শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করতে শিক্ষকদের ভূমিকা
মূলত নানা প্ল্যাটফর্মে গবেষণা সংক্রান্ত বহুবিদ আলোচনার মাঝে একটি সাধারণ প্রশ্ন হল- অর্থ, ল্যাব কিংবা মেন্টর সংকট পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কীভাবে গবেষণা শুরু করতে পারে? কিন্তু আমার প্রশ্ন হল- বহুবিদ এসব সমস্যা দূরে ঠেলে গবেষণা করার দায়িত্ব কি শুধুই শিক্ষার্থীদের? প্রধান দুটি ফ্যাক্টর অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারী ব্যবস্থাপনাকে এক পাশে সরিয়ে রাখলেও গবেষক সমাজ তথা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা কি উপেক্ষা করার কোন উপায় আছে? এই লেখাটি মুলত দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংপৃক্ত করার পিছনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা সংক্রান্ত। পুরো লেখাটিতে তরুণ সমাজ বলতে আমি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদেরকেই বুঝিয়েছি। তাই অন্যদের এর মাঝে টেনে এনে বিভ্রান্ত হবার কোন কারণ নেই।
শুরুতেই বলে রাখি – বাংলাদেশের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কেন্দ্রিক অর্থাৎ তারা করলে দেশে গবেষণা হয়, অন্যথায় নয়। অন্যদিকে, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক গবেষণা করেন তাদের পদোন্নতির জন্য। কেউ কেউ হয়ত দেশ বিদেশ থেকে গবেষণা অনুদান সংগ্রহের জন্য গবেষণা করছেন, তবে তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম।
যে কোন জাতির জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং টেকসই উন্নয়নে তরুণ গবেষকদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই তরুণদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ সৃষ্টি, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বিকাশ এবং গবেষণার প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলার দায়িত্ব গবেষক শিক্ষকদেরই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে গবেষণায় সীমিত অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগারের অভাব, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপাত্তের অপ্রতুলতা, প্রকাশনাব্যয় এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশের সীমাবদ্ধতা ব্যাপক। তবে এত কিছুর মধ্যেও তরুণদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে শিক্ষকদেরই সবার আগে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
শ্রেনিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণার প্রতি আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করা শিক্ষকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের সমস্যা চিহ্নিত করতে, প্রশ্ন করতে এবং প্রচলিত ধারণাকে বৈজ্ঞানিক যুক্তির আলোকে বিশ্লেষণ করতে শেখাতে হবে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, ওষুধশিল্প, কৃষি, পরিবেশদূষণ, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো স্থানীয় সমস্যাগুলোকে গবেষণার বিষয় হিসেবে তুলে ধরলে শিক্ষার্থীরা গবেষণার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবে।
গবেষণা সংক্রান্ত কোর্স ওয়ার্ক শুরুর পুর্বেই শিক্ষার্থীদের গবেষণার মৌলিক দক্ষতা হাতে-কলমে শেখানো অত্যন্ত জরুরি। এতে করে তারা উক্ত কোর্স ওয়ার্কটি আরও সফলতার সহিত শিখতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে গবেষণাপত্র পাঠ ও পর্যালোচনা, গবেষণা-প্রশ্ন তৈরি, সাহিত্য পর্যালোচনা, গবেষণা-পদ্ধতি নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখার মতো দক্ষতা ধাপে ধাপে শেখাতে হবে। শুরুতেই এসব শিক্ষার্থীদের বড় বা জটিল প্রকল্পে যুক্ত না করে ছোট, বাস্তবসম্মত ও সহজে অর্জনযোগ্য গবেষণাকর্মে যুক্ত করা উচিৎ। এতে তাদের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস দুটোই বাড়বে। শিক্ষক নিজে গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করে দেখাতে পারেন, কীভাবে একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন থেকে গ্রহণযোগ্য গবেষণা ও প্রকাশনার দিকে ধাবিত হওয়া যায় তা হাতে-কলমে শেখাতে পারেন।
আমাদের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত না বানিয়ে তা অতিক্রম করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সীমাবদ্ধতাকে অসমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে না দেখে বরং সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। গবেষণাগার, অর্থায়ন কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব থাকলেই গবেষণা থেমে থাকতে হবে—এমন ধারণা থেকে তরুণদের বের করে আনতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ তরুণদের যতটুকু গবেষণা ভীতি তার অধিকাংশই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের গবেষণা বহির্ভূত তত্ত্বীয় পাঠদান ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তাদের সামনে আমাদের গবেষণা সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরার কারণে। এই ভীতি দূরীকরণে প্রাথমিক পর্যায়ে তরুণদের সাহিত্যভিত্তিক পর্যালোচনা, উন্মুক্ত উপাত্তের বিশ্লেষণ, পদ্ধতিগত পর্যালোচনা, মেটা-অ্যানালাইসিস, বিদ্যমান গবেষণার পুনর্বিশ্লেষণ এবং কম ব্যয়সম্পন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার মতো উপযুক্ত পদ্ধতিতে কাজ শুরু করা যেতে পারে। এগুলোর অধিকাংশই ডেটাবেইজ হওয়ায় খরচ নেই বললেই চলে। গবেষণার ধরন অনুযায়ী তাদেরকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করাও জরুরী। সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, অন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করা গবেষক শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তরুণ গবেষক সমাজের জন্য শিক্ষককে শুধু নির্দেশক নয়, পরামর্শদাতা ও সহযাত্রী হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। শ্রেণিকক্ষকে উচ্চশিক্ষার সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। গবেষণার শুরুতে ভুল হওয়া, ফলাফল প্রত্যাশামতো না আসা কিংবা প্রবন্ধ প্রত্যাখ্যাত হওয়া এগুলো স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। এমনকি ক্যারিয়ারের শুরুতে করা কিছু কিছু প্রবন্ধ চিরতরে প্রত্যাখ্যান হওয়াও ভয়ের কারণ নয়। এগুলো একজন গবেষকের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিজ্ঞান চর্চার পথকে দ্বিধাহীনভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত না করে ভুল থেকে বরং শেখার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তাদের সাথে নিয়মিত গবেষণা আলোচনা, গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া, অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণের কাজগুলো করে যেতে হবে। শিক্ষকদের উচিৎ তাদের নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা ও সাফল্যের গল্পগুলো তরুণ গবেষদের সাথে নিয়মিত শেয়ার করা, এতে তারা বাস্তবতা শেখে ও গবেষণায় অনুপ্রাণিত হয়।
তরুণদের গবেষণায় নৈতিকতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য গবেষক শিক্ষকদের দৃশ্যত ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ - দ্রুত প্রকাশনা বা অধিক সংখ্যক প্রবন্ধের চেয়ে মৌলিকত্ব, নির্ভরযোগ্যতা এবং সমাজের জন্য তথা বাস্তব জীবনে গবেষণার উপযোগিতাকে কাজে লাগানো অধিক গুরুত্বের। প্লেজিয়ারিজম, তথ্য জালিয়াতি, ফলাফল বিকৃতি, অনৈতিক লেখকত্ব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শুরুতেই সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে যথাযথ উদ্ধৃতি প্রদান, গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ, স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ এবং গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অধিকার রক্ষার বিষয়েও অবগত করতে হবে। মূলকথা, গবেষণার প্রতিটি পদক্ষেপের গুরুত্ব ও করণীয় সম্পর্কে তরুণ গবেষকদের প্রয়োজনীয় দিক-নির্দশনা দিতে হবে যেন তারা ভুল করার আগেই এসব বিষয় জানতে পারে। গুরুর অপারগতায় শিষ্য ভুল করলে তা হয় গুরুর, কিন্তু বিষয়টি পরিস্কার করে দেয়ার পরেও শিষ্য ভুল করলে তা তার (শিষ্যের) ভুল নয় বরং অপরাধ।
দেশীয় গবেষণাকে দ্রুত ও টেকসই পন্থায় এগিয়ে নিতে দেশ ও বিদেশে গবেষণার সুযোগ ও সহযোগিতার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ গবেষকদের নিয়মিত গবেষণা সংক্রান্ত সেমিনার, কর্মশালা, বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, গবেষণা-সহযোগিতা এবং আন্তবিভাগীয় প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। অভিজ্ঞ গবেষক, দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র গবেষণা অনুদান, শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাবৃত্তি, উন্মুক্ত শিক্ষাসামগ্রী এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণে শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
যদিও তরুণ গবেষকদের বিকাশের দায়িত্ব কেবল তাদের নিজেদের কিংবা শিক্ষকদের নয়, এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় নীতিরও সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে - তবে গবেষক শিক্ষকদের উচিত নিজেদের গবেষণার পাশাপাশি নতুন গবেষক তৈরি করাকে পেশাগত দায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। শিক্ষকদের এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার কৌতূহল জাগানো; তাদের দক্ষতার বিকাশ ঘটানো, মানসিক সাহস জোগানো, সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা এবং গবেষণার নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে। আজকের একজন উৎসাহী তরুণ গবেষক আগামী দিনের একজন দক্ষ বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক কিংবা গবেষণানেতা। পরিশেষে, তরুণদের গবেষণা শেখানোর ব্যাপারে শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকার সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেশে টেকসই জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবাইকেই একযোগে কাজ করতে হবে।
লেখক: ড. মো. তরিকুল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফার্মেসি বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।