ডিজিটাল ডিটক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজের কাছে ফিরে আসার লড়াই
মনে করুন, আজ দুপুরে আপনার মনে হলো এক জোড়া নতুন জুতা কিনবেন। বিষয়টি নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বললেন, কিংবা ইন্টারনেটে কয়েকটি জুতার দাম ও ডিজাইন দেখলেন। কিছুক্ষণ পর ফেসবুক খুলতেই দেখলেন, আপনার সামনে জুতার বিজ্ঞাপন। ইউটিউবে গেলেন, সেখানেও একই ধরনের বিজ্ঞাপন। মনে হতে পারে, আপনার মনের কথা কে যেন আগেই জেনে বসে আছে তাই না!
ব্যাপারটা অবশ্য জাদু নয়। আমরা ইন্টারনেটে কী খুঁজি, কোন ভিডিও দেখি, কোন বিজ্ঞাপনে ক্লিক করি, কোন পেজে কতক্ষণ থাকি এসব তথ্য থেকে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আমাদের আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। সার্চ হিস্ট্রি, কুকিজ, বিজ্ঞাপনের পরিচিতি এবং অন্যান্য ডিজিটাল সংকেতও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
গুগল ও মেটার মতো প্রতিষ্ঠান তাদের নীতিমালায় ব্যবহারকারীর কার্যকলাপের তথ্য কীভাবে বিজ্ঞাপন ব্যক্তিকরণে ব্যবহৃত হয়, তা জানিয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠান একইভাবে তথ্য ব্যবহার করে না। এমনটিও নয় যে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য সরাসরি বিজ্ঞাপনদাতার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
ফেসবুক বা অন্য কোনো ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অনেক বড় বড় শর্তাবলি সামনে আসে! আমরা সাধারণত সেগুলো পড়ি না। নিচে স্ক্রল করি, সম্মতি দিই, তারপর নিজের কাজে চলে যাই। অথচ সেখানেই লেখা থাকে আমাদের কোন তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং কার সঙ্গে ভাগ করা হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই জানি, যে ডিজিটাল জগতে প্রতিদিন এত সময় কাটাচ্ছি, সেখানে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে?
শুধু বিজ্ঞাপন দেখানোই অবশ্য শেষ কথা নয়। আপনি কোন ধরনের ভিডিও দেখতে পছন্দ করেন, কোন পোস্টে মন্তব্য করেন, কোন কনটেন্টে বেশি সময় দেন এসবের ভিত্তিতে আপনার সামনে পরবর্তী কনটেন্ট সাজানো হয়। একে বলা হয় অ্যালগরিদম। সহজভাবে বললে, আপনার আগের কার্যকলাপের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে কোন বিষয়গুলো আপনার সামনে আসবে, তা নির্ধারণে এই ব্যবস্থা কাজ করে।
ফলে আপনি যদি এক ধরনের ভিডিও বেশি দেখেন, ধীরে ধীরে সেই ধরনের ভিডিওই আপনার সামনে বেশি আসতে পারে। আপনি ভাবছেন নিজের পছন্দমতো ভিডিও দেখছেন। অন্যদিকে প্ল্যাটফর্মও আপনার আগ্রহ বুঝে আরও প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট দেখানোর চেষ্টা করছে। আর এভাবেই এসব কনটেন্টের ধারাবাহিকতা আপনাকে দীর্ঘ সময় উক্ত প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখছে।
একটু ফোন দেখি, তারপর আর সময় থাকে না কেন?
খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়ছেন, একটি ছোট্ট নোটিফিকেশনের সাউন্ড শুনতেই ভেতর থেকে তাড়না কাজ করে ‘দেখি কে মেসেজ দিয়েছে?’। তারপর একটি পোস্ট, একটি ভিডিও, আরেকটি খবর। যখন আবার কাজে ফিরলেন, তখন হয়তো আধা ঘণ্টা পার হয়ে গেছে।
সমস্যাটা শুধু সময় চলে যাওয়া নয়। বরং যে সময়টুকু মনোযোগ দিয়ে কাজে দেওয়ার কথা ছিল, সেটিও কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। তখন আর সেই পুরনো কাজে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না কারন আপনার মনোযোগ ইতোমধ্যে কয়েক টুকরো হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ছরিয়ে পরেছে। ২০১৫ সালে Journal of Experimental Psychology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ফোনের নোটিফিকেশন মনোযোগনির্ভর কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এমনকি ফোন হাতে না নিলেও এই প্রভাব দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ ফোন ব্যবহার না করেও কখনো কখনো ফোনের কারণে মনোযোগ হারাতে পারি।
এসব কিছুর অনেক বিষয়ই হয়তো আমরা আগে থেকেই জানি কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তবুও কেন বারবার আমরা ফোনের কাছে ফিরে যাই? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের মস্তিষ্কের কিছু স্বাভাবিক আচরণের কথা জানতে হবে।
যেমন- আপনি একটি ভিডিও দেখলেন। সেটি ভালো লাগল। পরের ভিডিওটি হয়তো আরও মজার হবে এই আশায় আরেকটি ভিডিও চালু করলেন। সেটি ভালো না লাগলেও সমস্যা নেই, পরেরটি তো ভালো হতে পারে! এভাবে চলতেই থাকে এই আজব চক্র।
মনোবিজ্ঞানে পুরস্কার পাওয়ার অনিশ্চিত প্রত্যাশার সঙ্গে এ ধরনের আচরণের সম্পর্ক রয়েছে। একে বলা হয় Variable Reward। অর্থাৎ কখন ভালো কিছু পাবেন, তা আপনি জানেন না। কখনো মজার ভিডিও, কখনো বন্ধু বা বান্ধবীর ম্যাসেজ, কখনো গুরুত্বপূর্ণ খবর আবার কখনো কিছুই নয়। এই অনিশ্চয়তা বারবার ফিরে আসার আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
এখানে ডোপামিনেরও ভূমিকা আছে। ডোপামিনকে শুধু আনন্দের রাসায়নিক বললে ভুল হবে। এটি আমাদের আগ্রহ, প্রেরণা এবং পুরস্কারের প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত। তাই প্রতিবার ফোন খুললেই মস্তিষ্কে ভয়ংকর কিছু ঘটছে, এমন নয়। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে বারবার নতুন কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা আমাদের অভ্যাসকে শক্তিশালী করে তুলে এমনকি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং তবে নতুন এমন কিছু করার আগ্রহ বিলুপ্ত করে দেয়।
এবার একটু নিজের জীবনের দিকে তাকান। কতবার এমন হয়েছে, পরিবারের কেউ আপনার সঙ্গে কথা বলছেন, অথচ আপনি মাঝেমধ্যে ফোনের পর্দায় চোখ রাখছেন? বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন, কিন্তু দুজনেই নিজের ফোন নিয়ে ব্যস্ত। একসময় হয়তো পাশাপাশি বসে থেকেও একে অপরের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করছেন না।
প্রযুক্তি আমাদের দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু কখনো কখনো পাশের মানুষটির কাছ থেকেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না? অন্যের সুন্দর জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবন নিয়ে হতাশা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই দেখি, কেউ বিদেশ ঘুরছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে, কেউ চাকরি পেয়েছে, কারও জীবনে দারুণ সব ঘটনা ঘটছে। কারও বিয়ের ছবি, কারও নতুন বাড়ি, কারও পদোন্নতির খবর।
দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের জীবনের তুলনা শুরু হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হয়তো বন্ধুর বিদেশে উচ্চশিক্ষার ছবি দেখে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হচ্ছে। একজন চাকরিপ্রার্থী পরিচিত কারও নতুন চাকরির খবর দেখে ভাবছেন, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু তিনিই পিছিয়ে আছেন। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Social Comparison বা সামাজিক তুলনা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে FOMO (Fear of Missing Out) অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়। কে কী করল, কোথায় গেল, কোন খবরটি মিস করলাম এসব জানার জন্য বারবার ফোনে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
অথচ আমরা ভুলে যাই, মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোই বেশি প্রকাশ করে। দুশ্চিন্তা, ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা প্রতিদিনের সংগ্রামের সবটুকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরে না।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বড় গবেষণা-পর্যালোচনায় ২ লাখ ৫২ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগের বিভিন্ন ধরনের লক্ষণের সম্পর্ক পাওয়া যায়।
ঘুম ও মানসিক শান্তিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?
রাতে বিছানায় শুয়ে ফোন দেখা আমাদের অনেকেরই অভ্যাস। ভাবি, একটু ভিডিও দেখে ঘুমাব। কিন্তু সেই একটু কখন যে অনেকটা হয়ে যায়, বোঝা যায় না। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ৫৫টি গবেষণা এবং ৪১ হাজার ৭১৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য নিয়ে করা একটি পর্যালোচনায় ইলেকট্রনিক মাধ্যমের ব্যবহার এবং ঘুমের মান কমে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অবশ্য এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করলেই কেউ প্রযুক্তির আসক্তিতে ভুগছেন, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কেউ হয়তো অনলাইনে ক্লাস করছেন, কেউ অফিসের কাজ করছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে দূরে বসে যোগাযোগ রাখছেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফোন ব্যবহারের ধরন এবং সেটি আমাদের ঘুম, পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক ও মানসিক শান্তিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
এখন শুধু সময় নয়, চিন্তার জায়গাটিও কি প্রযুক্তির হাতে তুলে দিচ্ছি?
প্রযুক্তির জগৎ থেমে নেই। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
আগে কোনো তথ্য খুঁজতে কয়েকটি ওয়েবসাইট ঘুরতে হতো। এখন একটি প্রশ্ন করলেই এআই থেকে উত্তর পাওয়া যায়। লেখা তৈরি, ছবি আঁকা, পড়াশোনা, অফিসের কাজ, তথ্য বিশ্লেষণ সবখানেই এআই আমাদের সাহায্য করছে।
একজন শিক্ষক কয়েক মিনিটে পাঠপরিকল্পনা তৈরি করতে পারছেন। একজন শিক্ষার্থী কঠিন বিষয় সহজভাবে বুঝতে পারছেন। একজন চাকরিপ্রার্থী নিজের সিভি সহজেই বানাতে পারছেন। এগুলো নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ।
কিন্তু এখানেও একটু সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কোনো কিছু জানার আগেই এআইকে জিজ্ঞেস করছি, নিজের চিন্তা গুছানোর আগেই উত্তর চাইছি, ছোটখাটো সিদ্ধান্তেও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছি। এমনকি কোনো বিষয়ে নিজের মতামত তৈরির আগেই এআইয়ের দেওয়া উত্তরকে সঠিক ধরে নিচ্ছি।
এআই ব্যবহার করা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, নিজের চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের জায়গাটুকুও যদি পুরোপুরি প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিই।
ধরুন, একজন শিক্ষার্থীকে একটি বিষয়ে নিজের মতামত লিখতে বলা হলো। সে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা না করেই এআইয়ের কাছ থেকে একটি লেখা নিয়ে জমা দিল। হয়তো কাজটি সম্পন্ন হলো, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তার নিজের চিন্তা কতটুকু তৈরি হলো?
এখানেই প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি প্রযুক্তিকে নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করছি, নাকি নিজের সক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাই কমিয়ে দিচ্ছি? ইউনেসকোর ২০২৩ সালের নির্দেশিকাতেও শিক্ষায় ও গবেষণায় জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের নিজস্ব সক্ষমতা, গোপনীয়তা এবং মানবিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কি প্রযুক্তি ছেড়ে দিতে হবে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ। না। একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি ছাড়া চলার কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব। সকালে অ্যালার্ম থেকে শুরু করে অফিসের কাজ, পড়াশোনা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, যোগাযোগ জীবনের প্রায় প্রতিটি জায়গায় প্রযুক্তি জড়িয়ে আছে। একে ছাড়া জীবনযাপন রীতিমতো অসম্ভব।
তাহলে উপায় কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পেছনে তাকানো যাক। একসময় মানুষ চিঠির অপেক্ষায় থাকত। এরপর টেলিফোন এলো, যোগাযোগ আরও সহজ হলো। রেডিও ও টেলিভিশন মানুষের বিনোদন ও তথ্য পাওয়ার অভ্যাস বদলে দিল। এরপর কম্পিউটার ও ইন্টারনেট পৃথিবীকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এল। স্মার্টফোন এসে সেই পৃথিবীকে পকেটে ঢুকিয়ে দিল। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি আমাদের কিছু সুবিধা দিয়েছে, আবার নতুন কিছু অভ্যাসও তৈরি করেছে। একসময় টেলিভিশন দেখার সময় নির্দিষ্ট ছিল। এখন ফোনের পর্দা আমাদের সঙ্গে থাকে দিনরাত। ফলে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার সুযোগ যেমন কমেছে, তেমনি নিজের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজনও বেড়েছে।
এই জায়গাতেই আসে ডিজিটাল ডিটক্স।
সহজভাবে বললে, ডিজিটাল ডিটক্স হলো প্রযুক্তি থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় ডিজিটাল ব্যবহার থেকে সচেতনভাবে বিরতি নেওয়া। কখন ফোন ব্যবহার করব, কতক্ষণ করব, কোন অ্যাপ আমার কাজে লাগছে আর কোনটি শুধু সময় নিচ্ছে সেই সিদ্ধান্তগুলো আবার নিজের হাতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
এটি যে কাজে আসতে পারে, তার কিছু গবেষণাভিত্তিক প্রমাণও রয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। তাঁদের এক দলকে এক সপ্তাহের জন্য কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ রাখতে বলা হয়। এক সপ্তাহ পর ওই দলের মানসিক সুস্থতা এবং বিষণ্নতা ও উদ্বেগের কিছু পরিমাপে উন্নতি দেখা যায়।
কীভাবে নিজের সময় ও মনোযোগ ফিরে পাবেন?
ডিজিটাল ডিটক্স করতে হলে আজই ফোন বন্ধ করে পাহাড়ে চলে যেতে হবে না। বরং ছোট কিছু পরিবর্তন দিয়েই শুরু করা যায়।
১. দিনের শুরুটা নিজের জন্য রাখুনঃ সকালে ঘুম থেকে উঠে অন্তত ৩০ মিনিট ফোন না দেখার চেষ্টা করুন। দিনের শুরুটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খবর দিয়ে নয়, নিজের প্রয়োজন ও পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করুন।
২. ঘুমের আগে ফোনকে বিদায় জানানঃ ঘুমানোর ৩০–৬০ মিনিট আগে ফোন সরিয়ে রাখুন। প্রয়োজনে অ্যালার্মের জন্য আলাদা ঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
৩. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুনঃ সব খবর, সব মন্তব্য, সব আপডেট সঙ্গে সঙ্গে জানা জরুরি নয়। প্রয়োজনীয় কল ও বার্তা চালু রেখে বাকি নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিতে পারেন।
৪. কাজের সময় ফোনকে একটু দূরে রাখুনঃ পড়াশোনা বা অফিসের কাজের সময় ফোনটি হাতের নাগালের বাইরে রাখুন। জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজন থাকলে শুধু প্রয়োজনীয় কল চালু রাখুন।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করুনঃ কোনো কারণ ছাড়াই বারবার অ্যাপ খোলার অভ্যাস কমান। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করুন।
৬. খাবার টেবিলকে ফোনমুক্ত রাখুনঃ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাওয়ার সময় ফোন পাশে না রেখে একে অপরের সঙ্গে কথা বলুন। দিনের ছোট ছোট গল্পগুলো ভাগ করে নিন।
৭. প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার আলাদা করুনঃ অনলাইনে ক্লাস করা, চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজা এক বিষয়। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করা আরেক বিষয়। দুটিকে এক করে দেখবেন না।
৮. সপ্তাহে কিছু সময় ডিজিটাল বিরতি নিনঃ অন্তত কয়েক ঘণ্টা অপ্রয়োজনীয় ডিজিটাল ব্যবহার থেকে দূরে থাকুন। বই পড়ুন, হাঁটতে বের হন, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করুন কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান।
৯. নিজের ফোন ব্যবহারের হিসাব দেখুনঃ স্মার্টফোনের Screen Time বা Digital Wellbeing অপশনে গিয়ে কোন অ্যাপে কত সময় কাটাচ্ছেন, তা দেখুন। এরপর নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনুন।
দিন শেষে প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়। বরং প্রযুক্তি আমাদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে। একজন গ্রামের শিক্ষার্থী এখন ঘরে বসে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করতে পারছেন। একজন শিক্ষক প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছেন। দূরদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মুহূর্তেই কথা বলা যাচ্ছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তাই প্রযুক্তিকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটিকে নতুন করে বোঝা।
যে যন্ত্রটি আমাদের সময় বাঁচানোর কথা, সেটিই যদি দিনের বড় একটি অংশ নিয়ে নেয়, তাহলে একটু থামা দরকার। যে মাধ্যমটি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার কথা, সেটিই যদি পাশের মানুষটির সঙ্গে আমাদের কথোপকথন কমিয়ে দেয়, তাহলে একটু ভাবা দরকার। যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করার কথা, সেটিই যদি আমাদের নিজস্ব চিন্তার জায়গা দখল করতে শুরু করে, তাহলে নিজের অবস্থানটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
হয়তো আজ রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটি হাতে নেওয়ার মুহূর্তে নিজেকে একটি প্রশ্ন করতে পারেন আমি কি সত্যিই কোনো প্রয়োজনের কারণে ফোনটি খুলছি, নাকি শুধু অভ্যাসের বশে? প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু উত্তরটি হয়তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় একটি পরিবর্তন আনতে পারে।
কারণ প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত থাকা আর জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা দুটি কিন্তু এক বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য। জীবনটাকেই প্রযুক্তির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নয়।
লেখক: মাসুম ব্যাপারী,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষক,
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচী, রংপুর।