২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৪৯

নদী বাঁচাতে শুধু খনন নয়, চাই সমন্বিত পরিকল্পনা

মোঃ দেলোয়ার হোসেন  © টিডিসি ফটো

নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জনপদ, বিস্তৃত হয়েছে নগর, সমৃদ্ধ হয়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। অথচ একসময় যে নদ-নদী এই অঞ্চলের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেগুলোই আজ দখল, দূষণ ও নাব্যতা-সংকটে অস্তিত্ব হারানোর পথে। ময়মনসিংহের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও নেত্রকোনার মগড়া নদীর বর্তমান অবস্থা সেই সংকটেরই উদাহরণ। নদীগুলোকে বাঁচাতে শুধু খনন প্রকল্প গ্রহণ করলেই চলবে না; দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকির সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

পূজার ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ময়মনসিংহে নিজের বাড়িতে ফিরেছিলাম। এ সময় কয়েকটি জেলা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে দেখা এবং নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনপদ ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর সঙ্গে নদ-নদীর সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করা।

বিশেষ করে ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, নেত্রকোনা জেলা শহরের মগড়া নদী এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি উপজেলার বড়াই নদী সরাসরি দেখেছি। এসব নদীর তীর ঘিরেই একসময় জনপদ ও নগরের বিকাশ ঘটেছিল। গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপনা, যার কিছু এখনো অতীতের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

তবে সরেজমিনে দেখা নদ-নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের মৃতপ্রায় অবস্থা। নদীকেন্দ্রিক জনপদ হিসেবে পরিচিত মগড়া নদীর অবস্থাও সংকটাপন্ন। আমার জন্মস্থান ব্রহ্মপুত্র নদের কাছাকাছি হওয়ায় নদটির প্রতি আগ্রহ ও মমত্ববোধ স্বাভাবিকভাবেই বেশি। নদটির বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, এর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় সভ্যতার বিকাশে নদীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিন্ধু নদের অববাহিকায়, বর্তমান ভারত ও পাকিস্তান অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা। নীল নদের তীরে বিকশিত হয়েছিল মিশরীয় সভ্যতা। বর্তমান ইরাক অঞ্চলে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমীয় সভ্যতা। অন্যদিকে, হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদী চীনা সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

নদীকেন্দ্রিক এসব সভ্যতার বিকাশের মধ্য দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভর সমাজ, নগরায়ণ, লিপি ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথে এগিয়ে যায়। নদী মানুষের জীবিকা, যোগাযোগ, কৃষি ও বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করেছিল। প্রকৃতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও নদীর সঙ্গে সহাবস্থান গড়ে তুলে মানুষ নিজের জীবন ও জীবিকার পরিসর বিস্তৃত করেছিল।

বাংলাদেশের জনপদ ও নগরের বিকাশেও নদ-নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমার ধারণা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ময়মনসিংহ শহরের উৎপত্তি ও বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একসময় নদটি ছিল এ অঞ্চলের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম মাধ্যম। নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল মানুষের বসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। পলি জমা, দখল, দূষণ এবং খননকাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নসহ নানা কারণে নদটি আজ সংকটাপন্ন। একসময় যে নদ জনপদের বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল, তার এমন অবস্থা আমাদের ব্যথিত করে। একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগে, নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নগরগুলো কি তাদের অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তিকে রক্ষা করতে পেরেছে?

চলতি বছরের আগস্টে প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ বিভাগের নদ-নদীগুলোর সংকটের চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রশাসন চার জেলার জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নদ-নদীর একটি তালিকা প্রস্তুত করে। তালিকাটি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়।

তালিকা অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে নদ-নদীর সংখ্যা ১৭৯। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ৯৪টি এবং ময়মনসিংহ জেলায় ৫৯টি নদ-নদী রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) মাঠপর্যায়ের গবেষণার ভিত্তিতে ময়মনসিংহ বিভাগের নয়টি নদ-নদীকে সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নদ-নদীগুলো হলো ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, মহাদেও, সুতিয়া, সুতিখালী, খিরু, বানার, আইমান ও মগড়া। এসব নদ-নদীর অধিকাংশই ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত।

