ডাকসু নির্বাচন; ধারাবাহিকতা থাকবে, নাকি পুরনো রাজনীতি ফিরে আসবে?
গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দেখতে দেখতে এগারো মাস হয়ে গেল। আর মাত্র এক মাস পরেই বর্তমান ছাত্র সংসদের এক বছর পূর্ণ হবে। এখন প্রশ্ন হলো- ডাকসুর পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে? তারচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এই এগারো মাসে ডাকসু কতটা সফল? শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে? ডাকসুসহ অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা কী দরকার?
ডাকসুর নির্বাচিত নেতারা বলছেন, গত এগারো মাসে তারা অসাধারণ কিছু কাজ করেছেন। অন্যদিকে ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত হওয়া নেতারা এবং তাদের সমর্থকেরা ধারাবাহিকভাবে নানা অভিযোগ সামনে আনছেন। ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সমাবেশে অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা, ডাকসু নেতারা অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত, ব্যর্থতা ইত্যাদি নানান বিষয় সামনে এসেছে। সর্বশেষ ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের ভিপি পদকে ভবিষ্যতে নগর মেয়র হওয়ার রাজনৈতিক সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। জবাবে ডাকসু নেতাদের বক্তব্যও বেশ সরল, তারা বলছে- সমালোচনা না করে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করুন। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করাটাই মূল কথা। এভাবেই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি, অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগের মধ্য দিয়ে কেটে গেল প্রায় এগারো মাস।
এই সময়ে সাদিক-ফরহাদসহ ডাকসুর নেতাদের নানা ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করতে হয়েছে। কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো সমালোচনা, কখনো প্রশাসনিক জটিলতা; সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাদের এগোতে হয়েছে। একসময় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাদের কথাবার্তায় এমন একটি ধারণাও জনমনে তৈরি হয়েছিল যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে হয়ত ডাকসু আট কাজ করতে পারবেনা, এটি ফাংশনাল থাকবেনা। শেষ পর্যন্ত সে ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এখন তাই সময় এসেছে একটু থেমে দেখার, ডাকসু গত এগারো মাসে আসলে কী করেছে?
আমার বিবেচনায়, একটি ছাত্র সংসদের সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে শুধু অনুষ্ঠান, সেমিনার, দাবি-দাওয়া কিংবা প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে হিসাব করলে হবেনা। দেখতে হবে, সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রা কতটা বদলেছে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ কতটা সুন্দর হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ, স্বাধীন ও ভয়মুক্তভাবে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পেরেছে? এই জায়গা থেকে আমি দুটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি- আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি এবং শিক্ষার পরিবেশ।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০-২০০১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হই। ২০০১ সালের মার্চ মাসে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে উঠি। হলজীবনের শুরুতেই ছাত্র রাজনীতির ক্ষমতার লড়াইয়ের বাস্তব চিত্র দেখেছি। তখন ছাত্রলীগের মধ্যকার বিভিন্ন গ্রুপের সংঘাত ছিল। একদিকে শরীয়তপুর-মাদারীপুর গ্রুপ, অন্যদিকে খুলনা-বাগেরহাট গ্রুপ; এমন আঞ্চলিক ও সাংগঠনিক বিভাজনকে কেন্দ্র করে হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে কে কী পেল, কিংবা পেল না, আগামী নির্বাচনের পর কার অবস্থান কোথায় থাকবে; এসব হিসাবও সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসছিল, হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতও তত বাড়ছিল। কয়েক মাসের মধ্যে একাধিকবার হল দখল-পাল্টা দখলের ঘটনা ঘটেছে। আমরা তখন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ফলে যে পক্ষ হল নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে থাকার জন্য এক ধরনের বাধ্যবাধকতা ছিলো। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে।
ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছাত্রদলের হাতে চলে যায়। পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে গেল। নতুন শক্তি নতুন কাঠামো তৈরি করল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কাঠামো বদলালেও সংস্কৃতি বদলাল না। গেস্টরুম, গণরুম, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, হল নিয়ন্ত্রণ, গ্রুপিং; এ সবই থেকে গেল। শুধু ক্ষমতার মানুষগুলো বদলে গেল। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, টেন্ডার বাণিজ্য, হলের নিয়ন্ত্রণ এবং নানান আর্থিক স্বার্থ সামনে আসতে লাগল। একপর্যায়ে সংঘর্ষের মধ্যে বুয়েটের শিক্ষার্থী সনি নিহত হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটল। যে ঘটনার সাথে তৎকালীন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রদল নেতাদের নাম জড়িয়ে আছে।
