ন্যারেটিভের বাংলাদেশে রাজনীতির নতুন পাঠ: প্রসঙ্গ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চা দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাস, আদর্শ, পরিচিতি নির্মাণের রাজনীতি ও রাজনৈতিক বয়ানের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, গণতন্ত্র এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন- প্রতিটি বিষয়ই রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। কিন্তু সময়ের স্রোতধারায় বাংলাদেশের মানুষ আরও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে; আর সেটি হলো- রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতার মিল কতটুকু?
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তাঁকে নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, নির্বাচনী অঙ্গীকার কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়; বরং তা মানুষের অধিকার, জীবনমান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতায় প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কোনো দল বা নেতা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। বরং নিজের ভুল সংশোধনের সক্ষমতা, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। আর এখানেই জনাব তারেক রহমান বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। আলোচনা সমালোচনার মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক চর্চা তিনি গড়ে যাচ্ছেন, তা আসলে যতটা না রাজনৈতিক; তার চেয়েও অনেক বেশি নতুন ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ চর্চার প্রবেশদ্বার।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক, মামলা, কারাবাস, বিদেশে বনবাস এবং দল পরিচালনার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। ২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ অত্যাচার-নির্যাতন পার করে ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাসজীবন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে।
বিএনপির সমর্থকদের কাছে এই প্রত্যাবর্তন- শুধুমাত্র দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে একজন নেতার দেশে ফেরার ঘটনাই নয়; বরং দীর্ঘ স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার বিপরীতে অবিরত লড়াই সংগ্রামের এক অভূতপূর্ব বিজয়ের দিন। অন্যদিকে, তাঁর রাজনৈতিক অতীত নিয়ে বিরোধী পক্ষের প্রশ্ন ও সমালোচনাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তবে, একজন নেতার মূল্যায়নে কোনো এক পক্ষের ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার পরিবর্তে- যাচাইযোগ্য তথ্য, আইনি প্রক্রিয়া এবং বর্তমান কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিবেচনা করা জরুরি।একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম একজন নেতাকে মানুষের দুর্ভোগ ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে কতোটা সংবেদনশীল করে তুলতে পারে, আজকের তারেক রহমান যেনো তারই মূর্ত প্রতীক।
তবে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা নিজে থেকেই সুশাসনের নিশ্চয়তা দেয় না। সেই অভিজ্ঞতার প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায় তখন, যখন একজন নেতা নিজের ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযত থাকেন, ভিন্নমতকে সম্মান করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাঁর চর্চা ও দর্শনে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর এটিই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রথম পদক্ষেপ।
তারেক রহমানের সামনে এখন অতীতের অভিজ্ঞতাকে, ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগের সার্থকতা নির্ভর করবে তাঁর সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত- মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তার ওপর।
১৯ দফা, ভিশন-২০৩০ ও ৩১ দফাঃ প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি, খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবকে, বিএনপির রাজনৈতিক চিন্তার একটি ধারাবাহিক ‘বিবর্তনবাদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই কর্মসূচিগুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রেইন-বো-ন্যাশন থিউরি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, সার্বভৌমত্ব, ও জনকল্যাণের নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
কিন্তু একটি কর্মসূচি যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেনো, তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে। বিএনপির জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দলটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সুষ্ঠু নির্বাচন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আইনের শাসনের কথা বলেছে। এখন সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থেকে সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে, এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা দেখা দিলে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা দেয়ার দায়িত্বও সরকারের।
রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা তখনই বাড়ে, যখন প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশিত হয়। কোন লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, কোথায় বাধাগ্রস্থ হয়েছে এবং কেনো নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি- এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের পরিচয়। আর এক্ষেত্রে, সরকারের ৬ মাসের অর্জন ও কর্মসূচি জনগণের সামনে তুলে ধরা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিদ্যুতের অব্যবস্থাপনার ব্যাখ্যা প্রদান- একটি জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের লক্ষণ।
দলীয় প্রধান বনাম প্রধানমন্ত্রীঃ দ্বৈত দায়িত্বের ভারসাম্য
তারেক রহমানের নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো বিএনপি চেয়ারপার্সন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দ্বৈত ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। দলীয় প্রধান হিসেবে তাঁকে যেমন দলের আদর্শ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ঐক্য ও নির্বাচনী কর্মসূচি এগিয়ে নিতে হবে; ঠিক তেমনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব দেশের সব নাগরিকের প্রতি; তাঁরা বিএনপিকে সমর্থন করুন কিংবা অন্য যেকোনো দলকে। এই পার্থক্যটিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।
একটি নির্বাচিত সরকার তার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে, এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও সরকারি সেবা- দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারে না। তাই বিএনপিকে ভোট দেয়া একজন সাধারণ নাগরিক এবং অন্য দলকে ভোট দেয়া একজন নাগরিকের অধিকার সমান। বিরোধী দলের সমালোচনা, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা নাগরিক সমাজের প্রশ্নকে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে; গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অংশ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি।
দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের জন্য বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষা করা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে নিশ্চিত করতে হবে, দলীয় স্বার্থ যেন রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ দায়িত্বকে ছাপিয়ে না যায়। এ জন্য শুধু ব্যক্তিগত সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; দরকার কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আর এখানেই প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে। এসব আচরণ যে দলেরই হোক, তা সাধারণ মানুষের অধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যদি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে দলের নেতা-কর্মীদের জবাবদিহির আওতায় আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
কোনো নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে- দলীয় পরিচয় যেন তদন্তে বাধাগ্রস্থের কারণ না হয়। অবশ্য, সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং রাড্ডা ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন ক্ষমতাধর মহিলা এমপি’র পদত্যাগ একটি দৃশটান্তমূলক উদাহরণ হতে পারে।
তবে দল থেকে বহিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং অপরাধের প্রমাণ থাকলে আইনগত ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। আবার একই সঙ্গে, অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এখানেই দলীয় শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্বের পার্থক্য। দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমান সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পারেন, নিচ্ছেনও; কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অপরাধের বিচার করতে হবে স্বাধীন ও যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায়।
একজন প্রভাবশালী নেতা এবং একজন সাধারণ কর্মীর জন্য একই নিয়ম প্রয়োগ করা গেলে, মানুষের আস্থা বাড়বে। আর যদি দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে কাউকে রক্ষা করা হয়, তাহলে সংস্কারের অঙ্গীকার প্রশ্নের মুখে পড়বে। আর তাই প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের সমান্তরাল দ্বৈত দায়িত্ব- একদিকে যেমন গণতন্ত্রের দায়, তেমনি অন্যদিকে গণতন্ত্রের মুক্তির পথ।
ন্যারেটিভের ফাঁদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্ম ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রকে ভিন্নভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে আসছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আত্মসাত করে, নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রেখেছে। জামায়াতে ইসলামী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আদর্শকে গুরুত্ব দিয়েছে, যদিও তা বিভিন্ন সময়ে বহুবিধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিএনপি- জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, গণতন্ত্র ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়েছে। আর নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনে, নতুন বন্দোবস্তের প্রস্তাবনাকে সামনে রাখতে চাচ্ছে।
কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলই- মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, ধর্ম কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের একচ্ছত্র মালিক হতে পারে না। আর এ কারণেই গণমানুষের দল হিসেবে বিএনপি কখনো কোনো গণ-অভ্যুত্থানের একচ্ছত্র মালিকানা দাবী করেনি, করবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তব তাৎপর্য হওয়া উচিত- মানুষের স্বাধীনতা, সাম্য, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা। ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনৈতিক চর্চাও নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে না। একইভাবে ছাত্র-জনতার গণতন্ত্রকামী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া কোনো দলও, ভিন্নমতকে উপেক্ষা করার অধিকার রাখে না।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দাবি সামনে এনেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা, বৈষম্য হ্রাস এবং গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছিল। সেই আকাঙ্ক্ষাকে কেবল প্রতিপক্ষের সমালোচনার হাতিয়ার না বানিয়ে, রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এটিই ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা। আর তারেক রহমান সেটিই করার চেষ্টা করছেন। এটিই সামনের বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত ‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি’।
