জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা: সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতার বয়স ১৮ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে এখানে ধর্ম অবমাননা কিংবা ধর্মীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী কোনো কর্মকাণ্ড দেখিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই শাঁখারীবাজার ও লক্ষ্মীবাজার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে অনেক হিন্দু ভাই-বোনের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্প্রীতির চর্চা রয়েছে।
জবির কেন্দ্রীয় মসজিদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাশে অবস্থিত। যতটুকু জানি, মসজিদের জায়গাটি জগন্নাথ বাবুদের দান করা জমি নয়; এটি অন্যদের দান করা সম্পত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মসজিদ। আগে লক্ষীবাজার, শাঁখারীবাজারের দিক থেকে সাধারণ মানুষ এসে এখানে নামাজ পড়তেন। এখন বাইরের মানুষের প্রবেশ সীমিত। কলেজ আমলেই রাস্তার দিকে দেয়াল তুলে মসজিদটিকে ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে।
মাত্র সাত একরের এই ছোট ক্যাম্পাসে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। জায়গার স্বল্পতার কারণে এখানে সবাইকে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হয়।
হিন্দু শিক্ষার্থীদের পূজায় সাধারণত জবিতে অনেক পূজামণ্ডপ তৈরি হয়। কারণ, প্রায় প্রতিটি বিভাগের উদ্যোগে পূজামণ্ডপ বানানো হয়। এমনকি কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে মাত্র দশ গজ দূরেও পূজামণ্ডপ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মানুষ মসজিদের টয়লেট ও পানি ব্যবহার করেন। মসজিদের এত কাছে পূজামণ্ডপ হওয়া সত্ত্বেও কোনো মুসলমানকে এ নিয়ে কখনো অভিযোগ করতে দেখিনি।
হিন্দু-মুসলিম শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে বসে মসজিদের বারান্দায় খাবার খায়। আমরা শিক্ষকরা একই টেবিলে হিন্দু সহকর্মীদের সঙ্গে খাবার খাই। কখনো গরুর গোস্ত রান্না হলে হিন্দু সহকর্মীদের জন্য খাসি কিংবা মুরগির মাংস রান্না করা হয়। এভাবেই তো আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে চলছি।
কিন্তু এবার কী হলো? কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ কেউ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুললেন? মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে হিন্দু শিক্ষার্থীরা ‘মৌলবাদ’ স্লোগান দিল? এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক ঘটনা। এর আগে কখনো ধর্ম নিয়ে এমন ঘটনা শুনি নাই। জবিতে নতুন কী যোগ হলো, যা এই সমস্যা তৈরি করেছে?
একটু পেছনে ফিরে যাই। জবির কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামটি জরাজীর্ণ, টয়লেটের সংখ্যাও অপর্যাপ্ত। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অডিটোরিয়াম সংস্কার ও দুটি টয়লেট নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। আলোচনা অনুযায়ী, অডিটোরিয়ামের সংস্কারকাজ শেষের দিকে এলে টয়লেট নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল, যাতে কাজগুলো একসাথে শেষ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ টয়লেট নির্মাণের জন্য দুটি স্থান নির্ধারণ করেছিল। একটি মুক্তমঞ্চের পাশে, অর্থাৎ মুক্তমঞ্চ ও সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মাঝখানে (যেখানে এখন মন্দির); অন্যটি সাজিদ ভবনের দিকে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী টয়লেট নির্মাণের জন্য ইটও আনা হয়েছিল।
আমার জানা ও স্মরণ অনুযায়ী, প্রায় দশ মাস আগে শবেবরাতের সময় টয়লেট নির্মাণের জন্য আনা সেই ইটগুলোকে কেন্দ্র করেই ঘটনাটির সূত্রপাত। শবেবরাতের রাতে যখন অনেকে ইবাদতে ব্যস্ত, তখন একদল হিন্দু শিক্ষার্থী ওই জায়গায় মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। টয়লেট নির্মাণের জন্য আনা ইট ব্যবহার করে সেখানে মন্দিরের কাঠামো তৈরি শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়াই এভাবে টয়লেটের জন্য নির্ধারিত জায়গায় জোরপূর্বক তারা মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করে।
মন্দির নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলতে থাকেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তারা ক্যাম্পাসে মন্দির নির্মাণ করতে চেয়েছিলো, কিন্তু অনুমতি পাননি। এদিকে জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকায় হিন্দু ভোটের প্রত্যাশায় থাকা রাজনৈতিক পক্ষগুলো বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন কোনো অবস্থান নেয়নি। কেউ কেউ নেপথ্যে ইন্ধন দিয়েছে বলেও তখন অভিযোগ শোনা গিয়েছে। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানা চেষ্টা করেও বিষয়টির সমাধান করতে পারেনি। একপর্যায়ে মন্দিরটি চালু হয়। সমাজকর্ম ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ঠিক সামনে, ভবন থেকে মাত্র পাঁচ গজ দূরে মন্দিরটি স্থাপিত হওয়ায় সমাজকর্ম বিভাগ থেকে তৎকালীন উপাচার্যের কাছে মন্দির অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মন্দিরটি সরানো হয়নি কিংবা সরানো যায়নি।
