ইতিহাসের বিচার, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: ১৯৭১ ও ২০২৪-এর বিভাজন পেরিয়ে একটি রাষ্ট্রের সন্ধানে
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো কে ১৯৭১-এর পক্ষে, কে বিপক্ষে কিংবা কে ২০২৪-এর আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে—এটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, এই ইতিহাসগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আমরা কেমন বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ভাষ্যও বদলে যাবে? যেখানে এক প্রজন্মের কাছে যে নায়ক, পরের প্রজন্মের কাছে তিনি খলনায়ক হয়ে উঠবেন? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ইতিহাস থাকবে ইতিহাসের জায়গায়, অপরাধের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে গণতান্ত্রিক পরিসরে এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে নাগরিকের সমান অধিকার?
১৯৭১ আমাদের রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনাতেও বলা হয়েছে, জনগণ ২৬ মার্চ ১৯৭১ স্বাধীনতা ঘোষণা করে ঐতিহাসিক জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে সংবিধান আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের কথা বলেছে। ফলে ১৯৭১-এর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার শুধু একটি পতাকা নয়; একটি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা।
এই জায়গাটি মনে রাখা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ভিত্তি। আবার ১৯৭১-এর ইতিহাসের নামে কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়াও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। অপরাধের বিচার হবে অপরাধের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতা, গৃহযুদ্ধ, স্বৈরাচার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পর বহু দেশকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে—অতীতের সঙ্গে কীভাবে বসবাস করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ ছিল ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাত। দাসপ্রথা ছিল সেই সংঘাতের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর একটি। যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র শুধু যুদ্ধ শেষ করেনি; সংবিধানের ১৩, ১৪ ও ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলোপ, নাগরিকত্ব ও আইনের সমান সুরক্ষা এবং ভোটাধিকারের ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। তবে Reconstruction ছিল অসম্পূর্ণ ও দীর্ঘ সংগ্রামের বিষয়। অর্থাৎ জাতীয় ঐক্য মানে অতীতের অন্যায় ভুলে যাওয়া নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে সেই অন্যায় পুনরায় ফিরে আসতে না পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। apartheid-এর দীর্ঘ নিপীড়নের পর নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে দেশটি প্রতিশোধের পরিবর্তে সত্য, ন্যায় ও পুনর্মিলনের একটি পথ বেছে নেয়। Truth and Reconciliation Commission-এর মাধ্যমে অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের কথা নথিবদ্ধ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য সামাজিক পুনর্মিলনের চেষ্টা করা হয়। এর অর্থ এই নয় যে অপরাধকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল; বরং সত্য, দায়বদ্ধতা ও পুনর্মিলনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।
জার্মানির অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাজি অতীতকে মুছে ফেলার পরিবর্তে পরবর্তী প্রজন্মকে সেই ইতিহাস সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক নাগরিক শিক্ষা এবং ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সংস্কৃতি সেখানে রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। শিক্ষা এখানেই—ইতিহাস শেখানো মানে সন্তানদের ঘৃণা শেখানো নয়; বরং সত্য, ভুল, অপরাধ, ত্যাগ ও রাষ্ট্রের বিবর্তন বোঝার ক্ষমতা দেওয়া।
বাংলাদেশের জন্যও তাই পথটি হওয়া উচিত ইতিহাস মুছে ফেলা নয়, আবার ইতিহাসকে চিরস্থায়ী রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোও নয়।
২০২৪-এর আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রাথমিক বিশ্লেষণে আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, প্রাণহানি, নির্বিচার আটক ও নির্যাতনের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে; আন্দোলনের পর প্রতিশোধমূলক সহিংসতার কথাও নথিবদ্ধ হয়েছে। ফলে ২০২৪-কে শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পরাজয় হিসেবে দেখলে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য খাটো করা হবে। এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় প্রশ্নও তুলেছে—রাষ্ট্র কি নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে, নাকি ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা রক্ষা করবে?
আমার কাছে ১৯৭১ ও ২০২৪-কে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর কোনো প্রয়োজন নেই। ১৯৭১ আমাদের রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস; ২০২৪ রাষ্ট্রকে নাগরিকের কাছে জবাবদিহিমূলক করার একটি নতুন অধ্যায়ের ইতিহাস। ১৯৭১ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, আর ২০২৪ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরেও নাগরিক স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় সময়ের ঘটনাবলির ক্ষেত্রেই আমাদের নীতিগত অবস্থান হওয়া উচিত আইনের শাসন, ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচারের সার্বজনীন প্রয়োগ। কোনো অপরাধের দায় উত্তরাধিকারসূত্রে সন্তান, পরিবার, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বৃহত্তর কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপ করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। অপরাধের দায় ব্যক্তির; বিচার হবে সুনির্দিষ্ট অপরাধ ও প্রমাণের ভিত্তিতে—পরিচয়, দল বা প্রজন্মের ভিত্তিতে নয়।
আরও পড়ুন: এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পেছাল ২ মাস
এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে আমাদের সন্তানদের নিয়ে। তারা কী ইতিহাস শিখবে? এমন ইতিহাস, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নায়ক-খলনায়ক বদলে যাবে? নাকি এমন ইতিহাস, যেখানে তারা জানবে—এই ভূখণ্ডের মানুষ দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছে; ১৯৭১-এ অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছে; স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে; স্বৈরশাসন এসেছে, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন হয়েছে এবং ২০২৪-এ নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দাবি তুলেছে?
