২০ আগস্ট ২০২৬, ২২:০৬

জাতীয়তাবাদী দলের অকুতোভয় সিপাহসালার: রাজনীতিবিদ রুহুল কবির রিজভী

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম  © টিডিসি ফটো

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মনোনীত হওয়ায় তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। রাজনীতিতে অনেকেই আসেন, কিন্তু সবাই রাজনীতির মানুষ হয়ে উঠতে পারেন না। কারও কাছে রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি, কারও কাছে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার পথ; আবার কারও জীবনে রাজনীতি হয়ে ওঠে বিশ্বাস, ত্যাগ ও নিরন্তর সংগ্রামের নাম। 

অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সেই বিরল রাজনীতিবিদদের একজন, যার জীবন থেকে রাজনীতিকে আলাদা করা যায় না। রাজনীতি দিয়েই তার পথচলা শুরু, আজও তিনি রাজনীতির মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত। তাঁর কাছে রাজনীতি কোনো খণ্ডকালীন দায়িত্ব নয়; এটি তাঁর জীবন, সাধনা এবং অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। ছাত্রজীবনেই তার নেতৃত্বের দৃঢ়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সাহস এবং মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতা প্রকাশ পায়। তিনি কোনো আকস্মিক সুযোগ বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে নেতৃত্বে আসেননি; ছাত্রসমাজ ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করেই নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ছাত্রদলের ইতিহাসে তিনি একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ভোটে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও আস্থা নিয়ে তার এই উত্থান ছাত্ররাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছিল, তার জনপ্রিয়তা কেবল ব্যক্তিগত পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সংগঠনের সাধারণ নেতাকর্মীদের হৃদয়েই তার নেতৃত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসুর নির্বাচিত সহসভাপতি হিসেবেও তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। 

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েও তিনি রাজপথ থেকে সরে যাননি। শরীরে বুলেটের ক্ষত নিয়ে তার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ছাত্রসমাজকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। ছাত্ররাজনীতির সেই উত্তাল সময় থেকেই তিনি সাহসী, ত্যাগী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে তার যে দৃঢ় ও আপসহীন নেতৃত্ব আমরা দেখি, তার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল ছাত্ররাজনীতির সেই সংগ্রামমুখর দিনগুলোতেই। 

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশ্বস্ততা, আনুগত্য ও সাহসের যে দৃষ্টান্তগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকবে, রুহুল কবির রিজভীর নাম সেখানে বিশেষভাবে উচ্চারিত হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী আদর্শ, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক নির্দেশনার প্রতি তার আনুগত্য প্রশ্নাতীত। তিনি শুধু জিয়া পরিবারের একজন বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোদ্ধাই নন; দুঃসময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন আস্থাভাজন নেতা। রাজনীতির সুসময়ে অনেকেই নেতৃত্বের কাছাকাছি থাকেন। কিন্তু নিপীড়ন, গ্রেপ্তার, মামলা, কারাবরণ ও অনিশ্চয়তার দিনগুলোতে যারা বিশ্বাসের পতাকা ধরে রাখেন, তারাই প্রকৃত বিশ্বস্ততার পরিচয় দেন। রিজভী সেই কঠিন পরীক্ষায় বারবার উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ কারণেই বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ওপর অত্যন্ত আস্থা রেখেছিলেন এবং এখনো তারেক রহমান তাঁকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে রুহুল কবির রিজভী বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান, প্রতিবাদ এবং আন্দোলনের বার্তা তিনি প্রতিদিন মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আমলে দেশের রাজনৈতিক আকাশ যখন ভয় ও অনিশ্চয়তায় ঢাকা ছিল, তখন তার কণ্ঠই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের সাহসী ধ্বনি। প্রেস ব্রিফিং, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বিবৃতি কিংবা রাজপথের আকস্মিক মিছিল/ঝটিকা মিছিল- সবখানেই তিনি ছিলেন দৃশ্যমান ও সক্রিয়। 

