শিক্ষা থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার: সম্ভাবনাটি কাজে লাগাবে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কথা বললে সাধারণত তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি ও পণ্য রপ্তানির বিষয় সামনে আসে। উচ্চশিক্ষার কথা উঠলে আলোচনায় আসে দক্ষ জনশক্তি, চাকরি ও গবেষণা। কিন্তু উচ্চশিক্ষা যে নিজেও একটি বড় অর্থনৈতিক খাত হতে পারে, সে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষাকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান ও সেবা রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করেছে।
একজন বিদেশি শিক্ষার্থী কোনো দেশে গেলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি দেন না। তিনি আবাসন, খাবার, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবায়ও অর্থ ব্যয় করেন। ফলে একজন শিক্ষার্থীকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতির আরও অনেক খাত সক্রিয় হয়। বাংলাদেশ কি এই সম্ভাবনাটি কাজে লাগাতে পারে?
প্রশ্নটি করার যথেষ্ট কারণ আছে। দেশে বর্তমানে ১৭৯টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে ১১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫১ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। অর্থাৎ আমাদের একটি বড় উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। রয়েছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক, গবেষক ও অবকাঠামো। এখন প্রয়োজন এই সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।
অন্যদিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। পাঁচ বছরে এই ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। বিদেশে পড়তে যাওয়া বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো বিকল্প তৈরি করা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করাই হতে পারে বাস্তবসম্মত পথ।
বিশ্বের কয়েকটি দেশ এ ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের মূল্য ছিল প্রায় ৫৫ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার। কানাডায় ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যয় ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার, যা দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, উচ্চশিক্ষা শুধু মানবসম্পদ তৈরির বিষয় নয়; এটি বড় একটি সেবা অর্থনীতিও হতে পারে।
বাংলাদেশের শুরুটা হওয়া উচিত বাস্তবতা মেনে। একসঙ্গে ১৭৯টি বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে প্রথম ধাপে ১০ থেকে ১৫টি সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেওয়া যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, রোবোটিকস, প্রকৌশল, চিকিৎসা, ফার্মেসি, কৃষি, জীবপ্রযুক্তি, জলবায়ু ও সামুদ্রিক অর্থনীতির মতো বিষয়ে বিশেষায়িত উৎকর্ষকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এমন বিষয় বেছে নিতে হবে, যেগুলোর আন্তর্জাতিক চাহিদা রয়েছে এবং যেখানে বাংলাদেশেরও বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন একটি জাতীয় ‘স্টাডি ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগ। বিদেশি একজন শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে চাইলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হয়, ভর্তি কীভাবে হবে, বৃত্তি ও আবাসনের সুযোগ কী—এসব তথ্য যেন একটি জায়গায় পাওয়া যায়। আবেদন, সনদ যাচাই ও ভিসার প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য বাংলাদেশে পড়তে আসার পথ যত সহজ হবে, সম্ভাবনাটিও তত বাড়বে।
এ কাজ কোনো একক প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্ভব নয়। শিক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, দূতাবাস, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার প্রচারেও যুক্ত করা যেতে পারে।
তবে প্রচারের আগে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার মান। শুধু কম খরচের কারণে বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে আসবেন না। তাঁরা চাইবেন মানসম্মত শিক্ষক, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ডিগ্রি, গবেষণার সুযোগ, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও ভালো আবাসিক সুবিধা। তাই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণের প্রথম শর্তই হলো মান।
ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে। অনলাইন ডিগ্রি, স্বল্পমেয়াদি কোর্স ও পেশাগত প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক বাজারে দেওয়া যেতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স ও সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। একইভাবে তৈরি পোশাক, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও অংশীদারিত্ব বাড়াতে হবে। যৌথ ডিগ্রি, যৌথ গবেষণা ও শিক্ষক বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দিষ্ট শর্তে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে মান নিয়ন্ত্রণে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে নিম্নমানের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও রাখা উচিত নয়।
বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে বৃত্তিও কার্যকর হতে পারে। সরকার প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা, কৃষি, জলবায়ু ও সমুদ্রবিজ্ঞানসহ অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে এসব দেশের শিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কও তৈরি হবে।
এখন আসা যাক ১০ বিলিয়ন ডলারের কথায়।
