১০ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৩২

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস: মানসিক সুস্থতা হোক বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার

মাকসুদুর রহমান   © টিডিসি ফটো

মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকার মানে শুধু মানসিক রোগ থেকে মুক্ত থাকা নয়। বরং, এর অর্থ নিজের আবেগ ও চাপ সামলাতে পারা, প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়া, সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে অর্থপূর্ণভাবে যুক্ত থাকতে পারা। অথচ বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি এখনো সামাজিক কলঙ্ক, চিকিৎসার সীমিত সুযোগ এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের ঘাটতির মধ্যে আটকে আছে। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যার ঝুঁকি, পারিবারিক সহিংসতা, বেকারত্বজনিত হতাশা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, মাদকাসক্তি এবং ডিজিটাল জীবনের নানা সংকট; সব মিলিয়ে মানসিক সুস্থতা আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

১০ অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। দিনটি শুধু সচেতনতামূলক আলোচনা, সেমিনার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষ সহজে, সাশ্রয়ে, বৈষম্যহীনভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে সেবা পাবেন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে মানসিক সুস্থতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ ডব্লিউএইচও (WHO) - এর ‘’স্পেশাল ইনিশিয়েটিভ ফর মেন্টাল হেলথ ‘’- এর অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের ‘’ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ রিপোর্ট’’ - স্পষ্ট করে যে মানসিক স্বাস্থ্যকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাংলাদেশের জন্যও এই সতর্কবার্তা প্রাসঙ্গিক। এখানে চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী: একদিকে মানসিক সমস্যার ঝুঁকির কারণগুলো মোকাবিলা করতে হবে, অন্যদিকে- চিকিৎসা, পরামর্শ, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের ‘’প্রিভেনশন এন্ড ম্যানেজমেন্ট অফ মেন্টাল হেলথ কন্ডিশনস ইন বাংলাদেশঃ এ কেস ফর ইনভেস্টমেন্ট’’  প্রতিবেদন মানসিক, স্নায়বিক ও মাদকদ্রব্য-সম্পর্কিত সমস্যার স্বাস্থ্যগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশ্লেষণ করেছে। এতে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, সাইকোসিস, বাইপোলার ডিসঅর্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং জনপর্যায়ের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে বিনিয়োগের সম্ভাব্য সুফল তুলে ধরা হয়েছে। মানসিক অসুস্থতা শুধু ব্যক্তির কষ্টই বাড়ায় না; কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি, কর্মদক্ষতা হ্রাস, পারিবারিক আর্থিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমেও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়কে নিছক চিকিৎসার খরচ না ভেবে মানবসম্পদ ও জাতীয় উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

শিশু ও শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রশ্ন

বাংলাদেশের শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশেষভাবে ভাবা প্রয়োজন। পরীক্ষার ফলাফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা, পরিবারের প্রত্যাশা, চাকরির অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা অনেকের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তবে কোনো শিক্ষার্থীর মানসিক সংকটের পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ কাজ করে। তাই আত্মহত্যা বা বিষণ্ণতাকে কোনো একটি ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথার্থ নয়।

শিশুর মানসিক বিকাশ কেবল তার ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় নয়; শেখার সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক আচরণ এবং পরবর্তী জীবনের কর্মক্ষমতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। শৈশবে নির্যাতন, অবহেলা, পারিবারিক অস্থিরতা, অপুষ্টি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে- নিরাপদ পরিবার, সহমর্মী শিক্ষক, খেলাধুলা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং বয়সোপযোগী সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষা- শিশুকে চাপ সামলানো, আবেগ প্রকাশ ও অন্যের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। 

সরকারের উচিত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা করা। শিক্ষকদের শিশুদের মানসিক সংকটের প্রাথমিক লক্ষণ চেনার প্রশিক্ষণ দেয়া। বুলিং, র‍্যাগিং, যৌন হয়রানি ও শারীরিক শাস্তি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাশাপাশি অভিভাবকদের বোঝানো এবং শেখানো যে- শিশুর ভয়, দুঃখ বা হতাশাকে অবজ্ঞা না করে, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত।  

