১৩ জুলাই ২০২৬, ২২:৪৪

১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি চাই, ৪২ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কি প্রস্তুত?

ইমরান হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে চায়। এটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তবে শুধু অবকাঠামো, শিল্পায়ন বা বিদেশি বিনিয়োগ দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। আর দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো উচ্চশিক্ষা। প্রশ্ন হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কি সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত?

উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই আমাদের নজর যায় কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ভর্তি পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং, গবেষণা, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাটি প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ সেখানেই পড়াশোনা করেন দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, দেশে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯। এর মধ্যে ৪২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৬৬ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করছেন। শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শিক্ষার্থী ৩৩ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি। অন্যদিকে দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার।

অর্থাৎ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মূল ভিত্তি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; বরং অধিভুক্ত কলেজ ব্যবস্থা। কিন্তু নীতিনির্ধারণ, সংস্কার এবং জনআলোচনায় এই বাস্তবতার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না।

অর্থায়নের চিত্রও একই প্রশ্ন সামনে আনে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি বার্ষিক ব্যয় ছিল মাত্র ৭০২ টাকা। অর্থাৎ মাসে প্রায় ৫৮ টাকা। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার টাকার বেশি। অবশ্য গবেষণাভিত্তিক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী, সেখানে শিক্ষার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ কতটা পর্যাপ্ত—সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন কাঠামোও ভিন্ন। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত রাজস্ব বা উন্নয়ন খাতে সরকারি অনুদান পায় না। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির ৮০১ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে মূল রাজস্ব আয় ৬১৭ কোটি ১৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। এই আয়ের বড় অংশ আসে শিক্ষার্থীদের ভর্তি, নিবন্ধন, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক ফি থেকে। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাটি মূলত শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফির ওপর নির্ভরশীল।

অবশ্য মোট বাজেট আর শিক্ষার্থীপ্রতি একাডেমিক ব্যয় এক বিষয় নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় দায়িত্ব হলো হাজারো অধিভুক্ত কলেজের পরীক্ষা পরিচালনা, মূল্যায়ন, সনদ প্রদান ও একাডেমিক তদারকি। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, ৩৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান অর্থায়ন কাঠামো যথেষ্ট কি না।

শ্রমবাজারের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ পাওয়া গেছে। অনেক অধিভুক্ত কলেজে শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা, আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি এবং কর্মবাজারের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সংযোগ এখনো দুর্বল। ফলে শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না।

বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি কর্মক্ষেত্রের চাহিদা পাল্টে দিচ্ছে। এখন শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, ডিজিটাল দক্ষতা, গবেষণা, যোগাযোগ এবং উদ্ভাবনী মানসিকতা। উচ্চশিক্ষা যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল না মেলায়, তাহলে দক্ষতার ঘাটতি আরও বাড়বে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সুযোগও রয়েছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে। এই জনমিতিক সুবিধা দীর্ঘদিন থাকবে না। এই সময়ের মধ্যে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

তাই উচ্চশিক্ষা সংস্কারকে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। যেখানে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন, সেই ব্যবস্থাকেই সংস্কারের কেন্দ্রে আনতে হবে। ইউজিসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইকিউএসি, ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা (ওবিই) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে গুণগত মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। সেখানে নিয়মিত একাডেমিক অডিট, আইকিউএসি, বিষয়ভিত্তিক অ্যাক্রিডিটেশন এবং শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ জরুরি।

শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক কলেজে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম। গবেষণার পরিবেশও দুর্বল। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা অনুদান এবং গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়ন ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে শিক্ষক পদোন্নতিতে গবেষণাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তবে তার আগে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন দরকার। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও গবেষণা দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা (হেমিস) কার্যকরভাবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মান নিয়মিত মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন শিক্ষার্থীদেরও গুণগত মানোন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। উচ্চশিক্ষার এই তিন ধারাকে আলাদা নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

একটি দেশের উচ্চশিক্ষার মান কয়েকটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে বিচার করা যায় না; বিচার করতে হয় সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্যটি একই।

১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ৪২ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত, গবেষণানির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। এই শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতের শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক ও প্রযুক্তিবিদ। তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ ব্যয় নয়, দেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়; বরং যেখানে দেশের ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, সেই ব্যবস্থার মানোন্নয়নকে রাষ্ট্র কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথ।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)