২০৩৩ সালের মধ্যে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরির একটি জাতীয় লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। তবে এটিকে সরাসরি রপ্তানি আয় বলা ঠিক হবে না। বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ও জীবনযাপনের ব্যয়ের পাশাপাশি দেশে থেকে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কারণে সাশ্রয় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তর্জাতিক গবেষণা চুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ, যৌথ ডিগ্রি ও অন্যান্য শিক্ষা-সেবার মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থাৎ ১০ বিলিয়ন ডলারকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় হিসেবে নয়, একটি জ্ঞানভিত্তিক বাজারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত। এই লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি মাপতে হবে স্পষ্ট কিছু সূচকে—বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষা খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সাশ্রয়, আন্তর্জাতিক গবেষণা চুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ, যৌথ ডিগ্রি এবং কর্মসংস্থান।
এ জন্য সময়ভিত্তিক পরিকল্পনাও প্রয়োজন। ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল হতে পারে প্রস্তুতির সময়। এ সময়ে নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়, ‘স্টাডি ইন বাংলাদেশ’, সহজ ভর্তি ও ভিসা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাক্রমের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে।
২০২৯ থেকে ২০৩০ সালে আরও বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত করা, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ ডিগ্রি ও গবেষণা বাড়ানো এবং ডিজিটাল শিক্ষা আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়া যেতে পারে। ২০৩১ থেকে ২০৩৩ সাল হতে পারে আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্ত করার সময়। কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষা ও গবেষণার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে।
এ উদ্যোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ১১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু শিক্ষার্থী ও টিউশন ফির ওপর নির্ভর করে চললে হবে না। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, গবেষণা, শিল্পের সঙ্গে অংশীদারত্ব, প্রশিক্ষণ ও বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আয় করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
এ জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আর্থিকভাবে টেকসই হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এর অর্থ মুনাফাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হয়ে যাওয়া নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় ও উদ্বৃত্তের একটি অংশ শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষক উন্নয়ন, বৃত্তি ও অবকাঠামোয় পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ থাকা দরকার। এতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজের মান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারবে। একই সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষকদেরও এই উদ্যোগে যুক্ত করা যেতে পারে। অনলাইন ক্লাস, যৌথ গবেষণা ও পিএইচডি তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে তাঁদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। এতে আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও গবেষণার সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যোগাযোগ বাড়বে।
তবে উচ্চশিক্ষাকে শুধু ডলার আয়ের খাত হিসেবে দেখলে চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব জ্ঞান সৃষ্টি, দক্ষতা তৈরি ও গবেষণা। অর্থনৈতিক আয় হবে তার গুরুত্বপূর্ণ ফল। তাই বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় শিক্ষার মানে ছাড় দেওয়া যাবে না।
২০৩৪ সালের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার যে লক্ষ্য সামনে এসেছে, তার জন্য দক্ষ মানুষ, গবেষণা ও উদ্ভাবন প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো দিয়ে সেই অর্থনীতি তৈরি হবে না। উচ্চশিক্ষা সেই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
তাই ২০৩৩ সালের মধ্যে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরির লক্ষ্যকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়ার কারণ নেই। আবার এটি সহজে অর্জন করা যাবে—এমন ভাবারও সুযোগ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, মান নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা।
কাজটি শুরু হতে পারে কয়েকটি সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয়, কয়েকটি অগ্রাধিকার বিষয়, কয়েকটি আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং একটি সহজ সেবা ব্যবস্থা দিয়ে। ফল পাওয়া গেলে ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়ানো যাবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাই ভাবতে হবে এই শিক্ষাকে কীভাবে জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিতে পরিণত করা যায়। সঠিক নীতি, মানসম্মত শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা থাকলে উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশের নতুন বৈদেশিক মুদ্রার খাত হয়ে উঠতে পারে। ১০ বিলিয়ন ডলার তখন শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা।
লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)