এই পরিসংখ্যান শুধু নদ-নদীর সংখ্যা কিংবা ভৌগোলিক বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে না; বরং নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। কারণ, নদ-নদীর সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, অবৈধ দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ নজরদারির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

নদী রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো অবৈধ দখল। প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার ৩ হাজার ৩৮৫ জন অবৈধ নদী দখলদারের তালিকা প্রকাশ করে। তৎকালীন জেলা প্রশাসনগুলো মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে তালিকাটি তৈরি করেছিল।

তালিকা অনুযায়ী, শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই নদ-নদী ও খাল অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিলেন ২ হাজার ১৬০ জন। নেত্রকোনায় এ সংখ্যা ছিল ৫১২। তালিকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ের নামও ছিল।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে: দখলদারদের তালিকা তৈরির পর কী হয়েছে? নদীর সীমানা পুনরুদ্ধার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

তালিকা তৈরি অবশ্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু তালিকা প্রকাশের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, উদ্ধার করা জমি নদীর স্বাভাবিক সীমানার মধ্যে ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে পুনর্দখল ঠেকানো জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি মূল্যায়ন না করলে নদী রক্ষার উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থেকে যায়।

বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩; জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩; এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩—পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো।

কিন্তু আইন ও বিধিমালা থাকার পরও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও মগড়া নদীতে দখল, দূষণ এবং নাব্যতা-সংকট কেন রয়ে গেছে? আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার কার্যকর প্রয়োগ আরও বেশি জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কিংবা অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আইনের সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

নদী রক্ষার ক্ষেত্রে তাই শুধু নতুন আইন প্রণয়ন বা নীতিমালা ঘোষণা নয়, বিদ্যমান আইনের বাস্তব প্রয়োগও মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বৈষম্য থাকলে নদী রক্ষার উদ্যোগ কার্যকর হবে না। এ ক্ষেত্রে বিগত সরকারের সময়কার উদ্যোগ ও ব্যর্থতার মূল্যায়নও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।

বর্তমান বিএনপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা সামনে এসেছে। দেশের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে দেশব্যাপী অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তুরাগসহ অন্যান্য দূষণপ্রবণ নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং পরিবেশগত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ড্রোন ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নদী রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরিকল্পনা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থের যথাযথ ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং নদীর প্রকৃত অবস্থার পরিবর্তন নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ করে নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নদীর সংকট শুধু পানিপ্রবাহ বা নাব্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীতীরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের দূষণ নিয়ে ২০২১ সালে প্রকাশিত Perceptions of Urban Pollution of River Dependent Rural Communities and Their Impact: A Case Study in Bangladesh শীর্ষক গবেষণাপত্রে এ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণাপত্রে নগরবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিশোধিত নর্দমার পানি সরাসরি নদীতে নিঃসরণ এবং নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠীর ওপর দূষণের প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ শহর থেকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি প্রবেশের ১৮টি নর্দমার সংযোগ শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে দুটি পাইপের মাধ্যমে পরিচালিত গৃহস্থালি ও হোটেল-সংশ্লিষ্ট নালা এবং বাকি ১৬টি ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্মিত নর্দমা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। গবেষণার সময় এসব নর্দমার পানি কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই নদীতে প্রবেশ করছিল বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেন।

গবেষণায় নদীতীরবর্তী দুটি অস্থায়ী বর্জ্য ফেলার স্থানও শনাক্ত করা হয়। এর একটি ছিল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর কাছাকাছি এলাকায়। শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশসংলগ্ন স্থানে বর্জ্য ফেলা হতো। বর্ষায় পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে এসব বর্জ্যের একটি অংশ নদীর পানিতে মিশে যেত।

এ ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নদীর পানির গুণগত মানের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি নদীতীরবর্তী মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর সঙ্গে যেসব মানুষের জীবিকা, দৈনন্দিন কাজ ও সামাজিক সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত, দূষণের প্রভাব তাদের ওপর তুলনামূলকভাবে সরাসরি পড়তে পারে।

