বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষিত বেকারের স্বপ্ন পূরণ কোন পথে?
হাজার হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট এ দেশটিতে প্রায় আঠারো কোটি মানুষের বসবাস। দীর্ঘ দুই শতাধিক বছর ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকায় এ দেশে গড়ে ওঠেনি উল্লেখযোগ্য শিল্প, কল-কারখানা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে কৃষিই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। দারিদ্র্যপীড়িত এ দেশটিতে অশিক্ষা, বেকারত্ব, অস্বাস্থ্যসহ শাসনব্যবস্থার মৌলিক সমস্যা বিদ্যমান। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষিত জনগণ দেশের বাকি সব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে। শিক্ষায় উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানও প্রয়োজন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯৬%। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত টাস্কফোর্স রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৫ বছর ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে গ্র্যাজুয়েশন করা ব্যক্তির হার প্রায় শতকরা ৮ জন। বাংলাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট প্রকাশিত দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিবছর প্রায় ৩৭ লাখ গ্র্যাজুয়েট বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ উচ্চশিক্ষিত যুবকের বিপরীতে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
সুতরাং খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষিত যুবক বেকারত্বের গ্লানিতে ভুগছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট বেকার সংখ্যা ২৬.২৪ লাখ এবং জাতীয় বেকারত্বের হার ৩.৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ২৬ জুলাই ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা উল্লেখিত হয়েছে ২৭.৩০ লাখ। বিপুল পরিমাণ এ বেকারদের বড়ো অংশ শিক্ষিত যুবক-যুবতী। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার প্রায় ৮.৮৫ লাখের অধিক। বেকারত্বের এ সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়ছে।
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে কর্মবাজার যথেষ্ট সম্প্রসারিত ও সহজলভ্য না হওয়ায় সরকারি চাকরির প্রতি উচ্চশিক্ষিত যুবকদের নির্ভরতা বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ব্যবহারিক দক্ষতায় ঘাটতি থাকায় তারা বেসরকারি সেক্টরে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আবার চাকরির নিশ্চয়তা, সুযোগ-সুবিধা, পেনশনসহ নানাবিধ সমস্যায় দক্ষ জনশক্তির বিরাট অংশ বেসরকারি চাকরিতে আগ্রহী হচ্ছে না।
অন্যদিকে চাকরির স্থায়িত্ব, সন্তোষজনক বেতন কাঠামো, সামাজিক মর্যাদা, পেনশন সুবিধা, ব্যক্তিগত ঋণপ্রাপ্তিসহ নানা আর্থিক সুবিধার ফলে সরকারি চাকরি এ দেশের শিক্ষিত যুবকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গেছে। কিন্তু দেশে ২৭ লাখ বেকারের বিপরীতে সরকারি চাকরিতে শূন্য পদের সংখ্যা মাত্র ৫.২১ লাখ। আবার প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির সকল পদ এ সংখ্যার আওতাভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক সম্পন্ন করা একজন শিক্ষার্থী তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কোনো একটি পদে যোগদান করুক, এটি প্রত্যাশিত নয়। কারণ যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েটের পেছনে রাষ্ট্রের গড়ে ৬-৭ লাখ টাকা, প্রকৌশল, কৃষি, মেডিকেলসহ বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জনপ্রতি ১২-১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, সেখানে একজন গ্র্যাজুয়েট কেবল তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির সাধারণ পদে যোগদান করবে?
