শিক্ষা সংস্কার: এখনই সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার
বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন। বর্তমান সরকারও তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে যে প্রশ্নটি জনপরিসরে বারবার উচ্চারিত হয়েছে, সেটি হলো শিক্ষা সংস্কার। দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেমন এই বিষয়টি প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি, এখনো তেমন কোনো সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা দৃশ্যমান নয়।
শিক্ষা সংস্কার বলতে আমরা কী বুঝি? অনেকের কাছে এটি পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন বা নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের সমার্থক। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। শিক্ষা সংস্কার হলো এমন একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিক্ষার উদ্দেশ্য, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষক প্রস্তুতি, শিক্ষা প্রশাসন, গবেষণা এবং অবকাঠামো—সমগ্র ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়। এর লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নিশ্চিত করা নয়; বরং এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা দক্ষ, সৃজনশীল, মানবিক এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম।
অর্থাৎ শিক্ষা সংস্কার একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে যেমন কর্মবাজারের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়, তেমনি গড়ে ওঠে বিজ্ঞানমনস্ক, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক। একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এই দুই দিকই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এখনো শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সামনে আসেনি। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা কী হবে কিংবা গবেষণাকে কীভাবে জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও অনুপস্থিত।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিপুল জনসংখ্যা। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই জনসংখ্যাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয় না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং মানসম্মত শিক্ষা। আমাদের দেশে দক্ষ শিক্ষাবিদ, পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকের অভাব নেই। অভাব রয়েছে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর।
শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি হতে হবে প্রাথমিক শিক্ষা। আন্তর্জাতিক গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, শিশুর ভবিষ্যৎ শেখার ভিত গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম কয়েক বছরে। তাই এই স্তরে সবচেয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কেন্দ্রীয় নিয়োগব্যবস্থার কারণে মাধ্যমিক পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে মেধাবী শিক্ষক যুক্ত হচ্ছেন। একই ধরনের গুরুত্ব যদি প্রাথমিক শিক্ষায় দেওয়া যায়, বেতন, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি করে যদি মেধাবী তরুণদের এই পেশায় আকৃষ্ট করা যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পুরো জাতিই পাবে।
একই সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষায় অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমানো জরুরি। দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য সমমানের শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক চেতনার একটি অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় সংহতিকেও শক্তিশালী করবে।
এ ক্ষেত্রে জাপানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশটির পুনর্গঠনের পেছনে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। শিক্ষক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও পারিশ্রমিকে তারা সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা অবশ্যই ভিন্ন, কিন্তু শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গুরুত্ব সেই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নয়, উচ্চশিক্ষার কৌশলগত পরিকল্পনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য এর সক্ষমতা, জনবল এবং নীতিনির্ধারণী ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিকাঠামো জরুরি। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ডিন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, মানদণ্ড ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া পূর্বনির্ধারিত ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সুশাসন ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন শিক্ষা বা গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ ও বিশেষায়িত—দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন ক্ষেত্রে বিশেষায়ন গড়ে তুলবে, কোন গবেষণা জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত হবে কিংবা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা কী—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা এখনও অনুপস্থিত। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষকদের নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি।
নিঃসন্দেহে আমাদের সম্পদ সীমিত। কিন্তু সীমিত সম্পদের মধ্যেও সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ফল অর্জন সম্ভব। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন একটি সুসংহত জাতীয় রোডম্যাপ। আমাদের আগে নির্ধারণ করতে হবে—আগামী দুই বা তিন দশকে আমরা কী ধরনের নাগরিক এবং কী ধরনের রাষ্ট্র গড়তে চাই। সেই লক্ষ্য থেকেই শিক্ষা নীতি, শিক্ষক প্রস্তুতি, বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারিত হওয়া উচিত।
শিক্ষা কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রকল্প। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনৈতিক চর্চা থাকবে—এটি গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু যোগ্যতা, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক মানের সঙ্গে আপস করলে কোনো শিক্ষা সংস্কারই সফল হবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ করতে হবে শিক্ষা খাতে। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে, তার শিক্ষকের হাতে এবং তার শিক্ষা ব্যবস্থার মানে। আর সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই প্রয়োজন সাহসী, সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কার।
লেখক: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল