১০ জুলাই ২০২৬, ২১:৩০

গবেষণা বাজেট বাস্তবায়নে ইউজিসির সামনে বড় পরীক্ষা

ইমরান হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

উচ্চশিক্ষা খাতে নীতিগত পরিবর্তন নতুন নয়। তবে কিছু পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়। সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, গবেষণার পরিবেশ এবং রাষ্ট্র–বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন তোলে। ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বাজেট বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নের সরকারি সিদ্ধান্ত তেমনই একটি উদ্যোগ।

সরকারের বক্তব্য স্পষ্ট। গবেষণায় বরাদ্দ কমানো হয়নি। পরিবর্তন এসেছে শুধু অর্থায়নের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে। লক্ষ্য হলো গবেষণা অর্থায়নে সমন্বয় আনা। স্বচ্ছতা বাড়ানো। জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এই উদ্দেশ্যকে সহজে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অনুদান ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য রয়েছে। কোথাও সময়মতো অর্থ ব্যয় হয়নি। কোথাও বরাদ্দের অর্থ ফেরত গেছে। আবার বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে গবেষণা তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগও এসেছে। কোথাও গবেষণার অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন অভিযোগও শোনা গেছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবেষণা অনুদান প্রকৃত গবেষণার পরিবর্তে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বা সম্মানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব অভিযোগ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে জনঅর্থ ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী জবাবদিহির প্রয়োজন রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এই বাস্তবতায় সরকার গবেষণা অর্থায়নের জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে। এর মাধ্যমে গবেষণা অনুদানের তথ্যভান্ডার তৈরি করা সহজ হবে। প্রকল্প পর্যবেক্ষণ আরও কার্যকর হতে পারে। গবেষণার ফলাফল মূল্যায়নেও অভিন্ন মানদণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব। জাতীয় গবেষণা অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণেও সুবিধা হতে পারে।

তবে উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেই সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাংশের উদ্বেগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, কেন্দ্রীয়ভাবে অর্থ ছাড় হলে ভবিষ্যতে একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হতে পারে। প্রশাসনিক ধাপও বাড়তে পারে। এসব প্রশ্নের জবাব নীতিমালাতেই থাকতে হবে।

ইউজিসির অবস্থানও স্পষ্ট। গবেষণার বিষয় নির্বাচন করবে বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করবে বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষক নির্বাচন ও প্রকল্প মূল্যায়নও তাদের দায়িত্ব। ইউজিসির কাজ হবে অর্থায়নের সমন্বয়, অর্থ ছাড়, আর্থিক তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কমিশন আরও জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হবে। গবেষণা বাজেট ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের জন্য পৃথক নীতিমালাও প্রণয়ন করা হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হলে উদ্বেগ অনেকটাই কমতে পারে।

বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। শিক্ষক সংগঠন, বিশেষ করে সাদা দল, উদ্বেগ জানিয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও বিবৃতি এসেছে। এসব প্রতিক্রিয়া দেখায়, গবেষণা অর্থায়নের প্রশ্নটি শুধু হিসাবরক্ষণের বিষয় নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসন এবং নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো গবেষণা অনুদান পরিচালনা করে। তারা অর্থায়ন, তদারকি ও মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু গবেষণার বিষয় নির্বাচন বা একাডেমিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে না। গবেষণা অনুদান দেওয়া হয় প্রতিযোগিতামূলক আবেদন, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে। অনেক এশীয় দেশেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা সমজাতীয় সংস্থা গবেষণা অর্থায়নের সমন্বয় করে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখে। বাংলাদেশেও সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আস্থা তৈরি করা। ইউজিসির উচিত নীতিমালা প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কোন দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের, আর কোন দায়িত্ব ইউজিসির—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থ ছাড়ের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। আবেদন থেকে অর্থ ছাড় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা প্রয়োজন। প্রতি বছর গবেষণা অনুদান, গবেষণার ফলাফল এবং অর্থ ব্যবহারের ওপর একটি উন্মুক্ত জাতীয় প্রতিবেদনও প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে জনআস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি জবাবদিহিও শক্তিশালী হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও দায়িত্ব কম নয়। শুধু আপত্তি জানানো যথেষ্ট নয়। বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তাবও দিতে হবে। অন্যদিকে ইউজিসিরও উচিত এই উদ্যোগকে প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অংশীদারিত্বভিত্তিক সংস্কার হিসেবে এগিয়ে নেওয়া। উচ্চশিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন কখনো একতরফাভাবে সফল হয় না। সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং আস্থাই তার ভিত্তি।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)

ডিসক্লেইমার: নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত