত্রা।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—ফুটবলের মাঠে যে দক্ষিণ এশিয়া এক হতে পারে, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না কেন? আর যে বাংলাদেশের হাত ধরে সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, সেই বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি বাবার দেখানো আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বপ্নকে নতুন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারবেন?
জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতা: দক্ষিণ এশিয়াকে এক টেবিলে আনার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সার্কের ইতিহাস লিখতে গেলে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে। কারণ সার্ক কোনো আকস্মিক কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ফসল ছিল না। এর পেছনে ছিল বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চিন্তা, আঞ্চলিক বাস্তবতা সম্পর্কে উপলব্ধি এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ।
স্বাধীনতার পর দক্ষিণ এশিয়া ছিল নানা ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ক্ষত তখনো ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ককে প্রভাবিত করছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও এই অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। ভারত ছিল আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল অবিশ্বাস ও বিরোধে পরিপূর্ণ। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোরও নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
এমন বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভৌগোলিকভাবে প্রতিবেশী হলেও তাদের মধ্যে কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতার কোনো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। অথচ দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের মতো সমস্যাগুলো প্রায় সব দেশেরই অভিন্ন। এসব সমস্যা সমাধানে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে প্রত্যেকেই লাভবান হতে পারে। এই চিন্তা থেকেই তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা আসিয়ানের অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেন। তাঁর ভাবনায় ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এমন একটি সংগঠন প্রয়োজন, যেখানে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে।
এখানে জিয়াউর রহমানের চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আঞ্চলিক সহযোগিতাকে কোনো সামরিক জোট কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে না দেখা। তিনি এমন একটি কাঠামোর কথা ভাবছিলেন, যেখানে বড় ও ছোট রাষ্ট্র সমান মর্যাদা নিয়ে অংশ নিতে পারবে। ভারত বৃহত্তম রাষ্ট্র হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন অবস্থান বজায় থাকবে। একইভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিরোধ যেন পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতাকে আটকে না দেয়, সেই চিন্তাও এই উদ্যোগের মধ্যে নিহিত ছিল।
এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের মে মাসে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব পাঠান। দেশগুলো ছিল ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। প্রস্তাবটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানের আদলে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গড়ে তোলা।
প্রাথমিকভাবে উদ্যোগটির প্রতি সব দেশের সমান উৎসাহ ছিল না। বিশেষ করে ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন ছিল, এই ধরনের সংস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, এর উদ্দেশ্য কী হবে এবং এতে তাদের জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে। পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলোরও নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনা ছিল। তাই জিয়াউর রহমানের প্রস্তাবকে শুরুতেই সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু তিনি উদ্যোগটি থামিয়ে দেননি। ছয়টি দেশের প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮০ সালের নভেম্বরে ‘এ পেপার অন দ্য প্রপোজাল ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে একটি কর্মপত্র বা ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করে সদস্যদেশগুলোর কাছে পাঠান। এতে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র, সম্ভাব্য কাঠামো এবং কার্যক্রমের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
এরপর বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হয়। ১৯৮১ সালে কলম্বোয় দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পর্যায়ক্রমে পররাষ্ট্রসচিব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে যায়। ১৯৮৩ সালের ২ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ‘ডেক্লারেশন অন সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল কো-অপারেশন’ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়।
জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে নিহত হন। ফলে তার জীবদ্দশায় সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কিন্তু তাঁর শুরু করা উদ্যোগ, পাঠানো প্রস্তাব, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা পরবর্তী সময়ে এগিয়ে নেওয়া হয়। অবশেষে ১৯৮৫ সালের ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সাতটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৮ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় সার্ক সনদ।
পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে আফগানিস্তান সার্কের অষ্টম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়। বর্তমানে সংস্থাটির সদস্য বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান।
জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তার সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ছিল প্রবল, ছোট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল, কিন্তু এসব বাধার মধ্যেও তিনি আলোচনার একটি অভিন্ন মঞ্চ তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। সার্ক সনদের মূলনীতিতে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামোর ধারণা সামনে এনেছিল, যেখানে সহযোগিতার ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, কোনো রাষ্ট্রের আধিপত্য নয়।
ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা: সার্কের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা
সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই ম্লান হয়েছে। এর পেছনে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। সার্ক সনদে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ঐকমত্যের নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বিতর্কিত বিষয়গুলো সার্কের আলোচনার বাইরে রাখার বিধান রয়েছে। এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল, ভারত-পাকিস্তান বিরোধের মতো জটিল বিষয় যেন কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মতো সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়নি। দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটলে তার প্রভাব পড়েছে পুরো সংস্থার ওপর। ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার অনেক উদ্যোগ রাজনৈতিক বিরোধের কাছে আটকে গেছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০১৬ সালের ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ৯ ও ১০ নভেম্বর সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের উরির সেনা স্থাপনায় হামলার পর ভারত সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তানও অংশ না নেওয়ার অবস্থান জানায়। ফলে সম্মেলনটি স্থগিত হয়ে যায়। এরপর আর কোনো সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ ১৮তম সম্মেলন হয়েছিল ২০১৪ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর কাঠমান্ডুতে। অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানদের সর্বশেষ সম্মিলিত শীর্ষ বৈঠকের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১২ বছর।
ভারতের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে সার্কের কার্যকারিতা অনেকাংশে ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে পাকিস্তানকেও দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিরোধকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার বাইরে রাখার ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে। ভারত তার ‘নেইবারহুড ফাস্ট’ নীতির মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলে আসছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। তবে পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতিতে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
ভারত অবশ্য BBIN ও BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এগুলো সার্কের বিকল্প নয়। কারণ BBIN-এ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান নেই। অন্যদিকে BIMSTEC-এ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি রাষ্ট্রকে একই কাঠামোয় রাখার ক্ষেত্রে সার্কের স্বতন্ত্র গুরুত্ব এখনো রয়েছে। সার্কের সংকটকে তাই কেবল ভারত বা পাকিস্তানের একক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে দুই দেশের বৈরিতা যে সংস্থাটির কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধাগুলোর একটি, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সার্ক কি সত্যিই মৃত? প্রতিষ্ঠান আছে, সহযোগিতার সম্ভাবনাও আছে
সার্কের শীর্ষ সম্মেলন দীর্ঘদিন ধরে অনুষ্ঠিত না হলেও সংস্থাটি বিলুপ্ত হয়নি। কাঠমান্ডুতে এর সচিবালয় এখনো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, আঞ্চলিক কেন্দ্র ও বিশেষায়িত সংস্থার মাধ্যমেও কিছু সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকায় রয়েছে সার্ক অ্যাগ্রিকালচার সেন্টার এবং সার্ক রিজিওনাল স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন (সারসো)। কৃষি গবেষণা, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষিপ্রযুক্তি এবং পণ্য ও সেবার আঞ্চলিক মান নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
ভুটানের থিম্পুতে রয়েছে সার্ক ডেভেলপমেন্ট ফান্ড। নয়াদিল্লিতে রয়েছে সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি। নেপালে রয়েছে সার্ক টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড এইচআইভি/এইডস সেন্টার। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে রয়েছে সার্ক এনার্জি সেন্টার এবং সার্ক আরবিট্রেশন কাউন্সিল। শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় রয়েছে সার্ক কালচারাল সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে, সার্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো টিকে আছে। তবে প্রতিষ্ঠান থাকা আর কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা এক বিষয় নয়। নিয়মিত রাজনৈতিক নির্দেশনা, অর্থায়ন, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণ এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
তবে সার্কের সব কার্যক্রম বন্ধ—এমনও নয়। ২০২৬ সালের ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি কাঠমান্ডুতে সংস্থাটির ৬২তম প্রোগ্রামিং কমিটির অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ২০২৬ সালের কর্মসূচি, বাজেট এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রশাসনিক ও বিষয়ভিত্তিক পর্যায়ে সহযোগিতার কিছু কার্যক্রম এখনো চলছে। সমস্যা হলো, এসব উদ্যোগকে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান পর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না। সার্কের সবচেয়ে বড় সংকট তাই এর অস্তিত্বের নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের ঘাটতি। ফুটবলের মাঠে যে ঐক্য, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তা অধরা কেন?
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলো দেখিয়েছে, রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও আঞ্চলিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসেও সাফের অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০০৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পুরুষদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হারিয়ে প্রথমবার শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন পরও সেই জয় বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
নারী ফুটবলেও বাংলাদেশের সাফল্য এসেছে। ২০২২ সালে নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবার সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালেও একই প্রতিপক্ষকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় নারী দল। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সাফ নারী ফুটসাল চ্যাম্পিয়নশিপেও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। সাফের এর নিয়মিত প্রতিযোগিতাগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি কার্যকর উদাহরণ।
ফুটবলের এই অভিজ্ঞতা অন্য ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক উৎসব, চলচ্চিত্র উৎসব, বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, তরুণ উদ্যোক্তা সম্মেলন এবং গবেষণা বিনিময় কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনা অনেক বড়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ অন্তত ৬৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। অর্থাৎ, সম্ভাবনার তুলনায় বাস্তব বাণিজ্য এখনো অনেক কম। দক্ষিণ এশিয়ার মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ নিজেদের মধ্যে সম্পন্ন হয়। তুলনায় আসিয়ান অঞ্চলে এই হার প্রায় ২৫ শতাংশ।
এই ব্যবধানের পেছনে রয়েছে উচ্চ শুল্ক, অশুল্ক বাধা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, বিনিয়োগে সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে এমনকি উল্লেখ করা হয়েছে, সীমান্তসংক্রান্ত বাধার কারণে ভারতের কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিবেশী দক্ষিণ এশীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য করাও প্রায় ২০ শতাংশ সাশ্রয়ী হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এই সম্ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ, ভারতের বিশাল বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতা, পাকিস্তানের শিল্পপণ্য, শ্রীলঙ্কার সেবা খাত এবং মালদ্বীপের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর পানিপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের মতো অভিন্ন সমস্যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যার পূর্বাভাস, পানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি। এসব ক্ষেত্রে সার্ক কার্যকর থাকলে সহযোগিতার জন্য একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামো পাওয়া যেত। কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সেই সম্ভাবনার অনেকটাই এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তারেক রহমানের সামনে জিয়াউর রহমানের আঞ্চলিক দর্শন বাস্তবায়নের সুযোগ সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। তিনি সার্কের প্রাথমিক উদ্যোগের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে এবং বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। ফলে তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সার্ক পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থা অর্জনের সক্ষমতা।
প্রথমত, বাংলাদেশকে সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে একটি নতুন আঞ্চলিক সংলাপ শুরু করার উদ্যোগ নিতে হবে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়ে একটি সম্মিলিত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বিরোধে কোনো পক্ষের অবস্থান গ্রহণ না করে গঠনমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। দুই দেশের বিরোধ বাংলাদেশ একাই মিটিয়ে দিতে পারবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বিরোধের মধ্যেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, জলবায়ু, সংস্কৃতি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পক্ষে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, ঢাকায় সার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি বিশেষ বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। সেখানে সংস্থাটির বর্তমান অচলাবস্থা, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সম্মতি পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগও নেওয়া সম্ভব।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সার্কের পুনর্জাগরণের অন্যতম ভিত্তি করতে হবে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কৃষিপণ্য বিনিময়, ওষুধশিল্প, পর্যটন এবং শিক্ষার্থী বিনিময়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটানের মধ্যে বিদ্যুৎ সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
পঞ্চমত, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে আঞ্চলিক কূটনীতির কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। সাফ ফুটবলের পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয় যুব উৎসব, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা, সাহিত্য সম্মেলন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করা যেতে পারে। কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সার্কের মূল দর্শন—সব রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা—অক্ষুণ্ণ রাখা। ভারত এই অঞ্চলের বৃহত্তম রাষ্ট্র হলেও নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ কিংবা বাংলাদেশের স্বার্থ ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে কোনো আঞ্চলিক উদ্যোগ সফল করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের কূটনীতির শক্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, ভারসাম্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতা। এখানে তারেক রহমানের সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু বাংলাদেশের আগ্রহ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আটটি সদস্যরাষ্ট্রের সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
সার্ককে সচল করা মানে দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়া
বর্তমান বিশ্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা আর বিলাসিতা নয়; বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা আসিয়ানের মতো কাঠামোর সঙ্গে সার্কের তুলনা করলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্য অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। ইউরোপের মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণ দক্ষিণ এশিয়ায় রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে সহযোগিতার পথ বন্ধ রাখার কোনো যুক্তি নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে প্রথমে সীমিত কিন্তু বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, বাণিজ্য সহজীকরণ, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, জ্বালানি সহযোগিতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্য খাতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ছোট ছোট সাফল্যের মধ্য দিয়েই বড় আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একসঙ্গে বসার একটি রাজনৈতিক ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামোর কথা ভেবেছিলেন, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও অভিন্ন স্বার্থে কাজ করার সুযোগ থাকবে। চার দশকের বেশি সময় পর সেই দর্শনের প্রয়োজনীয়তা কমেনি; বরং নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় আরও বেড়েছে। তারেক রহমানের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে, একটি বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তার সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আস্থা অর্জনের ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, কিন্তু যোগাযোগ বন্ধ নেই। এক দেশের খেলোয়াড় অন্য দেশে খেলতে যাচ্ছে, দর্শক এক দেশের দলকে সমর্থন করছে, জয়-পরাজয়ের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক। অথচ রাজনৈতিক অঙ্গনে সামান্য মতপার্থক্যও অনেক সময় পুরো অঞ্চলের সহযোগিতার পথ আটকে দিচ্ছে। জিয়াউর রহমান যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি ছিল না দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার। তার উদ্যোগের মূল কথা ছিল—ভিন্ন রাষ্ট্র, ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ নিয়েও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগই হতে পারে সার্কের পুনর্জাগরণের ভিত্তি। লেখক: সোহেল রানা , গণমাধ্যম কর্মী