সেই সময়ের অমীমাংসিত বিষয়টিই আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কেন মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তার পেছনে কী কারণ ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে জায়গার সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ মন্দির ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
মূল সমস্যাটি কোথায়
মুক্তমঞ্চকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন হয়ে আসছে। সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা এখানে আয়োজন করে। ঈদ উপলক্ষে সেখানে গরু জবাই হয়, মাহফিল হয়, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা খাবারের আয়োজন করে, পুজা-পার্বণ, নাচ-গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজন হয়। মুসলিম শিক্ষার্থীদের ভোজে অনেক সময় গরুর গোস্ত রান্না করা হয়। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত সামাজিক জীবনেরই অংশ।
কিন্তু মন্দিরটি মুক্তমঞ্চের একেবারে কাছে হওয়ায় এখন বিভিন্ন আয়োজনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অলরেডি যেটি শুরু হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর কি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে? শিক্ষার্থীদের খাবারের আয়োজন কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কোনো ধর্মীয় স্থাপনার উপস্থিতির কারণে বিতর্কিত করে তোলা হলে তা কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।
একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—মন্দির নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে যে ইটের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মূলত টয়লেট নির্মাণের জন্য আনা হয়েছিল। এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা দরকার। তাছাড়া ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ছেলে-মেয়েদের আয়োজিত অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে; এটিও পরিস্কার হওয়া দরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে, এমন যেকোনো উদ্যোগ সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নতুন ক্যাম্পাসে মন্দির নির্মাণের জন্য বড় পরিসরে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানি। সুতরাং বর্তমান ক্যাম্পাসের জায়গা নিয়ে বিরোধ তৈরি না করে, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা প্রয়োজন।
মুক্তমঞ্চকে কোনো ধর্মের কারণে আবদ্ধ করবেন না, প্লিজ। মুক্তমঞ্চ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকুক। বছরের পর বছর এটি সকল ধর্মের জন্য মুক্ত ছিল; এখনো উন্মুক্ত থাকুক। সেখানে কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নীতি প্রযোজ্য হতে হবে। আজ যদি মন্দিরের সামনে অনুষ্ঠান হচ্ছে; এই যুক্তিতে কোনো আয়োজন বাধাগ্রস্ত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মুক্তমঞ্চে কোরআন তিলাওয়াত হলে কেউ বলতে পারেন, মন্দিরের সামনে মাইকে কোরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে। একইভাবে, মুক্তমঞ্চের সামনে শিক্ষার্থীদের খিচুড়ি পার্টিকেও মন্দিরের সামনে আয়োজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অপচিন্তা থেকে থেকে বের হওয়া কল্যাণকর।
এভাবে চলতে থাকলে ছোট একটি জায়গাকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয় ধর্মীয় বিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই বিষয়টির সুন্দর সমাধান করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিতে হবে। সবার জন্য ন্যায়সংগত ও সমান নিয়ম নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের ক্যাম্পাস অত্যন্ত ছোট। এখানে কারও জন্যই নিজের নির্ধারিত পরিসরের বাইরে পর্যাপ্ত breathing space নেই। তাই এই সীমিত জায়গায় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের বিকল্প নেই।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান ও সম্প্রীতির একটি পরিচিত উদাহরণ। সামান্য জায়গার বিরোধ কিংবা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে সেই ঐতিহ্য নষ্ট হোক, তা আমরা কেউই চাই না। মুক্তমঞ্চ সবার থাকুক, ক্যাম্পাস সবার থাকুক। ধর্মীয় সম্প্রীতি অটুট থাকুক।
লেখক:
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।