দ্বিতীয় ইতিহাসটি আমাদের সন্তানদের বেশি পরিণত নাগরিক করে তুলবে। কারণ সেখানে কাউকে দেবতা বানাতে হয় না, কাউকে দানবও বানাতে হয় না। ইতিহাসকে সত্যের জায়গায় রাখা যায়।
আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে, বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু সরকারগুলোর ইতিহাস নয়। এটি কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, ভাষাসংগ্রামী, সংস্কৃতিকর্মী এবং সাধারণ মানুষের ইতিহাস। একটি জাতির ইতিহাস যত বেশি মানুষের হয়, তত কম তা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হতে পারে।
এ কারণেই বাংলাদেশে একটি স্বাধীন ও বহুমাত্রিক জাতীয় ইতিহাস ও স্মৃতি কমিশনের কথা ভাবা যেতে পারে। ইতিহাসবিদ, গবেষক, আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, আর্কাইভ বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন মতের মানুষের সমন্বয়ে এই প্রতিষ্ঠান ১৯৪৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণ করতে পারে। ১৯৭১, ১৯৭৫, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ১৯৯০ এবং ২০২৪—সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নথি সংরক্ষিত হতে পারে। স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যক্রমও এমনভাবে তৈরি করা যেতে পারে, যাতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ইতিহাসের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তিত না হয়।
সরকার বদলাবে, কিন্তু রাষ্ট্রের ইতিহাস বদলাবে না—এমন একটি নীতি আমাদের প্রয়োজন।
জাতীয় ঐক্যের অর্থ সবাই একই মতের হবে—এমন নয়। গণতান্ত্রিক ঐক্যের অর্থ হলো আমরা ভিন্ন কথা বলব, ভিন্ন দলকে সমর্থন করব, ইতিহাসের কিছু ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক করব; কিন্তু একই সংবিধান, একই আইনের সুরক্ষা এবং একই জাতীয় পতাকার নিচে নাগরিক হিসেবে বসবাস করব।
বাংলাদেশকে তাই দুটি চরম পথের মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একদিকে ইতিহাস মুছে ফেলার প্রবণতা, অন্যদিকে ইতিহাসকে চিরস্থায়ী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা। আমাদের প্রয়োজন তৃতীয় পথ—ইতিহাসকে সম্মান করা, অপরাধের বিচার করা, ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎকে অতীতের প্রতিহিংসার কাছে বন্ধক না রাখা।
২০২৪-এর আন্দোলনে যারা ছিলাম, আমাদের জন্য দায়িত্বটি আরও বেশি। আমরা যদি সত্যিই পুরোনো বিভাজন ভাঙতে চাই, তাহলে ১৯৭১-কে অস্বীকার করে নয়; বরং ১৯৭১-এর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক বাংলাদেশে রূপান্তর করেই এগোতে হবে।
আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চাই, কিন্তু ইতিহাসের নামে বিভাজন চাই না। আমরা অপরাধের বিচার চাই, কিন্তু প্রতিহিংসা চাই না। আমরা সত্য চাই, কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধামতো সত্যের পরিবর্তন চাই না। আমরা ২০২৪-এর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা চাই, কিন্তু নতুন কোনো একদলীয় ইতিহাস চাই না।
আমাদের সন্তানদের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ রেখে যেতে হবে, যেখানে তারা জানবে তাদের পূর্বপুরুষেরা কীভাবে দেশটি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য পূর্বপুরুষদের রাজনৈতিক বিভাজনের উত্তরাধিকার বহন করতে হবে না।
একটি পতাকা আমাদের এক করবে, একটি সংবিধান আমাদের অধিকার দেবে, একটি ন্যায়ভিত্তিক আইন আমাদের নিরাপত্তা দেবে এবং একটি সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখবে।
তখনই ১৯৭১ শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি। আর ২০২৪ শুধু একটি আন্দোলনের নাম হবে না; হয়ে উঠবে সেই দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি অধ্যায়—যেখানে বাংলাদেশের মানুষ বারবার রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছে: ক্ষমতা বদলাবে, সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক দল বদলাবে—কিন্তু বাংলাদেশ থাকবে সবার।
লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল