আজিমপুর কবরস্থানে কঙ্কাল বাণিজ্য: সামাজিক চুক্তি ও নাগরিক নিরাপত্তার অন্তর্ধান
রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থান কেন্দ্রিক ঘাসের বস্তায় ভরে কঙ্কাল চুরির শিউরে ওঠার মতো খবর সমানে এসেছে। সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য পত্রিকা দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরটি কেবল প্রচলিত ফৌজদারি আইনের গুরুতর লঙ্ঘনই নয়, বরং আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের এক গভীর কাঠামোগত সংকটকে উন্মোচিত করেছে। মৃত্যুর পর একজন মানুষ পার্থিব সহায়-সম্পত্তি দুনিয়ার মানুষের (আত্মীয়-স্বজন) মাঝে বিলিয়ে দিয়ে মাত্র সাড়ে তিন হাত জমিন বেছে নেয়। সমস্ত কোলাহল ছেড়ে মাটির নিচে চির নিদ্রায় আশ্রয় নেয় চিরন্তন শান্তির আশায়। কিন্তু সেই একখণ্ড জমিও অনিরাপদ হয়ে ওঠে যখন সেখানেও লোভের নখর থাবা বসে। এভাবে যখন মৃতদেহকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়, তখন তা সভ্যতার মৌলিক ভিত্তিকেই কাঁপিয়ে দেয়।
আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের একটি অন্যতম তত্ত্ব হলো ‘সামাজিক চুক্তি’ মতবাদ। দার্শনিক টমাস হবস, জন লক বা জ্যাঁ জাক রুশোর এই সুপরিচিত মতবাদ অনুসারে রাষ্ট্র গঠনের যে মূল সুর ধ্বনিত হয়েছে, তা হলো—আস্থা ও নিরাপত্তা। নাগরিক তার জীবন, সম্পদ ও সম্মানের সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রাপ্তির আশায় রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখে। জীবিত মানুষের সুরক্ষার পাশাপাশি এই চুক্তি মতে মৃত্যু পরও একজন নাগরিকের মরদেহের পবিত্রতা ও শেষ শয্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ। সমাজও এই নৈতিক দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না। কিন্তু কবরস্থানের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় যখন এমন সংঘবদ্ধ অপরাধ চলে, তখন বুঝতে হবে সেই আদি ও মৌলিক সামাজিক চুক্তি আজ মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত। সেইসঙ্গে লজ্জিত সমাজ ও সভ্যতার প্রতিশ্রুতি।
প্রকাশিত সংবাদের অমানবিক ঘটনাটি নাগরিক নিরাপত্তার ধারণাকে মানবিক সংকটের পাশাপাশি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। নাগরিক নিরাপত্তা কেবল জীবিতাবস্থায় রাস্তায় বা ঘরে সুরক্ষিত থাকার নাম নয়; বরং এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক নিশ্চয়তা—যেখানে একজন মানুষ বিশ্বাস করে যে তার মৃত্যুর পরও রাষ্ট্র ও সমাজ তার মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখবে। কঙ্কাল বাণিজ্যের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা সেই বিশ্বাসকে গুঁড়িয়ে দেয়। স্বজনহারা মানুষ যখন ভাবেন যে তাদের প্রিয়জনের শেষ স্মৃতিটুকুও মাটির নিচে নিরাপদ নয়, তখন সমাজে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও সামষ্টিক ট্রমা তৈরি হয়।
মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ তার স্বগোত্রীয় মৃতদেহের সৎকার এবং সুরক্ষাকে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে আসছে। কিন্তু এই পবিত্র স্থান ও মৃতদেহ পুঁজিবাদী লোভের পণ্য হিসেবে রূপান্তরিত হলে, তা রাষ্ট্রের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা বলয়কে খণ্ডিত করে। রাষ্ট্র ও সমাজ কেবল জীবিতাবস্থায় তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ নয়; বরং মৃত্যুর পরও তাদের অবমাননা রোধে অক্ষম বলে নাগরিকদের মধ্যে এই বোধ তৈরি হয়।