এছাড়া ধারাবাহিক সহায়তা, গোপনীয়তা, বিশেষজ্ঞের কাছে রেফারেল এবং সংকটাপন্ন শিক্ষার্থীর জন্য দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। মানসিক সমস্যায় ভুগছে বলে কোনো শিক্ষার্থী যেন অপমান, বৈষম্য কিংবা শিক্ষাজীবনে অযৌক্তিক বাধার মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানবিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা

আত্মহত্যা প্রতিরোধ বাংলাদেশের জন্য একটি জরুরি মানসিক ও জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ, নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন উৎসে আত্মহত্যার সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে; কারণ জরিপ, পুলিশি নথি ও আন্তর্জাতিক অনুমানের তথ্য সংগ্রহ এবং হিসাবের পদ্ধতি এক নয়। এই পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা বিশেষ জরুরি। 

আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে অপরাধী বা সামাজিকভাবে কলঙ্কিত মানুষ হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে- এমন একজন সংকটাপন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা কার্যকর করা, সংকটাপন্ন মানুষের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছানো, বিপজ্জনক উপকরণে প্রবেশাধিকার কমানো এবং সংবাদমাধ্যমে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সংবাদমাধ্যমের- আত্মহত্যার সংবাদে চাঞ্চল্যকর শিরোনাম, পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ কিংবা অনুমাননির্ভর কারণ তুলে ধরার পরিবর্তে দায়িত্বশীল ভাষা, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং সহায়তা পাওয়ার পথ জানানো প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যা নিয়ে বিদ্রূপ ও অপমানের সংস্কৃতিকে প্রতিরোধ করতে হবে।

বিএনপি সরকারের উদ্যোগ: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব ফলাফলে 

সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি মানসিক রোগে আক্রান্ত। বিএনপির ৩১ দফার ২৬ নম্বর দফায় ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ ও সর্বজনীন চিকিৎসার অঙ্গীকার করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌর ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট (PHCU) স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও বাড়তে পারে। কারণ, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। তবে রোগপ্রবণতা ও চিকিৎসা গ্রহণের হার নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পরিসংখ্যানের সময়কাল ও পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় সঠিক জাতীয় চিত্র পেতে নিয়মিত জরিপ জরুরি।

২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব উদ্যোগের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নেও সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল-কলেজে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এক দিনের প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, বুলিং ও হয়রানি প্রতিরোধ, গোপনীয় পরামর্শ এবং সংকটাপন্ন শিক্ষার্থীদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা। 

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস ও সমস্যা মোকাবিলার দক্ষতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

মানসিক সুস্থতা দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, পারিবারিক সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধ, গোপনীয় কাউন্সেলিং এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 
মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও শাস্তি ও সামাজিক অপমানের পরিবর্তে চিকিৎসা, প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনে গুরুত্ব দিতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, জনবল, সেবার আওতা ও ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি ২০২২ এবং কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০–২০৩০ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের তাৎপর্য এখানেই যে, মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ মানে মানুষের মর্যাদা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, অবকাঠামো কিংবা শিক্ষার হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানসিকভাবে সুস্থ জীবন যাপন করতে পারছেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

তাই, মানসিক স্বাস্থ্যকে গৌণ চিকিৎসাসেবা হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ তাই বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের দাবী- ১০ অক্টোবরের অঙ্গীকার যেন পরদিনই বিস্মৃত না হয়। বরং তা পরিণত হোক রাষ্ট্রীয় বাজেট, কার্যকর সেবা, সামাজিক সহমর্মিতা এবং মানুষের জীবনের দৃশ্যমান পরিবর্তনে।

লেখকঃ মাকসুদুর রহমান, সহ-সভাপতি, 
মতিঝিল থানা, 
ঢাকা মহানগর জিয়া পরিষদ।