ফলে নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু নদীর পানির মান পরীক্ষা করলেই চলবে না; বর্জ্য কোথা থেকে আসছে, কোন পথে নদীতে প্রবেশ করছে এবং স্থানীয় মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। নগরের নর্দমার পানি শোধন, কঠিন বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা হ্রাস ও ক্রমাবনতিশীল অবস্থা নিয়ে ২০২৩ সালের ২৬ মে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত Brahmaputra runs dry in Mymensingh শীর্ষক প্রতিবেদনেও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে পলি জমে চর সৃষ্টি, নাব্যতা হ্রাস এবং দখলসংক্রান্ত সমস্যার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণে Classification Survey ও খতিয়ান অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের এক নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিন দশকে নদীর একটি অংশে প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ চর জমেছে। তাঁর মতে, উজানের এই বিশাল চর যথাযথভাবে অপসারণ করা না হলে নদীর অন্য অংশে খনন করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ সদর এলাকার কালীবাড়ি ও কাচারী ফেরিঘাটের বিভিন্ন স্থানে হাঁটুপানি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব পর্যবেক্ষণ নদীর নাব্যতা-সংকটের মাত্রা এবং খননকাজের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা উন্নয়নে ২০১৯ সালে Navigability Improvement and Excavation of Old Brahmaputra প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পটির আনুমানিক বাজেট ছিল ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। প্রাথমিকভাবে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে ২০২৩ সালের মে মাসে স্থানীয় নাগরিক সংগঠনগুলো প্রকল্পের অগ্রগতি সত্ত্বেও নদীর অবস্থার প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট: নদী খনন প্রয়োজনীয় হলেও শুধু খননকাজের মাধ্যমে নদীর দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। নদীর উজান থেকে ভাটির পানিপ্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর স্বাভাবিক সীমানা পুনরুদ্ধার—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

খনন প্রকল্পের সাফল্যও শুধু কত কিলোমিটার খনন করা হয়েছে কিংবা কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। খননের পর নদীর পানিপ্রবাহ ও নাব্যতায় কতটা পরিবর্তন এসেছে, বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নদীর অবস্থা কেমন থাকছে এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও পরিবেশে কী প্রভাব পড়ছে—এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

নদী রক্ষার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার সম্ভাবনা। একসময় নদী ছিল মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম। নদীর নাব্যতা ও প্রবাহ বজায় রাখা গেলে উপযুক্ত এলাকায় নদীপথের ব্যবহার নতুন করে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে বিভাগীয় শহরগুলোকে কেন্দ্র করে নদীপথের উপযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে নদীর বর্তমান প্রবাহ, নাব্যতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও মগড়া নদীর মতো সংকটাপন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে তাই বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নদীর উৎস থেকে ভাটি পর্যন্ত পানিপ্রবাহ, দূষণের উৎস, দখলের ধরন এবং পলি জমার স্থান চিহ্নিত করে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নদীর সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত জরিপ ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে দখল, বালুর ব্যবসা, দূষণ ও নাব্যতা হ্রাস নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি নদীর সংকট নয়। এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, নগরায়ণ, পরিবেশ ও জনজীবনের সংকটও। একসময় এই নদকে কেন্দ্র করে জনপদের বিকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের জীবিকা সমৃদ্ধ হয়েছিল। আজ নদটির বেহাল অবস্থা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে—যে নদী আমাদের জনপদ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, সেই নদীকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমরা কতটা পালন করছি?

নদী রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নদীর অতীত ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। নদীকে শুধু পানিপ্রবাহের পথ কিংবা বালু উত্তোলনের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ময়মনসিংহের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও নেত্রকোনার মগড়া নদীকে রক্ষায় এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। দখল ও দূষণ বন্ধ, নাব্যতা পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং প্রকল্পের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নদীগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আমাদের নদীগুলোকে বাঁচানো মানে শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয়; এর অর্থ আমাদের জনপদের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার এবং টেকসই নগরজীবনকেও সুরক্ষিত করা। নদীকে কেন্দ্র করে যে সভ্যতা ও জনপদের বিকাশ ঘটেছে, সেই নদীগুলোই যদি একদিন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তবে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।

লেখক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়