এই জায়গাতেই গত এক বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অতীতের সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সংঘাত হয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের মতো ব্যাপক হল দখল-পাল্টা দখল কিংবা দীর্ঘস্থায়ী প্রাণঘাতী সংঘাতের দৃশ্য দেখা যায়নি। আমার কাছে এটিই বর্তমান ডাকসুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি বলে মনে হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ডাকসুর নেতৃত্ব কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের, সেটি এক বিষয়; কিন্তু একটি নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ক্যাম্পাসে সক্রিয় থাকা আর কোনো ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য থাকা; দুটি এক জিনিস নয়। কারণ ছাত্র সংসদ যদি সত্যিকারার্থে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তার ভূমিকা তৈরি হয়। গত এক বছরে অন্তত সেই জায়গাটিতে একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সাদিক-ফরহাদরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছে।
দ্বিতীয় বড় অর্জন হলো শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় পরিচয়- তারা শিক্ষার্থী। অথচ অতীতে রাজনৈতিক সংঘাত, হলের সমস্যা, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলনের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা প্রায়ই ব্যাহত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক সংঘাতের মূল্য দিতে হয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে। পরীক্ষা পিছিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সেশনজট তৈরি হয়েছে। অনেকের শিক্ষা ও কর্মজীবনের পরিকল্পনা পিছিয়ে গেছে। গত এক বছরে অন্তত সেই অর্থে বড় কোনো অচলাবস্থা তৈরি হয়নি। ডাকসুর নেতাদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন সহজ ও শিক্ষাবান্ধব করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবাসন সংকট, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সামনে বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি বৃত্তির পরিসর বৃদ্ধিতে তারা কাজ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যেমনটি দেখলাম- নিরাপদ পানি ব্যবস্থা ও হলে খাবারের মান উন্নয়ন করেছে। অপরিচ্ছন্নতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ছারপোকা ও মশার সমস্যা সমাধানে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধনে ডাকসু কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছিলো- বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থের যোগান না পেয়ে তারা স্পন্সর সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় মসজিদের উন্নয়ন, নারীদের জন্য জিমনেসিয়াম, ক্যাফেটেরিয়া ও মেডিক্যাল সেন্টারের সংস্কার ও আধুনিকায়ন করেছে। হলের রিডিংরুম আধুনিকায়ন ও এসি স্থাপনের উদ্যোগ শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। ক্রীড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, মেগা ইভেন্ট, প্রশিক্ষণ, ম্যাগাজিন-সাহিত্যপত্রিকা ও বই প্রকাশ করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। এই সবই শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সহযোগী।
একটি ছাত্র সংসদের সাফল্য শত শত অনুষ্ঠান, ব্যানার কিংবা ফেসবুক পোস্টে ধরা পড়ে না; সেটি ধরা পড়ে একজন শিক্ষার্থীর নিরাপদে হলে ফিরে আসায়, একজন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে না গিয়ে নির্ভয়ে ক্লাসে যাওয়ায়, কোনো শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গণরুমে রাত কাটাতে না হওয়ায়। আর সবচেয়ে বড় আকারে সেটি ধরা পড়ে যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে শিক্ষার্থীর অধিকার বড় হয়ে ওঠে।
আমাদের প্রজন্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল, পাল্টা দখল, গেস্টরুম, গণরুম, সংঘাত, টেন্ডার বাণিজ্য এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন কীভাবে রাতারাতি ক্যাম্পাসের ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দেয়। আবার দেখেছি, মানুষ বদলালেও সংস্কৃতি না বদলালে সেই একই গল্প নতুন চরিত্র নিয়ে ফিরে আসে।
আজ যারা ডাকসুর নেতৃত্বে আছেন, কাল তারা থাকবেন না। কিন্তু শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে ডাকসুকে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং নির্বাচন নিয়মিত করতে হবে। শুধু ডাকসু নয় সবগুলো সংসদের বিষয়ে আমার একই/কাছাকাছি মত। কোনো ব্যক্তি বা প্যানেলের সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো- এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে ভবিষ্যতের কোনো ছাত্রনেতা আবার হল কিংবা ক্যাম্পাস দখলকে নেতৃত্বের মাপকাঠি মনে না করেন। যেখানে ছাত্ররাজনীতির মানে হবে- ক্ষমতা নয়, সেবা; আধিপত্য নয়, প্রতিনিধিত্ব, ভয় নয়, স্বাধীনতা।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়