বহু নেতা যখন গ্রেপ্তার বা আত্মগোপনে, দলীয় কার্যালয় যখন অবরুদ্ধ কিংবা জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তখনো তিনি নীরব থাকেননি। প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের বক্তব্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যের পেছনে ছিল দলের প্রতি দায়বদ্ধতা। তার কণ্ঠে শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা ছিল না; ছিল নির্যাতিত নেতাকর্মীদের আর্তনাদ, গুম হওয়া মানুষের পরিবারের আকুতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হারানো নাগরিকদের বেদনা।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ফ্যাসিস্ট শাসকের রাজনৈতিক নিপীড়ন আরও কঠোর হয়ে উঠলে এবং বিভিন্ন সময়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হলে আমি তাঁর পাশে থাকার সুযোগ পেয়েছি। আমার ভাড়া বাসা থেকেও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হতো; বক্তব্য রাখতেন তিনি। সেই সময় তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রকাশ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আড়ালে থাকা মানুষটিকেও বোঝার চেষ্টা করেছি। 

প্রতিটি সংবাদ সম্মেলনের আগে ও পরে তার ব্যস্ততা, উদ্বেগ, দায়িত্ববোধ এবং নেতাকর্মীদের প্রতি মমতা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। চারদিকে গ্রেপ্তারের ভয়, নজরদারি ও অনিশ্চয়তা- তারপরও তার কণ্ঠে দ্বিধা ছিল না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। বরং প্রতিটি সংকটের মুহূর্তে তাঁর মধ্যে আরও গভীর দৃঢ়তা দেখেছি। 

তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনুভব করেছি, প্রকাশ্যে তিনি যতটা কঠোর ও অবিচল, অন্তরে ততটাই সংবেদনশীল। সহযোদ্ধার দুঃসংবাদ তাকে আহত করত, কোনো কর্মী গ্রেপ্তার হলে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন, গুম কিংবা হত্যার ঘটনা ঘটলে তার ভেতরে যে গভীর বেদনা তৈরি হতো তা সব সময় মুখে প্রকাশ করতেন না। রাজনৈতিক দায়িত্বের কঠিন আবরণের নিচে তিনি সেই বেদনা নিঃশব্দে বহন করেছেন। তবে তিনি পড়তে ভালোবাসেন। রাজনৈতিক কাজ শেষে গ্রন্থের মধ্যে নিমগ্ন থাকাও তার অন্যতম অভ্যাস। 

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও সাংগঠনিক ইউনিটের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে তিনি চেনেন। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের এত নেতাকর্মীর নাম, পরিচয়, সংগ্রাম ও সাংগঠনিক ভূমিকা মনে রাখা সহজ নয়। রুহুল কবির রিজভীর মতো করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চেনেন-এমন কেন্দ্রীয় নেতা খুব বেশি নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি যেমন পরিচিত, তার কাছেও তারা তেমনি পরিচিত। কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কর্মী তার সামনে এসে দাঁড়ালে তিনি অনেক সময় তাঁকে নাম ধরে ডাকেন, এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চান এবং পরিবারের খোঁজ নেন। 

এ আন্তরিক যোগাযোগই তাকে তৃণমূলের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। তিনি একজন দক্ষ যোগাযোগকারী। কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের, নেতৃত্বের সঙ্গে কর্মীদের এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার সংযোগ রক্ষায় তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীরা জানেন- তাদের কথা শোনার মতো একজন মানুষ রিজভী আছেন। এই বিশ্বাস কোনো পদ দিয়ে অর্জন করা যায় না; দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও পাশে থাকার মধ্য দিয়েই তা তৈরি হয়।

দেশে যখনই কোনো বিরোধী নেতাকর্মী গুম, খুন বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, রুহুল কবির রিজভী প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। নিপীড়িত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সংবাদমাধ্যমে তাদের কথা তুলে ধরেছেন এবং অনেক নির্যাতিত নেতাকর্মীকে রক্ষার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের রাজনৈতিক ও মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন। কত মানুষ তার একটি ফোন, একটি বিবৃতি কিংবা একটি সংবাদ সম্মেলনের কারণে নতুন করে সাহস পেয়েছেন, মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন তার সম্পূর্ণ হিসাব কখনো লেখা হবে না। 

