আমরা কি আবারও জাহেলিয়াত যুগে ফিরে যাচ্ছি?
শুনেছি, জাহিলিয়াতের যুগ ছিল মানবসভ্যতার এক অন্ধকার অধ্যায়—যে সময়ে নিষ্পাপ কন্যাশিশুকে পর্যন্ত জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো। কুরআন সেই নির্মমতার সাক্ষ্য দিয়ে প্রশ্ন করেছে—“কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” হাজার হাজার বছর পেরিয়ে আমরা কি তবে আবারও সেই অন্ধকারের দিকে ফিরে যাচ্ছি?
সভ্যতার এত অগ্রগতি, প্রযুক্তির এত উৎকর্ষ, জ্ঞানের এত বিস্তার—তবু আজও যখন নিষ্পাপ শিশুর ওপর নির্যাতনের খবর শুনি, যখন শিশুহত্যা ও ধর্ষণের মতো বর্বরতা আমাদের সমাজে ঘটে, তখন সত্যিই প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আদৌ সভ্য হতে পেরেছি?
বন্যপ্রাণীর জগৎ কতটা নির্মম, সে তুলনা করার মতো জ্ঞান আমার নেই। কিন্তু মানুষের পরিচয় তো তার বিবেক, মমতা ও মানবিকতায়। সেই মানুষই যখন একটি শিশুর নিরাপত্তা কেড়ে নেয়, তার শৈশবকে পদদলিত করে, কিংবা তার জীবনটুকুও কেড়ে নেয় তখন সভ্যতার সমস্ত অহংকার যেন মুহূর্তেই মিথ্যা হয়ে যায়।
একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে কোনো পরিচয় নিয়ে আসে না। সে জানে না ধর্ম কী, রাজনীতি কী, অর্থনীতি কী, ক্ষমতা কী কিংবা মানুষের তৈরি শ্রেণিবিভাজন কী। সে শুধু জানে, মায়ের কোলে মাথা রাখলে পৃথিবীটা নিরাপদ, বাবার হাত ধরে হাঁটলে পথটা সহজ। একটু বড় হলে সে স্কুলে যাবে, বন্ধু হবে, খেলবে, দৌড়াবে, হাসবে। তার ছোট্ট পৃথিবীজুড়ে থাকবে কিছু স্বপ্ন। কেউ ডাক্তার হবে, কেউ বিচারক, কেউ শিক্ষক, কেউ শিল্পী। আর কেউ হয়তো শুধু ভালো একজন মানুষ হতে চাইবে।
কিন্তু আমরা সেই ছোট্ট মানুষগুলোর পৃথিবীটাকেই নিরাপদ রাখতে পারছি না। বরং কখনো কখনো আমরাই তাদের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে উঠছি।
আমরা কেন এতো নিষ্ঠুর? আমরা কবে মানুষ হবো? এই প্রশ্নটি আজ শুধু কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের পর উঠছে না, কোনো একটি ধর্ষণ, কোনো একটি নির্যাতন কিংবা কোনো একটি শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পরও নয়। প্রশ্নটি উঠছে প্রতিদিন, প্রতিটি সংবাদ শিরোনামের আড়ালে, প্রতিটি মায়ের আতঙ্কে, প্রতিটি বাবার উৎকণ্ঠায়, প্রতিটি শিশুর ভয়ার্ত চোখে। আজ অপ্রতিমের কথা লিখতে বসেও প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে ওঠে।
১৩ বছরের অপ্রতিম, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। কত সাধারণ একটি সকাল! হয়তো তার মাথায় তখন কোনো চিন্তাই ছিলো না! হয়তো নতুন কোনো ছবি তুলবে বলে আনন্দ হচ্ছিল, হয়তো তার মা ভাবছিলেন—কিছুক্ষণ পর ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু সে আর ফিরে আসেনি। অপ্রতিম আর কোনোদিন মায়ের কাছে ফিরে আসবে না। তার ঘর হয়তো থাকবে, তার বই থাকবে, তার স্কুলব্যাগ থাকবে, তার পোশাক থাকবে, হয়তো তার কোনো ছবি ফোনের গ্যালারিতে থাকবে। বন্ধুরা হয়তো কোনোদিন তার কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে যাবে। তার মা হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে কোনো এক বিকেলে কল্পনা করবেন—এই তো, এখনই আমার ছেলে দরজা দিয়ে ঢুকবে। কিন্তু সে আসবে না। একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় শূন্যতা আর কী হতে পারে?
আমরা যারা বাইরে থেকে এই খবর পড়ছি, আমাদের জীবন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই চলবে। আমরা বিকেলে চা খাব, রাতে ঘুমাব, সকালে কাজে যাব। কিন্তু অপ্রতিমের মায়ের কাছে পৃথিবীটা আর কোনোদিন আগের মতো হবে না।
এই জায়গাটিতেই আমাদের থামা দরকার। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—আমরা কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছি? যে বাংলাদেশে একটি শিশু ছবি তুলতে বের হয়ে আর ফিরে আসে না? যে বাংলাদেশে একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়? যে বাংলাদেশে একটি শিশুর শৈশব কোনো অপরাধীর বিকৃতির কাছে পরাজিত হয়? যে বাংলাদেশে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর আমরা কয়েকদিন ক্ষুব্ধ থাকি, তারপর নতুন কোনো খবর আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়? ঠিক এই জায়গায় ই আমাদের আমূল পরিবর্তন জরুরি।
অপ্রতিম একা নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬০৬টি শিশু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তন্মেধ্যে ২৪১ টি শিশু ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
সংখ্যাগুলো পড়লে আমরা হয়তো কিছুক্ষণ থমকে যাই। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বুঝতে পারি, ৬০৬ কোনো নিছক সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল একটি নাম, একটি মুখ, একটি ডাকনাম, একটি স্কুল, কয়েকজন বন্ধু এবং অসংখ্য স্বপ্ন।
কোনো শিশু হয়তো প্রতিদিন মায়ের কাছে আবদার করত—❝মা, আজ পোলাও মাংস খাবো❞। কেউ হয়তো বাবার পকেট থেকে পাঁচ টাকা নিয়ে চকলেট খেতে চাইত। কেউ হয়তো স্কুলের খাতায় আঁকিবুঁকি করত। কেউ হয়তো পরদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেউ হয়তো ভাবনায় বিভোর ছিলো, বড় হয়ে সে কী হবে।
তারপর একদিন তার নাম হয়ে গেল একটি সংবাদ—‘শিশু হত্যা’। কত নির্মম এই শব্দ দুটি! সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, শিশুরা শুধু রাস্তায় নিরাপত্তাহীন নয়, তারা অনেক সময় ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়। যে ঘরে তাদের নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই ঘটে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, এমনকি হত্যাও। ধর্ষণের পর প্রমাণ মুছে ফেলতে শিশুকে হত্যা করা হয়, কখনো লোভের কারণে, কখনো প্রতিশোধের কারণে, কখনো বিকৃত মানসিকতার কারণে একটি শিশুর জীবন শেষ করে দেওয়া হয়। সাত মাসের একটি শিশুর কী অপরাধ? সে তো জানেই না পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা কী।
নয় বছরের ফারজানা ইয়াসমিনের কী অপরাধ ছিল? ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাতক্ষীরায় তৃতীয় শ্রেণির এই শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মরদেহ আলমারির ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। আবার ঝিনাইদহে চার বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনায় আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। লালমনিরহাটের সাত বছরের নন্দিনী নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ বাড়ির পাশের ভুট্টাক্ষেতে মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া যায়। শিশু আছিয়া এবং রামিসার কথা আর কীবা বলবো! আমাদের নৈতিকতা ও বিবেকে পচন ধরেছে। আমাদের সমাজে আরও একটি ভয়ংকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আমরা অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে খুব দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।
প্রথমবার কোনো শিশুর ধর্ষণের খবর পড়লে আমরা আঁতকে উঠি, দ্বিতীয়বার ক্ষুব্ধ হই, তৃতীয়বার একটি পোস্ট শেয়ার করি, চতুর্থবার শুধু স্ক্রল করি, পঞ্চমবার হয়তো বলি—‘আবার!’ এই ‘আবার’ শব্দটির মধ্যেই আমাদের সামাজিক অসাড়তা লুকিয়ে আছে। একটি শিশুর জীবন কোনো ‘আবার’ নয়।
একটি ধর্ষণ কোনো ‘আরেকটি ঘটনা’ নয়। একটি শিশুহত্যা কোনো ‘সংবাদ’ মাত্র নয়। এগুলো আমাদের সমাজের আয়নায় দেখা দাগ। প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের কোথাও বড় একটি ভাঙন তৈরি হয়েছে। শুধু অপরাধীকে দায়ী করলেই কি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে? অবশ্যই অপরাধের দায় অপরাধীরই। কিন্তু শিশু সুরক্ষা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়, শুধু আদালতের দায়িত্ব নয়, শুধু সরকারের দায়িত্বও নয়। এটি পরিবারের দায়িত্ব, শিক্ষকের দায়িত্ব, প্রতিবেশীর দায়িত্ব, সমাজের দায়িত্ব এবং আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
কারণ একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার আগে তার চারপাশে অসংখ্য মানুষ থাকে। কেউ কিছু দেখে, কেউ কিছু শুনে, কেউ সন্দেহ করে, কেউ হয়তো জানেও। কিন্তু সবাই নীরব থাকে। আর কখনো কখনো সেই নীরবতাই অপরাধীকে সাহস দেয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুকে রক্ষা করা দয়া নয়, এটি তার অধিকার।
একটি শিশু নিরাপদে ঘুমাবে, স্কুলে যাবে, খেলবে, হাসবে, স্বপ্ন দেখবে—এসব তার মৌলিক অধিকার। সে কোনো মানুষের রাগ, লোভ, বিকৃত মানসিকতা কিংবা ক্ষমতার শিকার হবে না, এটিও তার অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা এবং নির্যাতনের ঘটনা গোপন না করার সামাজিক সংস্কৃতি প্রয়োজন। কারণ শাস্তি অপরাধের পরে আসে, কিন্তু সুরক্ষা প্রয়োজন অপরাধের আগে।
একটি শিশুর নিরাপত্তা মানে আমাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। তাই আজই আমাদের বদলাতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দ্রুত ও সংবেদনশীলভাবে কাজ করতে হবে এবং বিচারব্যবস্থাকে ভুক্তভোগীবান্ধব করতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। কারণ আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু একটি শিশুকে নিরাপদ রাখার জন্য আমাদের বিবেককেও জাগ্রত থাকতে হবে।
মুহম্মদ সজীব প্রধান
তরুণ কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
ই-মেইল: sajibprodhanbd@gmail.com