১৩ জুলাই ২০২৬, ২১:২১

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, পরীক্ষা নয়, আগে শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা

লেখক  © সংগৃহীত

প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়। বন্যা, টানা বর্ষণ কিংবা জলাবদ্ধতা কোনো নির্ধারিত ক্যালেন্ডার মেনে আসে না। কিন্তু দুর্যোগের এমন সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হয় বাস্তবমুখী, সংবেদনশীল ও মানবিক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান বন্যা, অতিবর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা অমূলক নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সমান সুযোগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এইচএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে উচ্চশিক্ষার পথ, ভবিষ্যৎ পেশা এবং অসংখ্য স্বপ্ন। তাই পরীক্ষার পরিবেশও হতে হবে এমন, যেখানে প্রতিটি পরীক্ষার্থী সমান সুযোগ নিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু যখন কোনো অঞ্চলের শিক্ষার্থী কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়, কোথাও নৌকাই একমাত্র ভরসা, আবার কোথাও বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো প্রস্তুতিও নেওয়া সম্ভব হয় না—তখন সেই সমান সুযোগের প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত করেছে। অর্থাৎ সেখানে পরিস্থিতি পরীক্ষা গ্রহণের অনুকূল নয় বলে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের অন্য অনেক জেলায়ও বন্যা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমন অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কোন তথ্য ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি অঞ্চলের পরীক্ষা স্থগিত করা হলো, আর অন্য অঞ্চলে তা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এই প্রশ্নের স্পষ্ট, তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

এখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগকালে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করাও সুশাসনের অংশ। যদি বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে অঞ্চলভেদে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই মূল্যায়নের ভিত্তি প্রকাশ করা উচিত। আর যদি নতুন করে আরও অঞ্চলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তবে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রেও দ্রুততা ও নমনীয়তা প্রয়োজন।

অবশ্যই পরীক্ষা স্থগিত করা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। এর ফলে ফল প্রকাশ, ভর্তি কার্যক্রম এবং শিক্ষা ক্যালেন্ডারে প্রভাব পড়তে পারে। তবে শিক্ষা ক্যালেন্ডারের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু দুর্যোগের কারণে কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা বা অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হলে সেই ক্ষতি সহজে পূরণ হয় না। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু পরীক্ষা নেওয়া নয়, বরং নিশ্চিত করা যে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং ন্যায়সংগত পরিবেশে নিজের মেধার মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছে।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন নিয়মের কঠোর প্রয়োগ নয়, বরং পরিস্থিতির বাস্তব মূল্যায়ন। স্থানীয় প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্তের কারণ জানানো প্রয়োজন।

শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য শুধু সময়মতো পরীক্ষা সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত আছে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্যে। দুর্যোগের এই সময়ে মানবিকতা, বাস্তবতা এবং ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তই হতে পারে শিক্ষা প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেশব্যাপী অবিলম্বে স্থগিত করার প্রয়োজন।পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর নতুন সময়সূচি ঘোষণা করাই হবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে মানবিক ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, বর্তমান পরিস্থিতি প্রেক্ষিতে অনুরোধ রইল বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার জন্য। 

হাসান মাহমুদ শুভ
কলামিস্ট ও মেডিকেল শিক্ষার্থী।
ঢাকা, বাংলাদেশ।