মাদকের ভয়াল থাবা : ভবিষ্যত প্রজন্মের ওপর একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন
দেবদাস বলিল, ‘মদ খাই কেন জানিস? শুধু তোকে ভুলে থাকার জন্য।’ চুনিলাল হাসিয়া বলিল, ‘কিন্তু মদ খাইলে কি মানুষকে ভোলা যায়?’ দেবদাস দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল, ‘না, ভোলা যায় না। কিন্তু নেশার সময়টুকু অন্তত যন্ত্রণাটা টের পাওয়া যায় না।’
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘দেবদাস’-এর এই অনবদ্য সংলাপটি কেবল কোনো সাহিত্যিক চরিত্রের আত্মযন্ত্রণা নয়; এটি শতাব্দীজুড়ে নেশার মরণফাঁদে পা দেওয়া কোটি কোটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সত্য। মানুষ সাময়িক বিষাদ কিংবা কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে নেশার জগতে প্রবেশ করে, কিন্তু কালক্রমে সেই নেশাই তার পরম শত্রুতে পরিণত হয়ে জীবনের শেষ আলোটুকুও নিভিয়ে দেয়। বাংলা সাহিত্যের দেবদাস থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্যের অসংখ্য চরিত্রে মাদকের আত্মবিনাশী রূপ আমরা দেখেছি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এই ভয়াবহতা আর সাহিত্যের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই— তা রূপ নিয়েছে এক প্রাণঘাতী সামাজিক মহামারীতে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক সুবিধা পেতে হলে তরুণদের স্বাস্থ্যবান, দক্ষ ও মানসিকভাবে দৃঢ় হওয়া অপরিহার্য। কিন্তু আজ বাংলাদেশে এক বিরাট অংশের তরুণ ও কিশোর মাদকাসক্তির কবলে পড়ে ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং আধুনিক যুগের ভয়াল কেমিক্যাল মাদক যেমন এলএসডি (LSD) ও ক্যাটামিন তরুণদের মস্তিষ্ক ও কর্মক্ষমতা পুরোপুরি পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বৈশ্বিক ও জাতীয় পরিসংখ্যানে মাদকের ভয়াবহ চিত্র
জাতিসংঘ (UNODC) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ জাতীয় গবেষণায় বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির এক আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে; যেখানে দেখা যায় বর্তমানে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮%) অবৈধ মাদকে আসক্ত, যার মধ্যে এককভাবে ঢাকায় ২২.৯ লাখ এবং চট্টগ্রামে ১৮.৮ লাখ ব্যবহারকারী থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে ময়মনসিংহ (৬.০২%) ও রংপুর (৬%) সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। সর্বনাশা এই বিষের শীর্ষে রয়েছে গাঁজা (৬১ লাখ) ও ইয়াবা (২৩ লাখ), আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের প্রায় ৯২% আসক্তই তাদের শৈশব কিংবা উদীয়মান তরুণ বয়সে (৩৩% মাত্র ৮-১৭ বছরে এবং ৫৯% ১৮-২৫ বছর বয়সে) প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করে। ৯০% ব্যবহারকারী মাদকের অতি-সহজলভ্যতাকে আসক্তির প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করলেও এবং প্রায় অর্ধেক আসক্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে মাত্র ১৩% মানুষ সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা পাচ্ছেন। তাছাড়া ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের মতো প্রাণঘাতী রোগের চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন, যা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে মাদক কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং এটি দ্রুত সমাধান না করলে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ ও পুরো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেবে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ জনশক্তির ওপর একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন।
মাদক নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে মানব জীবন, বিবেক ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে মাদকদ্রব্যকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও 'হারাম' ঘোষণা করা হয়েছে। মদ বা যেকোনো নেশাজাতীয় বস্তু মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জ্ঞানকে গ্রাস করে নেয়। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা সুরা আল-মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াতে মাদককে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন: ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ—এসবই তো শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সুরা আল-মায়েদা: ৯০)
হাদিস শরিফের আলোকপাত
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাদকের ক্ষুদ্রতম ব্যবহারকেও কঠোরভাবে বর্জন করতে বলেছেন: ‘যে বস্তুর অধিক পরিমাণ ব্যবহারে নেশা সৃষ্টি হয়, তার স্বল্প পরিমাণও হারাম।” (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ১৮৬৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৮১) অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা.) মাদককে সমস্ত পাপ ও সামাজিক অপরাধের চাবিকাঠি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন: ‘মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্য হলো সকল অপকর্মের মূল (উম্মুল খাবায়েস)।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫৬৬৬) ইসলামী জীবনব্যবস্থায় শরিয়তের মৌলিক পাঁচটি উদ্দেশ্যের (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) অন্যতম হলো বিবেক-বুদ্ধির সুরক্ষা (হিফজুল আক্বল)। মাদক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে মেরে ফেলে বলেই ইসলামে মাদকের উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয়, বহন ও সেবন—সবকিছুকেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মাদকাসক্তির কারণ
বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে মাদকাসক্তির পেছনে একাধিক পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বন্ধুবান্ধবের চাপ বা কৌতূহলবশত প্রথমবার মাদক গ্রহণ করাই সবচেয়ে সাধারণ সূচনা-বিন্দু, বিশেষত কিশোর-তরুণদের ক্ষেত্রে। এছাড়া পারিবারিক অবহেলা, বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব,