এই অপরাধের পেছনের কাঠামোটি বিশ্লেষণ করলে ‘প্রাতিষ্ঠানিক অ্যানোমি তত্ত্ব’ বা প্রাতিষ্ঠানিক আদর্শহীনতার তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। এখানে অর্থনৈতিক লাভ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এতটাই তীব্র হয়ে উঠে যে, পরিবার, ধর্মীয় মূল্যবোধ, কবরস্থান ব্যবস্থাপনা মতো সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক নিয়ন্ত্রণকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। কবরস্থানের মতো একটি সুরক্ষিত ও সংবেদনশীল জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অপরাধ সচল থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতে পারে না। এটি প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতিকে নির্দেশ করে। কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে অপরাধী চক্র সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে অপরাধের ‘কাঠামোগত সুযোগ’ তৈরি করে।
কবরস্থান হলো একটি পবিত্র ও সংবেদনশীল স্থান। স্বজনহারা মানুষ বুকভরা আর্তনাদ নিয়ে যেখানে তাদের প্রিয়জনকে শেষ বিদায় জানান, সেই স্থানটিই আজ একশ্রেণির অসাধু চক্রের উপার্জনের
অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ঘাসের বস্তায় ভরে কঙ্কাল পাচারের এই ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীদের মনে না আছে আইনের ভয়, না আছে ন্যূনতম মানবিকতাবোধ। ধর্মীয় অনুশাসন ও মানবিক মূল্যবোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মৃতদেহের এই বাণিজ্যিকীকরণ কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।
এ ধরনের অপরাধ রাতের অন্ধকারে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজরদারি ও কবরস্থান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন চক্র সক্রিয় থাকা স্পষ্টতই এক বড় ধরনের ব্যর্থতা। কবরস্থানের নিরাপত্তা প্রাচীর, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নৈশপ্রহরীদের ভূমিকা নিয়ে স্বভাবতই বড় ধরনের প্রশ্ন জাগে। রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে কিংবা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়, তবে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থলটুকুও আর নিরাপদ থাকে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার পরিমাপ কেবল জীবিত মানুষের অধিকার রক্ষার মাধ্যমে হয় না, বরং মৃত মানুষের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজ কেমন সম্মান প্রদর্শন করছে, তার ওপরও নির্ভর করে।
তাই এই অমানবিক ও ঘৃণ্য কঙ্কাল বাণিজ্যের মূল উৎপাটন করতে হলে সাময়িক ক্ষোভ প্রকাশ বা লোক দেখানো তদন্ত যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পদক্ষেপ। প্রথমত, এই অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা মূল হোতা, সরবরাহকারী এবং ক্রেতাদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা শহরের প্রতিটি কবরস্থানের নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। প্রথাগত নৈশপ্রহরীর ওপর নির্ভর না করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি (যেমন: পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, মোশন সেন্সর এবং রাত্রীকালীন বিশেষ টহল) নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের সুযোগ না থাকে।
মনে রাখতে হবে, মৃত মানুষের চিরশান্তির অধিকার ও মরদেহের পবিত্রতা রক্ষা করা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার মৌলিক সামাজিক চুক্তির অংশ। এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে তার আইনি কঠোরতার পূর্ণ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। কেননা, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের শেষ শয্যার ন্যূনতম নিরাপত্তা ও মর্যাদা যদি সুরক্ষিত না হয়, তবে সমাজ থেকে ভয়, শঙ্কা এবং এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা কোনোদিনই দূর হবে না। অপরাধ দমনের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও সামষ্টিক বিবেকের পুনর্জাগরণ ঘটানো এখন অপরিহার্য; অন্যথায় এই কাঠামোগত নৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা আমাদের সামগ্রিক সভ্যতাকেই গ্রাস করবে।
লেখক: প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা স্কুল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়