যে পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাস, সে পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্নকারী কেউ যোগদান করা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। একই সাথে এটি নিয়োগ পরীক্ষায় অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীর বাইরেও রাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি কর্মহীন। রাষ্ট্র সকল বেকার যুবকদের জন্যই কর্মসংস্থান তৈরির পদক্ষেপ নেবে। তারপরেও তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই, সরকারি সকল পদে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক ডিগ্রিধারীরাই নিয়োগ পাবে, তাতেও ৩ লাখের অধিক শিক্ষার্থী কর্মহীন থাকবে।
প্রতিবছর ৭ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও সরকারি চাকরিতে আনুমানিক ৭০ হাজার পদ শূন্য হয়। সরকারি চাকরির শূন্য পদও যথাসময়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিলম্ব, পরীক্ষা গ্রহণের দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশসহ নানাবিধ জটিলতায় শূন্য পদসমূহের একটি অংশ শূন্যই থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। প্রথম শ্রেণির চাকরিতে প্রতিটি পদের বিপরীতে ৫০০-রও অধিক এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির প্রতিটি পদের বিপরীতে ক্ষেত্রবিশেষে ৮ হাজার জন পর্যন্ত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
চাকরির বাজারের এমন সংকটকালে একটি সরকারি চাকরি যেন আলাদিনের কাছে সোনার হরিণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে চাকরি জোগাড় করতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বছরের পর বছর। এ সময়টি যে কী দুর্বিষহ সময়, তা কেবল বেকারত্বের যন্ত্রণা ভোগা মানুষটিই উপলব্ধি করতে পারবে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, দীর্ঘ মানসিক চাপ, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পারিবারিক চাপ, সামাজিক গঞ্জনা ইত্যাদি উপেক্ষা করে একজন যুবক আশায় বুক বাঁধে এবং অপেক্ষা করে—হয়ত চাকরি নামক পূর্ণিমার চাঁদ সে অচিরেই স্পর্শ করতে পারবে।
কিন্তু দীর্ঘ এ নৈরাশ্যজনক যাতনা অনেকেই সইতে পারছে না। হতাশায়, ব্যর্থতায় অনেক যুবক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তারেক আজিজ চাকরি না পেয়ে মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং আত্মহত্যা করে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভির রহমান ২০১৮ সালে, আরিফুল ইসলাম ২০২৪ সালে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
২০২৩ সালে চবি শিক্ষার্থী এরফান আহমেদ সামি, জাবি শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমানসহ সারাদেশে একাধিক আত্মহত্যার ঘটনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২২ সালে বাদশাহ মিয়া, ২০২৩ সালে ইডেন কলেজ শিক্ষার্থী মুক্তা সুলতানা চাকরি না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা থেকে ফেসবুক লাইভে এসে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ পুড়িয়ে ফেলে। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচিত হলে তৎকালীন সরকার মুক্তাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে একটি চাকরির ব্যবস্থা করেছিল।
বর্তমান সময়ে চাকরি একটা পরিচয়, আশার প্রদীপ, মাথা গোঁজার ঠাঁই। চাকরি নিয়ে লাখো বেকার যুবক-যুবতীর হতাশার এ সংকট কাটাতে সরকারের একটি উদ্যোগ লাখো বেকারের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০১৫ সালে সরকার বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব সরকারি ব্যবস্থায় গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কে সারা দেশের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের চাহিদা সংগ্রহ করে নিবন্ধিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে মেধাতালিকার ভিত্তিতে বাছাই করে অগ্রগামী প্রার্থীদের নিয়োগ প্রদানের জন্য এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির নিকট অর্পণ করে।
একই বছর সরকার সকল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল-২০১৫ ঘোষণা করে। একই সাথে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরকেও জাতীয় পে-স্কেলের আওতাভুক্ত করে মূল বেতন প্রদান ও তৎপরবর্তীতে পে-স্কেলের নির্ধারিত হারে ইনক্রিমেন্ট সুবিধা চালু করে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এ সুবিধা চালু করায় এবং সরকারিভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রার্থী বাছাই ও সুপারিশ পদ্ধতি চালু করায় লাখো শিক্ষার্থী এটিকে স্বপ্ন পূরণের শেষ অবলম্বন হিসেবে বিবেচনা করে।
ব্যানবেইসের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজার ৮১০টি, যার মধ্যে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ১৯ হাজার ৮৪৭টি। অর্থাৎ দেশের ৮৩.৩৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। সুতরাং বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা খাত কার্যত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের হাত ধরেই পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, তিনটি সরকারি মাদ্রাসা ছাড়া প্রায় সকল মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষা খাতের যাবতীয় সফলতা বা ব্যর্থতায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। দেশের মানবশক্তির উন্নয়নে মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক স্তর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং সরকারের উচিত এ সেক্টরকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা। এ জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের সার্বিক উন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, প্রযুক্তি জ্ঞান, আধুনিক শিখন-শিক্ষণ পদ্ধতিতে পাঠদান প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার পাশাপাশি মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া, যুগোপযোগী বেতন কাঠামো, বিদ্যালয়ের গুণগতমান বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন ঘটানোর বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন থেকে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, দাতা গোষ্ঠী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ যুক্ত থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি, আর্থিক লেনদেনসহ নানা অনিয়ম যে চলছিল, তা আজ সর্বজনবিদিত। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগতমানসম্পন্ন ও যোগ্য শিক্ষক থেকে বঞ্চিত ছিল।
অন্যদিকে, নামমাত্র বেতন ও সুযোগ-সুবিধা চালু থাকায় মেধাবী শিক্ষকরা এসব প্রতিষ্ঠানে আগ্রহী ছিলেন না। তৎকালীন সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় এর নিদারুণ প্রভাব পড়েছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০০৫’ পাস করে এবং এ আইনের আলোকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) প্রতিষ্ঠা করে।
এ আইনের ধারা ২১ অনুযায়ী ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা-২০০৬’ প্রণয়ন করে। উক্ত বিধিমালা অনুসরণপূর্বক প্রতিষ্ঠানটি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার জন্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন প্রদান শুরু করে। একই বছর সরকার শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর সরকারি বেতনের অংশ ১০০ ভাগ প্রদান করে। বেসরকারি শিক্ষা ক্ষেত্রে তথা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এ দুটি পদক্ষেপ একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
এনটিআরসিএ ইতোমধ্যে ১৮টি নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ করেছে এবং প্রায় ৭.৩৭ লক্ষ পরীক্ষার্থীকে শিক্ষক নিবন্ধন সনদ প্রদান করেছে। বেসরকারি শিক্ষাখাতের নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা পর্ষদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। বিভিন্ন সময়ে প্রণীত ও সংশোধিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা অনুসারে তারা নিয়োগ প্রদানের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা ভোগ করত। কিন্তু এ সময় দেখা যেত, নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের অনেকেই মেধাতালিকায় এগিয়ে থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বঞ্চিত হতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে, ২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি পরিপত্র জারি করে, যার মাধ্যমে এনটিআরসিএকে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন প্রদানের পাশাপাশি নিবন্ধিত শিক্ষকদের মধ্য থেকে মেধাতালিকার ভিত্তিতে বাছাই করে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রদানের জন্য সুপারিশ প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করে।
সুপারিশকৃত নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রদানে বাধ্য থাকে। সরকার একই বছরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের আওতাভুক্ত করে এবং পরবর্তী বছর ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাতা ও মেডিকেল ভাতা চালু করে। সরকারিভাবে নিয়োগের সুপারিশ ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সরকারি জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় আসায় লক্ষ বেকার যুবকের হৃদয়ে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। চাকরি না পাওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছেলেটিও মনোবল ফিরে পায়। উক্ত পরিপত্রের আলোকে এনটিআরসিএ অনলাইনে সারাদেশের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শূন্য পদের তালিকা গ্রহণ করে এবং শূন্য পদের তালিকা ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা উল্লেখপূর্বক গণবিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। নিবন্ধিত প্রার্থীগণ বিষয়ভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠান পছন্দের তালিকার ক্রম অনুসারে অনলাইনে আবেদন করে।
২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাতটি গণবিজ্ঞপ্তি এবং দুটি বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রায় ১,৮৯,২৮৪ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ প্রদান করা হয়। গত দশ বছরে যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে এ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করায় প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসার দাবিদার। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটি এখন বেকারদের আস্থার জায়গায় উন্নীত হয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বড়ো কলেজগুলোর অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এখন বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যোগদান করেছে। মেধাবী শিক্ষকদের পদচারণায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সমাজেও একটা দারুণ মনোভাব তৈরি হয়েছে যে, এখন কেবল যোগ্যরাই শিক্ষক হতে পারবে। শিক্ষক হতে আগ্রহীরা তদবির, টাকা-পয়সা, দুর্নীতির পেছনে না ছুটে জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ শুরু করেছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কিছু সমস্যা পিছু লেগে থাকে। ২০১৫ সালে সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী নিয়োগ সুপারিশ শুরু করায় এনটিআরসিএ আইনি জটিলতায় পড়ে। ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপকে বিধিবহির্ভূত এবং তাদের আইনগত ক্ষমতার হস্তক্ষেপ বলে বিবেচনা করে।
এনটিআরসিএ-এর আইনে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম হিসেবে নিয়োগ সুপারিশ করার কোনো এখতিয়ার উল্লিখিত হয়নি, ফলে বিশ্লেষকদের অনেকে এ কার্যক্রমকে আইনের ব্যত্যয় হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের সরকারি পরিপত্রে উল্লিখিত হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০০৫’-এর ধারা ৮(ট)-এ বর্ণিত—‘সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অন্যান্য দায়িত্ব পালন’-এর ক্ষমতাবলে সরকার এনটিআরসিএকে নিয়োগ সুপারিশের এখতিয়ার প্রদান করেছে। সরকার ২০১৫ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা’ সংশোধন করে নিবন্ধন সনদের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারিত করে এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮-এর ১১.৬ ধারায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে প্রথম যোগদানের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ নির্ধারণ করে।
নিয়মটি মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের নীতিমালাতেও অন্তর্ভুক্ত হয়। পূর্বে সনদের মেয়াদ নির্ধারিত ছিল না এবং বয়সের কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না। নতুনভাবে বয়সের সীমাবদ্ধতা ও সনদের মেয়াদ নির্ধারিত হওয়ায় অনেক নিবন্ধিত প্রার্থী গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের যোগ্যতা হারায়। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের অনেকে আদালতের আশ্রয় নেয়। একাধিক মামলার জটিলতায় পড়ে এনটিআরসিএ-এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে আদালতের আপিল বিভাগ তার পর্যবেক্ষণে এনটিআরসিএকে নিয়োগ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, বরং গভর্নিং বডিকে নিয়োগ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার এনটিআরসিএ-এর সুপারিশ করার এখতিয়ারও বাতিল করেনি, গভর্নিং বডিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনার নির্দেশনা দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে একই সাথে দুটি বিষয় উল্লিখিত হওয়ায় আইনি বিতর্ক শেষ হয়নি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, তা ছিল নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। কিন্তু এক্ষেত্রে কেবল পরিপত্র জারি না করে, এনটিআরসিএ-এর আইন সংশোধন করে তাদের কার্যক্রমের আওতায় নিয়োগ সুপারিশের এখতিয়ার প্রদান করলে আইনি বিতর্ক এড়ানো যেত।
গত ১০ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে আমরা জানতে পারলাম, সরকার শিক্ষক নিয়োগের যাবতীয় কার্যক্রমকে পূর্বের নিয়মে ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের বিভিন্ন ফোরাম, সাধারণ বেকার তরুণ-যুবকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আইনি জটিলতা নিরসনে অনেকে পূর্বের নিয়মে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগতও জানিয়েছেন। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন, সরকার এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। মন্ত্রীর কথায় সর্বসাধারণ আশ্বস্ত হয়েছে। তারা এখনও বিশ্বাস করে, বর্তমান সরকার লক্ষ লক্ষ বেকারের স্বপ্নভঙ্গ করবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে গতি ফিরে এসেছে, তা থমকে যাবে না।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এ দেশের আপামর জনতা নতুন ধারার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। বর্তমান সরকারও জনগণের এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। নতুন বাংলাদেশে আমরা চাই, সকল ক্ষেত্রে যোগ্যতা, মেধার ভিত্তিতে সবাই নিয়োগ লাভ করবে এবং দেশের জন্য কাজ করবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের যে শুভ সূচনা বিএনপি সরকারের হাত ধরে হয়েছিল, বর্তমানে বিএনপি সরকার আবারও তাদের সেই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও যোগ্যতার মানদণ্ডে উন্নীত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান প্রধান, কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রচলিত নিয়ম বাতিল করে সরকারি বাছাই প্রক্রিয়ায় নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে। আইনি জটিলতা নিরসনে এনটিআরসিএ-এর বিদ্যমান আইন সংশোধনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। পিএসসির আদলে নতুন কমিশন গঠন করবে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর অধ্যায় ২৭-এর ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সুপারিশমালার আলোকে বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
লেখক: প্রভাষক, বাঁশেরবাদা ডিগ্রী(অনার্স) কলেজ,ঈশ্বরদী, পাবনা