বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রশাসনের নিয়োগ-সিন্ডিকেট ভেঙে দিন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেছেন। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারের শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। প্রথম বাজেটেই তার প্রতিফলন দেখা গেছে। জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনই মোকাবিলা করা জরুরি—শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্ব কার হাতে যাচ্ছে?
সাম্প্রতিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ নিয়ে জনপরিসরে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। কোথাও দখলদারিত্বের অভিযোগে বিতর্কিত ব্যক্তির নাম এসেছে, কোথাও আবার এমন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাদের শক্তিশালী একাডেমিক বা গবেষণা-ভিত্তিক অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদেশি ডিগ্রি থাকলেই যোগ্যতা প্রমাণ হয় না; আবার বিদেশি ডিগ্রি না থাকলেও উচ্চমানের গবেষণা, প্রকাশনা ও একাডেমিক অবদানের মাধ্যমে নেতৃত্বের যোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায়। কিন্তু এই দুইয়ের কোনোটিই স্পষ্ট নয়—এমন ব্যক্তিরাও যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসেন, তাহলে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষা প্রশাসনে একটি প্রভাবশালী নিয়োগ-সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হয় এবং গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পায়, তাহলে সামনে শত শত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক পদায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প ও ক্রয়-প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রভাব-বাণিজ্য ও দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি শুরু থেকেই এসব প্রলোভনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্র।
রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা একটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে, কিন্তু তার ঊর্ধ্বে থাকা উচিত একাডেমিক উৎকর্ষ, নেতৃত্বের সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি ব্যক্তিগত সততা। কারণ একজন ভিসি বা প্রো-ভিসি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন না; তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, শত শত শিক্ষকের কর্মপরিবেশ এবং শত শত কোটি টাকার প্রকল্পের অভিভাবক।
আজ যাঁরা প্রকৃত মেধা, গবেষণা, সততা, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি কমিটমেন্ট ও নেতৃত্বের গুণাবলীর ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন, তাঁরাই শিক্ষার মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে তারেক রহমানের উদ্যোগকে সফল করবেন। আর যদি অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আরও প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্য সরকারকেই দিতে হবে।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, বর্তমান সরকারের জন্য শিক্ষা এবং জ্বালানি—এই দুটি খাতই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে। শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর চেয়েও বড় সংস্কার হবে যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নেতৃত্বে সৎ, যোগ্য, গবেষণামুখী এবং স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়।