বিএনপির সামনে সুযোগ রয়েছে- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় প্রতিযোগিতার সংকীর্ণ পরিসর থেকে বের করে এনে, জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সম্মান করার এবং একই সাথে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার। ন্যারেটিভের বাংলাদেশে এটিই হোক রাজনীতির নতুন পাঠ। অর্থাৎ ইতিহাসের অধিকার আত্মসাতের রাজনীতির বিপরীতে জনগণের হাতে ইতিহাসের কৃতিত্ব তুলে দেয়ার রাজনীতিই হোক- তারেক রহমানের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ‘৭১ এর স্বাধীনতা আর ‘২৪ এর গণঅভ্যুত্থান- উভয়ই মূলত জনগণের দাবী, কৃতিত্ব এবং অধিকার। সেটি জনগণের হাতেই থাকা উচিত। কোনো ব্যাক্তি বা দলের হাতে নয়। আমার ধারণা, তারেক রহমান সেটিই করার চেষ্টা করছেন।
জনগণের আন্দোলনকে ন্যারেটিভের জালে জর্জরিত করে যখন কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠী এককভাবে সেটির কৃতিত্ব দাবী করে, তখন সেই দল বা গোষ্ঠী মূলত- জনগণের আকাঙ্খা ও স্বপ্নকে আত্মসাত করতে চায় এবং পরোক্ষভাবে জনগণের মালিকানা ও কর্তৃত্বই দাবী করতে চায়। আর এভাবেই একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা, স্বৈরাচারীতা এবং ফ্যাসিবাদ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
এ কারণেই বিএনপি কখনো কোনো গণ-আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের মালিকানা দাবী করেনি, করবে না। বরং সকল বাংলাদেশপন্থী আন্দোলনেই বিএনপি জনগণের পাশে ছিলো, বাংলাদেশের পক্ষে ছিলো, গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলো। আর এখানেই ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’, আদর্শিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি জনপ্রাসঙ্গিক।
তারেক রহমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো- অন্য দলগুলোর ন্যারেটিভের ফাঁদে পা না দিয়ে, বাংলাদেশের স্বার্থকে সামনে রেখে, সকল দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। এজন্য সকল চুক্তির শর্তে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির মূল্যায়ন এবং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সক্ষমতা জরুরি।
একটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক, অন্য দেশের সঙ্গে বৈরিতার কারণ হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি- জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। কোনো ন্যারেটিভ, চেতনা, ধর্ম বা আকাঙ্ক্ষার ফাঁদে জিম্মি হওয়া উচিত নয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’- স্লোগানের মতোই, বাংলাদেশের স্বার্থই বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তি হোক কাজ ও জবাবদিহিতা
বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে নিজের ঘোষিত নীতিগুলো, নিজের দল ও সরকারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রয়োগ করা। দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে যেমন দলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনমুখী রাখতে হবে; ঠিক তেমনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে হবে। কাজেই বিএনপি’র নেতাকর্মীদেরও তারেক রহমানকে এই দ্বৈত দায়িত্ব সফল ভাবে পালন করার ক্ষেত্রে, সহমর্মিতার সাথে সহযোগীতা করতে হবে। ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। ইতিহাস এভাবেই তৈরি হয়।
বিরোধী দলের সমালোচনা সহ্য করা, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা, দুর্নীতির অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং কৃষি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করা; এসবের মধ্য দিয়েই তাঁর নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে। আর এ কারণেই তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাটের বিপরীতে, তৃণমূল থেকে টেকসই উন্নয়নের চেষ্টা করছেন।
তবে রাজনীতিতে সমর্থন থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়। একজন প্রকৃত রাজনৈতিক সমর্থক তাঁর দলের সাফল্য দেখতে চান, আবার ভুল হলে তা সংশোধনের দাবিও তোলেন। কারণ, দল ও নেতার দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা শুধু প্রশংসার ওপর নয়, আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহির ওপরও নির্ভর করে। মনে রাখতে হবে, এ লড়াই- ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ পরিবর্তনের লড়াই।
বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ফলাফলও দেখতে চায়। তাই রাজনৈতিক বয়ানের চেয়ে বড় হওয়া উচিত মানুষের অধিকার, দলীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ এবং ব্যক্তির জনপ্রিয়তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা। আর তাই, একজন নেতা ও একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে- এই নীতিগুলো কতটা বাস্তবরূপ পায় এবং বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তিত ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ চর্চায় এর সুফল কতটা অনুভব করতে পারে, তার ওপর।
লেখক: মাকসুদুর রহমান,সহ-সভাপতি,
মতিঝিল থানা, ঢাকা মহানগর জিয়া পরিষদ।