একাকীত্ব এবং মানসিক চাপ মোকাবেলার সঠিক দক্ষতার অভাবকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সামাজিক ও পারিবারিক কারণ: ভাঙা পরিবার, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং অভিভাবকের তত্ত্বাবধানের অভাব। মনস্তাত্ত্বিক কারণ: হতাশা, উদ্বেগ, নিম্ন আত্মসম্মানবোধ এবং জীবনের লক্ষ্যহীনতা। অর্থনৈতিক কারণ: বেকারত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের হতাশায় ঠেলে দেয়।
সহজলভ্যতা: সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মাদক পাচার এবং শহরাঞ্চলে সহজলভ্যতা আসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। বিনোদনের সংকট: গঠনমূলক খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজের সুযোগের অভাব। সমাজবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একাধিক গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক সচেতনতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকলে আসক্তির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার সমস্যাটি বুঝে ওঠার আগেই তা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
মাদকের প্রভাব (একটি পরিবারের গল্প)মাদক যেভাবে সংসারে ভাঙন,অপরাধ, সহিংসতা বাড়ায়
বিখ্যাত আমেরিকান লেখক ডেভিড শেফ (David Sheff) তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'Beautiful Boy'-এ আসক্তির করাল গ্রাস সম্পর্কে লিখেছেন: "Addiction doesn't just destroy the person using; it wrecks the entire family, piece by piece, until everyone is living in constant terror."
মাদকাসক্তি কখনোই কেবল একজন ব্যক্তির সমস্যা থাকে না— তা ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলে গোটা একটি পরিবারকে। ধরা যাক, এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদকে জড়িয়ে পড়ে। শুরুতে সামান্য কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই অভ্যাস কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে সম্পূর্ণ আসক্তিতে পরিণত করে। প্রতিদিনের মাদকের খরচ মেটাতে সে প্রথমে ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে, এরপর বাবা-মায়ের সঞ্চয় ও গয়না চুরি করে, এবং একসময় পারিবারিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও লজ্জা, ভাইবোনদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, আর্থিক সংকট চরমে পৌঁছায় এবং সবচেয়ে দুঃখজনকভাবে পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানের মাদকাসক্তির কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়ে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চেয়েও কঠিন কাজ হলো তার পরিবারের ভাঙা মানসিক অবস্থা পুনর্গঠন করা, কারণ দীর্ঘমেয়াদি এই মানসিক আঘাত পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভীতির জন্ম দেয়, যা সহজে সারে।মাদকাসক্তি একটি ব্যক্তিকে কেবল শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করে না, বরং তাকে ক্রমশ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকের নেশা বজায় রাখতে প্রতিদিন যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তা বৈধ উপায়ে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে উঠলে আসক্ত ব্যক্তি চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা এমনকির সহিংস অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। অপরাধ বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে সংঘটিত ছোট-বড় চুরি ও ছিনতাইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সঙ্গে মাদকের টাকা জোগাড়ের সম্পর্ক রয়েছে। এই প্রভাব পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, যা এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সহিংসতা তৈরি করে। কর্মক্ষেত্রে মাদকাসক্ত কর্মীর উপস্থিতি উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে সুই বিনিময়ের কারণে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি, যা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এটা লিখতে গিয়ে মনে পড়লো ভিক্টোরিয়ান যুগের লেখিকা Anne Brontë এর The Tenant of Wildfell Hall' (উপন্যাস) এর কথা। তিনি সেখানে বলতেছেন "I saw his mind degrade, his physical strength decay, and his affection for me wither away, until nothing remained of the man I had loved but a wreck—a miserable, self-created wreck. উপন্যাসে আর্থার হান্টিংটনের পতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে অ্যান ব্রন্টে যে সত্যটি তুলে ধরেছিলেন, তা কেবল উনিশ শতকের ইংল্যান্ডের কোনো পরিবারের গল্প নয়; এটি যুগে যুগে অ্যালকোহল ও মাদকের মরণফাঁদে পা দেওয়া কোটি কোটি যুবকের সর্বনাশা পরিণতির নির্মম চিত্র।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের আইন ও পদক্ষেপ সমূহ
মাদকের অপব্যবহার ও বিস্তার রোধে বাংলাদেশ সরকার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নিলেও সামাজিক প্রেক্ষাপটের জটিলতায় এই সমস্যার সমাধান এখনো চ্যালেঞ্জিং রয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জোরালো ভূমিকা এবং 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬'-এর কঠোর ধারায় শুধু সরাসরি অপরাধই নয়, বরং সাইবার স্পেস, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অবৈধ মাদক কেনাবেচার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া মাদকপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ 'মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল' পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক বা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র রোধে কঠোর প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ডগ স্কোয়াড চালুর মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র শতভাগ কঠোরতা প্রদর্শন করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিয়মিত অভিযান ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মাদক অপরাধের বিচার দ্রুততর করতে বিশেষ বিচারিক ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়। এছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা, বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার লাইসেন্স প্রদান এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করার মতো উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল আইন বা সরকারের একক প্রচেষ্টায় মাদকের বিস্তার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানো সম্ভব হচ্ছে না, যার অন্যতম প্রধান কারণ আইনশৃঙ্খলার কাঠামোগত সীমার বাইরে থাকা বহুমাত্রিক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সংকট। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান রুট হিসেবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহৃত হওয়া, ডার্কওয়েব বা এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে মাদকের লেনদেন ছড়িয়ে পড়া এবং পারিবারিক সচেতনতার অভাব সরকারেক এই প্রচেষ্টাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে। এসব মিলিয়েই কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যাটির সম্পূর্ণ সমাধান কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা তাই মনে করেন, আইনি কঠোরতার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে চাহিদা হ্রাস, সচেতনতা বৃদ্ধি ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
প্রতিকারের পথ: বিশেষজ্ঞ মতামত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দমন সংস্থা (UNODC) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) উভয়ই তাদের প্রতিবেদনে বারবার জোর দিয়েছে যে, মাদক সমস্যাকে শুধু ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে না দেখে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা প্রতিকারের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতনতা: বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায় থেকেই মাদকবিরোধী শিক্ষা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ়করণ: বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের নিয়মিত যোগাযোগ ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা। চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সম্প্রসারণ: সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানসম্মত নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যাতে চিকিৎসা ব্যয়বহুল না হয়। সামাজিক পুনর্বাসন: আসক্তি থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক পুনঃগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা, যাতে তারা সমাজে ফিরে এসে আবার আসক্তিতে না জড়ায়।
চাহিদা ও সরবরাহ উভয় দিক নিয়ন্ত্রণ: শুধু পাচার রোধ নয়, মাদকের চাহিদা কমাতে সমান গুরুত্ব দেওয়া, যা UNODC তাদের প্রতিবেদনে বারবার সুপারিশ করেছে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা: মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাদকের ইসলামি বিধান ও নৈতিক শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া।
পর্তুগাল মডেল: একটি সফল দৃষ্টান্ত: বিশ্বে মাদক সমস্যা মোকাবিলার একটি উল্লেখযোগ্য সফল দৃষ্টান্ত হলো পর্তুগাল। ১৯৯০-এর দশকে পর্তুগাল ছিল ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ হেরোইন সংকটের শিকার দেশ, রাজধানী লিসবনকে তখন বলা হতো ইউরোপের হেরোইনের রাজধানী। এই সংকট মোকাবেলায় ২০০১ সালে পর্তুগাল একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয়— ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মাদক গ্রহণকে ফৌজদারি অপরাধের পরিবর্তে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসা
ও পুনর্বাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়, যদিও মাদক ব্যবসা ও পাচার তখনও কঠোরভাবে অপরাধ হিসেবেই বহাল থাকে।
এই নীতির ফল ছিল অভাবনীয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পর্তুগালে হেরোইন আসক্তের সংখ্যা প্রায় এক লাখ থেকে কমে ২৫ হাজারে নেমে আসে। মাদকজনিত মৃত্যুর হার পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায়। ইউরোপীয় মাদক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটির মাদকজনিত মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পর্তুগালের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল আসক্ত ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে নয়, বরং রোগী হিসেবে দেখা এবং চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক পুনর্বাসনে বিপুল বিনিয়োগ করা। তবে এটি লক্ষণীয় যে পর্তুগালের এই মডেল একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে সফল হয়েছে, এবং পরবর্তী বছরগুলোতে দেশটিতেও কিছু চ্যালেঞ্জ যেমন মাদক ব্যবহারের সাময়িক পুনরুত্থান ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা দেখা গেছে। তাই যেকোনো দেশের জন্য এই মডেল হুবহু অনুকরণযোগ্য নয়, তবে এর মূল শিক্ষা— চিকিৎসা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পুনর্বাসনে বিনিয়োগ— বিশ্বের যেকোনো দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে।
উপসংহার: মাদকের ভয়াবহতা কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এটি এমন একটি সংকট, যার সমাধানে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন ও সমাজের প্রতিটি স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ইসলাম যেমন মাদককে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মানুষের বিবেক ও পারিবারিক শান্তি রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে যে সচেতনতা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। কঠোর আইন প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়— যতদিন না পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে, ততদিন এই নীরব ঘাতক আমাদের যুবসমাজকে গ্রাস করতেই থাকবে। এখনই সময় সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই গভীর সংকট মোকাবেলার।
লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ।