জিন্নাহ কি আজও প্রাসঙ্গিক?
ইতিহাসের কিছু মানুষ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যান। কিছু মানুষ থেকে যান। তাদের নিয়ে বিতর্ক হয়। নতুন প্রজন্ম তাদের নতুন চোখে দেখে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তেমনই একজন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্ম ১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের করাচিতে। করাচির নিউনহাম রোডের ‘ওয়াজির ম্যানশন’ তাঁর জন্মস্থান। করাচি তখন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ করাচি ও বোম্বে লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। সেখানে আইন পড়ে ব্যারিস্টার হন। পরে বোম্বে এসে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পান।
নিউজিল্যান্ডের লেখক হেক্টর বলথো জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে ‘জিন্নাহ: ক্রিয়েটর অব পাকিস্তান’ নামে একটি বই লিখেছেন। বইটিতে জিন্নাহর রাজনীতিতে প্রবেশ থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। বইটিতে বলা হয়েছে, ১৯১০ সালে জিন্নাহ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দিলেও কংগ্রেসের সঙ্গেও তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তিতে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ক্ষেত্রে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ১৯২০ সালে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের পদ্ধতির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে কংগ্রেস ছাড়েন তিনি। এরপর লন্ডনে কিছু সময় কাটিয়ে ১৯৩৪ সালে ভারতে ফিরে মুসলিম লীগকে পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি আরও দৃঢ় অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হন জিন্নাহ।
বাংলাদেশের লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘ঢাকায় জিন্নাহ’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর একক নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও পাকিস্তান আন্দোলনের কারণে কোটি কোটি মানুষকে অবর্ণনীয় দুঃখ–কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ গেছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের। এক কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে এত বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আর নেই। অবশ্য ভারতীয় লেখক যশবন্ত সিং তাঁর ‘জিন্নাহ: ইন্ডিয়া–পার্টিশন–ইনডিপেনডেন্স’ বইয়ে উপমহাদেশ ভাগের জন্য জিন্নাহকে এককভাবে দায়ী করার/ক্রেডিট দেয়ার প্রচলিত ধারণা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
তাঁর বিশ্লেষণে, দেশভাগ শুধু জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব বা রাজনৈতিক অবস্থানের ফল ছিল না। এর পেছনে কংগ্রেসের কিছু রাজনৈতিক ভুল, মুসলিম লীগের কৌশল এবং ব্রিটিশদের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
হেক্টর বলথোর ও যশবন্ত সিংয়ের লেখায় জিন্নাহর বক্তব্য ও রাজনৈতিক চিন্তার আলোকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত পাকিস্তানের একটি ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে জিন্নাহকে কেবল মুসলিমদের জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রবক্তা হিসেবে নয়; বরং গণতন্ত্র, সম–অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশী নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় জিন্নাহকে নিয়ে এক ধরনের অদ্ভুত দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। পাকিস্তানে তিনি জাতির পিতা। ভারতে তিনি দেশভাগের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র। বাংলাদেশে তাঁর পরিচয় আরও জটিল। এখানে তিনি একদিকে পাকিস্তান আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সেই কেন্দ্রীয় চরিত্র, যার রাজনৈতিক চিন্তার সীমাবদ্ধতা শেষ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধীনতার পথকে আরও স্পষ্ট ও সুগম করে দেয়।
তাই প্রশ্নটি আজও ফিরে আসে। জিন্নাহ কি বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক? আমার মনে হয়, অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। তবে তাঁকে ভালোবাসা বা ঘৃণা দিয়ে নয়। ইতিহাস দিয়ে দেখতে হবে। জিন্নাহকে বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে তাঁর সময়কে।
ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানরা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কিভাবে নিশ্চিত হবে, সেটি ছিল বড় প্রশ্ন। জিন্নাহ এই প্রশ্নকে সামনে আনেন। তিনি মুসলমানদের দাবিকে শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় করেননি। তিনি এটিকে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতার বণ্টন এবং সাংবিধানিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলেছিলেন। এখানেই তাঁর রাজনীতির শক্তি।
কিন্তু ইতিহাসের মজার ব্যাপার হলো, একটি রাজনৈতিক দাবির সাফল্য সব সময় তার ভবিষ্যৎ ফলাফল নিশ্চিত করে না। জিন্নাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু পাকিস্তান টিকল না। মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে বাংলাদেশ হলো। তাহলে কি পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার জন্য জিন্নাহ দায়ী?
এখানে একটু থামতে হবে। ইতিহাসকে খুব সহজ করে ফেললে সত্যের অনেকটা হারিয়ে যায়। জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে মারা যান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছর পর। তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন অন্যরা। সামরিক শাসন এসেছে। আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা বেড়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি দমন করা হয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলও শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া হয়নি। এসব ঘটনা জিন্নাহর মৃত্যুর পরে ঘটেছে। তাই পাকিস্তানের সব ব্যর্থতার দায় তাঁর কাঁধে চাপানো ইতিহাসসম্মত নয়।
কিন্তু এখানেই আবার আরেকটি প্রশ্ন আসে। জিন্নাহ কি এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, যেখানে কেন্দ্রের ক্ষমতা বেশি ছিল? উত্তরটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাকিস্তানের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। নতুন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছিল বড় চিন্তা। জিন্নাহ একটি অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান ছিল এক ভাষার দেশ নয়। এক সংস্কৃতির নয়। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল হাজার মাইলের অধিক। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল ভিন্ন।
এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করাই পরে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে বড় সংঘাত তৈরি হয় ভাষাকে ঘিরে। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেন। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ভুল। শুধু ভাষার প্রশ্নে নয়। মানুষের পরিচয়ের প্রশ্নে। পূর্ব বাংলার মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাংলায় কথা বলত। বাংলা ছিল তাদের ঘরের ভাষা। সাহিত্যের ভাষা। সংস্কৃতির ভাষা। আবেগের ভাষা। তাই রাষ্ট্র যখন সেই ভাষাকে যথেষ্ট মর্যাদা দিল না, তখন বিষয়টি আর ভাষার মধ্যে থাকল না। এটি রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে গেল। ভাষা আন্দোলন তারই প্রকাশ।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি দ্রুত পূর্ব বাংলার রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে তমদ্দুন মজলিসের প্রকাশিত পুস্তিকায় পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষেত্রে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষা ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় জিন্নাহ ঘোষণা দেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। মার্কিন ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্টের মতে, ভাষাসংক্রান্ত জিন্নাহর এই বক্তব্য ছিল তৎকালীন পাকিস্তান রাজনীতির সবচেয়ে উদ্বায়ী, বিতর্কিত ও বিভাজন সৃষ্টিকারী বিষয়। পরে অবশ্য তমুদ্দুন মজলিশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও গোটা দেশের (পূর্ব পাকিস্তান) জনমতের চাপে এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শাসকরা সংবিধানে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন (১৯৫৬)।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার একমাত্র কারণ ভাষা ছিল না। অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। রাজনৈতিক বঞ্চনা ছিল। প্রশাসনিক বৈষম্য ছিল। সামরিক-আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য ছিল। গণতন্ত্রের সংকট ছিল। ১৯৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার ছিল। অর্থাৎ ১৯৭১ একদিনে তৈরি হয়নি। জিন্নাহর ভাষানীতি সেই দীর্ঘ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা মাত্র।
এখানে জিন্নাহর রাজনীতির একটি বড় দ্বন্দ্ব দেখা যায়। তিনি মুসলমানদের নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য থেকে মুসলমানদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের ভেতরে গিয়ে তিনি নিজেই একটি নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘু বাস্তবতার মুখোমুখি হলেন। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় তারা ছিল দুর্বল। এটি ইতিহাসের এক বড় পরিহাস।
যে রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল, সেই যুক্তির একটি অংশই পরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। জিন্নাহর কাছে মুসলিম ঐক্য ছিল রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি। কিন্তু বাংলার অনেক নেতার কাছে মুসলিম ঐক্যের পাশাপাশি বাংলার স্বাতন্ত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানে এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশেম, মওলানা ভাসানী এবং পরে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁরা সবাই একই কথা বলেননি। তাঁদের রাজনৈতিক পথও এক ছিল না।
কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার ছিল। বাংলার মানুষ শুধু ধর্ম দিয়ে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করতে চায়নি। বাংলা ভাষা তাদের পরিচয়ের অংশ ছিল। বাংলার সংস্কৃতি ছিল। বাংলার অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল। বাংলার রাজনৈতিক অধিকার ছিল।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভাষাতেও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের একটি ধারণা ছিল। সেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম একক হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছিল। পরে সেই ধারণা বদলে একক পাকিস্তানের দাবিতে পরিণত হয়। এখানেই বাংলার সঙ্গে জিন্নাহর রাজনৈতিক চিন্তার দূরত্ব বাড়তে থাকে।
অবশ্য জিন্নাহ সব সময় অবিভক্ত বাংলার বিরোধী ছিলেন—এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু স্বাধীন যুক্তবাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন। জিন্নাহ এই উদ্যোগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কারণ অবিভক্ত বাংলা পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারতো। কিন্তু এটি তাঁর মূল রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল না। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটিও সফল হয়নি।
তাহলে জিন্নাহকে আমরা কীভাবে দেখব? একজন নিখুঁত নেতা হিসেবে? না। একজন খলনায়ক হিসেবে? তাও না। ইতিহাসে বড় নেতারা সাধারণত এত সরল হন না। জিন্নাহর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল রাজনৈতিক সংগঠন ও দর-কষাকষির ক্ষমতা। তিনি মুসলিম লীগের দুর্বল সংগঠনকে শক্তিশালী করেছিলেন। মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবিকে ব্রিটিশ ও কংগ্রেস নেতৃত্বের সামনে বড় প্রশ্নে পরিণত করেছিলেন।
কিন্তু তাঁর বড় সীমাবদ্ধতাও ছিল। তিনি পাকিস্তানের ভেতরের ভাষাগত ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারেননি। একটি অভিন্ন মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে একটি বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে রাখা সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নের কার্যকর উত্তর তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় পাওয়া যায় না। এখানেই বাংলাদেশের জন্য জিন্নাহ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু ১৯৭১ দেখলে হবে না। ১৯৪৭-ও দেখতে হবে। ১৯৪৮-ও দেখতে হবে। ভাষা আন্দোলন দেখতে হবে। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন দেখতে হবে। ছয় দফা দেখতে হবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন দেখতে হবে। এই পুরো পথের শুরুতে পাকিস্তান আন্দোলন ছিল। আর সেই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিলেন জিন্নাহ। অর্থাৎ বাংলাদেশকে বুঝতেও জিন্নাহকে বুঝতে হয়।
তবে জিন্নাহকে বুঝতে গিয়ে আরেকটি ভুল করা উচিত নয়। তাঁর মৃত্যুর পরের সব ঘটনাকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিকল্পনার ফল বলা ঠিক নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরবর্তী নেতৃত্বেরও দায়িত্ব ছিল। সামরিক শাসকদের দায়িত্ব ছিল। আমলাতন্ত্রের দায়িত্ব ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের গণতান্ত্রিক রায় অস্বীকার করার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তারও দায় আছে।
১৯৭১ সেই দীর্ঘ ব্যর্থতার চূড়ান্ত ফল। বাংলাদেশের জন্ম তাই শুধু একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল না। এটি ছিল একটি রাষ্ট্রকাঠামোর সীমাবদ্ধতারও প্রকাশ। এই জায়গায় জিন্নাহ আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তাঁর ইতিহাস আমাদের একটি সহজ শিক্ষা দেয়। শুধু অভিন্ন ধর্ম কোনো রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। শুধু জাতীয় পতাকা কোনো রাষ্ট্রকে এক করে রাখতে পারে না। শুধু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না। মানুষের ভাষাকে সম্মান করতে হয়। সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিতে হয়। অর্থনৈতিক অধিকার দিতে হয়। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হয়। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের জায়গা রাখতে হয়। সবচেয়ে বেশি দরকার গণতন্ত্র।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। তিনি মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের ভেতরে সেই নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্বের ধারণা সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমানভাবে কার্যকর করা যায়নি। ফলে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। জিন্নাহ কি ব্যর্থ ছিলেন? এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে দেখলে তিনি সফল। মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তিনি সফল। কিন্তু একটি বহুভাষিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্রের জন্য টেকসই ক্ষমতা-বণ্টনের কাঠামো তৈরি করতে তিনি সফল হননি।
আবার এটাও সত্য, সেই কাঠামোর ব্যর্থতার পুরো দায় তাঁর নয়। তাই জিন্নাহকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শুধু দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করার চেয়ে তাঁর রাজনীতির ভেতরের দ্বন্দ্বগুলো বোঝা বেশি জরুরি। তিনি ছিলেন একদিকে রাজনৈতিক নিরাপত্তার দাবির নেতা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রচিন্তার প্রবক্তা। তিনি সংখ্যালঘু অধিকারের কথা বলেছেন। আবার এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করেছেন, যেখানে পরে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি মুসলিম ঐক্যের শক্তি দেখিয়েছেন। পাকিস্তানের ইতিহাস আবার দেখিয়েছে, শুধু ধর্মীয় ঐক্য দিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য মুছে ফেলা যায় না।
আজকের দক্ষিণ এশিয়ায় তাই জিন্নাহকে নতুন করে পড়ার/গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। কোনো পূজার জন্য নয়। কোনো ঘৃণার জন্যও নয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নিজেদের সেই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার মনে করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের যেমন অধিকার আছে, সংখ্যালঘুরও আছে। কেন্দ্রের যেমন ক্ষমতা আছে, প্রদেশেরও আছে। রাষ্ট্রের যেমন পরিচয় আছে, মানুষেরও নিজস্ব পরিচয় আছে। জিন্নাহর ইতিহাস আমাদের সেই জায়গাটিই দেখায়।
একটি রাষ্ট্র বানানো কঠিন। কিন্তু রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করা আরও কঠিন। পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল একটি রাজনৈতিক স্বপ্ন নিয়ে। বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে সেই রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে। এই দুই ইতিহাসকে আলাদা করে দেখলে জিন্নাহকে বোঝা যাবে না। তাই জিন্নাহ আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁকে অনুসরণ করার জন্য বা তাঁকে অস্বীকার করার জন্য নয়। বরং রাষ্ট্র, নাগরিক অধিকার, ধর্ম, ভাষা, গণতন্ত্র ও ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্নগুলো নতুন করে করার জন্য।
লেখক: এম এ মতিন
উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র