বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় আস্থা, সম্পৃক্ততা ও সহনশীলতার প্রয়োজন
একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উপাচার্য, প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা তাঁর টিম কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মূলত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী; সকলকে নিয়ে গড়ে ওঠা একটি জটিল ও পারস্পরিক নির্ভরশীল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। প্রত্যেকের নিজস্ব ভূমিকা আছে এবং সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কার্যকর ও স্থিতিশীল রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি অংশ যদি নিজেদের অনিরাপদ, উপেক্ষিত বা অনাস্থার মধ্যে আছে বলে মনে করে, তাহলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ছোট সমস্যা ধীরে ধীরে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
তাই প্রশাসনিক দায়িত্বে যিনি থাকবেন, তাঁকে অংশীজনকে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেকোনো ঘটনা সিকোয়েন্স বুঝতে হবে। দায়িত্বশীল কেউ যদি কোনো একটি পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়েন কিংবা অন্য কোনো পক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, ২০২৪ সালের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয়ের একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার ফল হিসেবেই ৪ আগস্টের সংঘর্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের সংকটের পেছনে একক কোনো কারণকে দায়ী না করে আমাদের বরং দেখতে হবে- বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ কোথায় দুর্বল হয়েছে, কোথায় যোগাযোগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং কোথায় আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কার দ্বারা এই আস্থার সংকটটা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন, অংশীজনদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ান কিংবা সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যাকে জটিল করে তোলেন, তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কাকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত অবশ্যই উপাচার্য মহোদয়ের। তবে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর ধৈর্য, সংযম, গ্রহণযোগ্যতা, যোগাযোগের সক্ষমতা এবং সংকট মোকাবিলার কৌশল বিবেচনা করা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক রেজাউল করিম পিএইচডি স্যারের সময়কার কিছু অভিজ্ঞতা আমার মনে পড়ে। তাঁর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। কয়েকবার তাঁকে এবং আমাদের অনেককে রেজিস্ট্রার দপ্তরে তালাবদ্ধ করে রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে স্যার আমাদের একটি কথাই বলতেন- আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এনগেজ থাকো, নিজেরা কোনো ঝামেলা তৈরি করো না।
একবার আন্দোলনের কারণে গভীর রাত পর্যন্ত আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে ছিলাম। তখন স্যার বলেছিলেন, “সবাই মিলে আমরা এখানে থেকে যাব, অসুবিধা নেই। কিন্তু তাদের ওপর বল প্রয়োগ করা যাবে না।” তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন।
প্রথম দিকে তাঁর এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনা শুনে আমাদের অনেকেরই বিরক্তি লাগত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আমরা বুঝেছি, তাঁর কৌশলটি ছিল অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। কারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখার মধ্য দিয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যেটি তিনি করতে পেরেছিলেন।
আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে মনে আছে। এটা ২০২৪ এর ৫ আগষ্টের কিছুদিন পরের ঘটনা। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সচিবালয় ঘেরাও করেছিল।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকেল ৪টার বাসে বাসায় ফিরছিলাম। কার্জন হলের সামনে গাড়ি পৌঁছালে স্যার আমাকে ফোন করে বললেন, “তুমি সচিবালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকো।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমি সেখানে কী করব?” তিনি বললেন, “একজন শিক্ষক তাদের সঙ্গে থাকা দরকার। তুমি থাকো।” স্যারের নির্দেশে আমি গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেখানে অবস্থান করি। সচিবালয়ে যোগাযোগ এবং উপদেষ্টা হিসেবে নাহিদ ইসলামকে শিক্ষার্থীদের সাথে মিট করিয়ে দেয়া, এই কাজগুলো আমার করা লাগছে।
নাহিদ ইসলাম এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সেদিনের মতো পরিস্থিতির সমাধান হয়। ঘটনাটি হয়তো অনেকেরই মনে আছে। এ রকম নানা পরিস্থিতিতে অধ্যাপক রেজাউল করিম স্যার আমাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ত থাকতে উৎসাহিত করতেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক স্যারের কথাও এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত মিশতে মিশতে তিনি একসময় তাদের কাছে “তাজা স্যার” হয়ে উঠেছিলেন। এটি নিছক একটি ডাকনাম নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একজন প্রশাসকের সম্পর্ক, যোগাযোগ ও গ্রহণযোগ্যতার একটি উদাহরণ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ব্যারাক নয় যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে বা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘদিন পরিচালনা করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশ, বিতর্ক ও পারস্পরিক সম্মানের জায়গা। এখানে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা; ভয় নয়।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে যারা থাকবেন, তাঁদের ধৈর্যশীল, সংযত ও সব পক্ষের প্রতি ন্যায়সংগত হতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে, শিক্ষকদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সমস্যা তৈরি হলে প্রথমেই শক্তি প্রয়োগের কথা না ভেবে আলোচনার পথ খুঁজতে হবে।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীল রাখার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো সম্পর্ক তৈরি করা, দূরত্ব নয়; আস্থা তৈরি করা, ভয় নয়; সংলাপের পথ তৈরি করা, সংঘাত নয়। একটি দায়িত্বশীল প্রশাসনের মূল সাফল্য শুধু নিয়ম-কানুন প্রয়োগে নয়; বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করতে পারায়, যেখানে ভিন্নমত থাকলেও সবাই নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ বলে মনে করে। ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়