কত পরিবার তার সহমর্মিতায় অনুভব করেছে যে তারা একা নয় সেই ইতিহাসও হয়তো সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পাবে না। কিন্তু সেই মানুষগুলোর দোয়া তার সঙ্গে রয়েছে। নির্যাতিত ও বিপন্ন অসংখ্য নেতাকর্মীকে রক্ষা করার জন্য তার আন্তরিক প্রচেষ্টা তাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। তার রাজনৈতিক জীবনে গ্রেপ্তার, কারাবরণ, দীর্ঘ রিমান্ড এবং নির্যাতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ছোট্ট কক্ষে টানা ৭৮৭ দিন অবস্থান করে তিনি রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পারিবারিক সান্নিধ্য ও জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ বিসর্জন দিয়ে তিনি দল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সচল রাখার চেষ্টা করেছেন।

বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের এমন কোনো কর্মসূচি নেই যেখানে রুহুল কবির রিজভীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল না। কখনো তিনি সংবাদ সম্মেলনে দলের অবস্থান জানিয়েছেন, কখনো মিছিলের অগ্রভাগে থেকেছেন, আবার কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে ঝটিকা মিছিল করেছেন। তিনি শুধু কর্মসূচি ঘোষণা করেননি; জীবনবাজি রেখে সেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। এর ফলে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তার প্রতি এই ভালোবাসা কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়; এটি দুঃসময়ের পরীক্ষিত সম্পর্কের স্বীকৃতি।

তাকে দেখে কর্মীরা সাহস পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন নেতা যখন সব ঝুঁকি উপেক্ষা করে রাজপথে নামেন, তখন তৃণমূলের কর্মীরাও নিজেদের একা মনে করেন না। রুহুল কবির রিজভীর উপস্থিতি তাই অনেক সময় একটি মিছিলের চেয়েও বড় বার্তা বহন করেছে দমন-পীড়ন যত কঠিনই হোক, প্রতিবাদের কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া যায় না।
রুহুল কবির রিজভীর প্রকাশ্য পরিচয় দৃঢ়চেতা, তীক্ষ্ণভাষী ও আপসহীন রাজনীতিবিদ হিসেবে। কিন্তু তার অন্তরে জমে আছে বহু বছরের অসংখ্য দুঃখ, ক্ষত ও না-বলা বেদনা। 

সহযোদ্ধা হারানোর যন্ত্রণা, গুম হওয়া কর্মীর পরিবারের কান্না, নির্যাতিত মানুষের অসহায়তা এবং নিজের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে না পারার অনুশোচনা সবকিছুই তিনি বহন করেছেন। তিনি বেদনার্ত হয়েছেন, কিন্তু সেই বেদনা প্রকাশ্যে এনে নিজেকে দুর্বল হতে দেননি। নিজের অশ্রুকে আড়াল করে অন্যকে সাহস দিয়েছেন। ব্যক্তিগত কষ্টকে পেছনে রেখে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন নেতার প্রকৃত শক্তি এখানেই নিজে আহত হয়েও তিনি অন্যদের আশার কথা শোনাতে পারেন। রাজনীতির ইতিহাসে নেতার বক্তৃতা ও কর্মসূচির বিবরণ লেখা হয়, কিন্তু তার নীরব কান্নার ইতিহাস সাধারণত লেখা হয় না। রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবন বুঝতে হলে তার দৃশ্যমান সাহসের পাশাপাশি এই অদৃশ্য বেদনাকেও অনুভব করতে হবে।

রুহুল কবির রিজভী একজন অসাধারণ বক্তা। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দৃঢ়তার পাশাপাশি লেখাপড়ার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ, ইতিহাসবোধ, রাজনৈতিক দর্শন এবং সমকালীন ঘটনাবলি সম্পর্কে নিবিড় পাঠ তার বক্তৃতা ও বিবৃতিকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। তার ভাষা কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো ব্যঙ্গাত্মক, কখনো আবেগপূর্ণ; কিন্তু প্রায় সব সময়ই তা অর্থবহ। 

তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য দ্রুত অনুধাবন করতে পারেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তিনির্ভর প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। এই গুণ তাকে একজন তীক্ষ্ণ ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি শুধু ভালো বক্তা নন; তিনি একজন মনোযোগী পাঠকও। তার বক্তব্যের শব্দচয়ন, উপমা, ইতিহাসের উল্লেখ এবং রাজনৈতিক ঘটনার বিশ্লেষণে সেই অধ্যয়নশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়। রাজনীতির উত্তপ্ত মঞ্চেও তার ভাষা তাই নিছক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অনেক সময় সাহিত্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক চেতনার সম্মিলিত প্রকাশ হয়ে ওঠে।

রুহুল কবির রিজভী এখন আর কেবল কোনো অঞ্চল, সংগঠন কিংবা নির্দিষ্ট দায়িত্বের নেতা নন। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, সাহস এবং সারাদেশের নেতাকর্মীর সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তাকে জাতীয় নেতার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। দল পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মত, পক্ষ ও সাংগঠনিক বাস্তবতার মধ্যে সুসামঞ্জস্য বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ। রুহুল কবির রিজভী সেই দায়িত্ব সমান্তরাল ও ভারসাম্যপূর্ণ গতিতে পালন করেছেন। দলের প্রবীণ নেতা, নবীন কর্মী, ছাত্র, যুবক, পেশাজীবী ও তৃণমূলের সংগঠক সব পক্ষের কাছেই তিনি একটি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নাম। এই জনপ্রিয়তার পেছনে কোনো কৃত্রিম প্রচার নেই। আছে দীর্ঘদিনের শ্রম, মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, বিপদের সময় পাশে থাকা এবং দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অবিচল নিষ্ঠা। তিনি পদ-কে ব্যবহার করে পরিচিত হননি; বরং তার কর্ম ও আত্মত্যাগ পদকেই মর্যাদাবান করেছে।

রুহুল কবির রিজভীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন ক্ষমতা নয়, মানুষের আস্থা। পদ চলে যেতে পারে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে; কিন্তু দুঃসময়ে অর্জিত বিশ্বাস মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়। তিনি জিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা, দলের নির্ভীক কণ্ঠস্বর, তৃণমূলের আপনজন এবং নির্যাতিত নেতাকর্মীদের আশ্রয়স্থল। তিনি এমন একজন নেতা, যিনি নিজের ক্ষত আড়াল করে সহযোদ্ধার ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নিজের পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময় দলের কর্মীদের দিয়েছেন; ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক দায়িত্বকে বড় করে দেখেছেন।

আমার সৌভাগ্য, কঠিন রাজনৈতিক সময়ে তাকে কাছ থেকে দেখেছি। কাছ থেকে দেখে উপলব্ধি করেছি- প্রকাশ্য মঞ্চের আপসহীন রুহুল কবির রিজভীর অন্তরে বাস করেন একজন গভীরভাবে মানবিক, বেদনাহত ও সহমর্মী মানুষ। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দীর্ঘ ও দুর্গম পথের অকুতোভয় সিপাহসালার রুহুল কবির রিজভী। তার হাতে বিশ্বাসের পতাকা, কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা এবং হৃদয়ে অসংখ্য মানুষের জন্য গভীর ভালোবাসা। রাজনীতি দিয়েই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল; রাজনীতির মধ্যেই তিনি আজও অবিচল।

তবে তার গ্রহণযোগ্যতার পরিসর কখনোই কেবল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা এর নেতাকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সাহসী উচ্চারণ, গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে আপসহীন অবস্থান, সাধারণ জীবনযাপন, জ্ঞানসমৃদ্ধ বক্তব্য এবং নির্যাতিত মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা তাকে দলীয় গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ের এক পরিচিত, গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে তার মনোনয়ন তাই শুধু সাংগঠনিক দায়িত্বের পরিবর্তন নয়; এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ ও নেতৃত্বের প্রতি দলের আস্থার স্বীকৃতি। দুঃসময় যত দীর্ঘই হোক, বিশ্বাসের সৈনিক কখনো সংগ্রামের ময়দান ছেড়ে যান না; আর মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়া নেতাকে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখা যায় না।
 
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়