শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া বন্ধন: কেন দরকার
বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশে শিক্ষার সাথে শিল্পের অসাধারণ সম্পর্ক বিরাজমান। প্রযুক্তি নির্ভর উন্নত দুনিয়ার দেশগুলো শিল্প খাতে অভাবনীয় ও অবিস্মরণীয় অগ্রগতি সাধন করেছে। সেদিক থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত প্রযুক্তি এবং শিল্পের প্রসারে অনেকটাই পিছিয়ে আছে। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষা গ্রহণ করে, চাকরিতে পিছিয়ে পড়ছে। বাড়ছে বেকারত্ব, সেই সাথে শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে হতাশা। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সময় এসেছে আমাদের।
উন্নত দেশে শিল্পের চাহিদার উপর ভিত্তি করে তাদের কারিকুলাম তৈরি এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। প্রতিটি জিনিসই সেখানে নিয়মমাফিক হচ্ছে। সেজন্য তাদের বেকার সমস্যাও খুবই সীমিত বা নাই বললেই চলে। প্রতিটি বিষয়ই উন্নত দেশগুলো সম্পাদন করে আগামীর ৫০ বা তারও বেশি সময় মাথায় রেখে। সেজন্য তাদের কাজগুলো টেকসই এবং গুণগত মানের হয়ে থাকে। এদিক দিয়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ বিষয়ের ঘাটতি আছে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতে করছি, আমার এক বন্ধু অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। সে স্টুডেন্ট ভিসায় দুই দশকেরো বেশি সময় আগে সেখানে গিয়েছিল। বন্ধুর সাথে কয়েক বছর আগে কথা হলে সে বলল, অস্ট্রেলিয়াতে প্রতিটি কাজ পরিকল্পনামাফিক তারা করে থাকে। এমনকি দেশের জন্য কত সংখ্যক নাপিত, রাঁধুনি বা পাচক লাগবে, সেটাও তারা হিসাবের মধ্যে রাখে এবং সেভাবে প্রশিক্ষিত করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দেশের চাহিদার উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করে থাকে। এভাবে প্রতিটি সেক্টরে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল তৈরি করে থাকে। সেজন্য সেখানে বেকার থাকার কোনো সুযোগ নেই।
যেকোনো দেশের শিল্পখাতকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে শিল্পের একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠতে হবে। জ্ঞান বিনিময় ও বিতরণের মাধ্যমেই ইতিবাচক কাজ করা সম্ভব। সরকার পলিসি ও অর্থের সংকুলান করবে, অ্যাকাডেমিয়া বা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান গবেষণা দিয়ে সহযোগিতা করবে এবং শিল্পের মাধ্যমে চূড়ান্ত উৎপাদন পর্যায়ে যাবে।
প্রতিটি স্তরের সাথেই একটা ভালো সম্পর্ক বিরাজমান থাকা দরকার। সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে কাজগুলো আরও সহজতর ও মসৃণ করতে হবে। শিল্পের চাহিদার উপর ভিত্তি করেই সাবজেক্ট এবং কারিকুলাম সাজানো উচিত। আর শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে একটা ঐকতানের ফলে কর্মসংস্থানের সমাধান করা সম্ভব। সজহ ভাষায় বললে, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
আমাদের শিল্প ও অ্যাকাডেমির মধ্যে নেটওয়ার্ক বা যোগাযোগ বাড়িয়ে দূরত্ব কমাতে হবে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হলে উভয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকতে হবে। আর এ সম্পর্কের ফলে আমরা বাস্তবমুখী শিক্ষার দিকে আগাতে পারব এবং আমাদের বেকার সমস্যার সমাধানও হবে। বাস্তবমুখী শিক্ষাকে অধিক পরিমাণে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিল্প-অ্যাকাডেমির সমন্বয়ে যুগোপযোগী কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট করতে হবে; যার বাজার মূল্য দেশে ও বিদেশে আছে। শিল্পের সাথে সমন্বয় করে এমন জিনিস উদ্ভাবন করতে হবে যা সমাজের জন্য প্রয়োজন এবং অর্থমূল্য আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময় সময় ক্যারিয়ার ডে পালন করতে পারে।
এর ফলে শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবনে আরও বেশি উৎসাহিত হবে। শিল্প থেকে গেস্ট টিচার নিয়ে পাঠদানে সহযোগিতা নিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য গেস্ট টিচার নিচ্ছেও, তবে এর সংখ্যা বাড়াতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বা নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। করপোরেট যা চায়, সে বিষয়টা নিয়ে কাজ করতে হবে এবং শিল্পের সাথে সম্পর্কিত কোর্স চালু করতে হবে।
বর্তমান সরকার তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। সেইসাথে শিল্প-অ্যাকাডেমিয়ার সাথে দূরত্ব কমানোর জন্য কাজ করছে। ইনোভেশন, গবেষণা এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য সরকারের পর্যাপ্ত ফান্ড রয়েছে। এ নিয়ে সরকার কাজ করছে
আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবেও দক্ষ হতে হবে। প্র্যাকটিকেল শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। মেধাকে কাজে লাগিয়ে ইন্ডাস্ট্রি ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে।
শিল্প ও অ্যাকাডেমির মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ, জ্ঞান বিনিময়, যৌথ গবেষণা চুক্তি, পরামর্শ, সম্মেলন, ইন্টার্নশিপ, কর্মী বিনিময়, ল্যাব ব্যবহার, প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ পাঠ্যক্রম, চাকরি মেলা, গবেষণা, ইন্টার্শিপ ও উদ্ভাবন ইত্যাদি সম্পর্কগুলো এগিয়ে নিতে হবে। শিল্প ও একাডেমিয়ার (বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার মান বৃদ্ধি, গবেষণার প্রসার এবং চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করতে বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজন করছে। এর উদ্দেশ্য হলো বেকারত্ব কমানো এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা।
লেখক: উপপরিচালক (জনসংযোগ), পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।