০৪ জুলাই ২০২৬, ১৫:১০

অনুৎপাদনশীল খাত থেকে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পদের ব্যবহার ও ভাষা শিক্ষার আধুনিকায়ন

প্রফেসর ড. এ. কে. এম. রেজভী মামুদ  © টিডিসি সম্পাদিত

সাধারণত বিবেচনা করা হয়, শিক্ষা খাত সরকারের একটি অলাভজনক বা সেবামূলক খাত। এখানে রাষ্ট্র কেবল বাজেট বরাদ্দ দেয় এবং ব্যয় করে; বিনিময়ে সরকারি কোষাগারে সরাসরি আর্থিক রিটার্ন বা রাজস্ব সেভাবে আসে না। শিক্ষার্থীদের নামমাত্র বেতন, পরীক্ষার ফি কিংবা খাতা-কলম কেনাকাটার ওপর সামান্য ভ্যাট-ট্যাক্সই এই খাতের দৃশ্যমান আয়ের উৎস। কিন্তু আমরা যদি একটু ভিন্ন কোণ থেকে তাকাই, তবে দেখব আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিশাল এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের দেশের হাজারো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশাল মাঠের চারপাশ, অব্যবহৃত জমি এবং বড় বড় পুকুর বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। খেলাধুলার জন্য মূল মাঠটি উন্মুক্ত ও অক্ষুণ্ণ রেখেই কিন্তু এই সম্পদের বাণিজ্যিক ও উৎপাদনশীল ব্যবহার সম্ভব।

সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার কেমন হতে পারে?
*অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ভাড়া: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে বা মাঠের ক্ষতি না করে পরিকল্পিত বাণিজ্যিক অবকাঠামো বা দোকানপাট নির্মাণ করা যেতে পারে। এগুলো ভাড়া দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করতে পারে।

*পুকুরে সমন্বিত মৎস্য চাষ: প্রাতিষ্ঠানিক পুকুরগুলোতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় সম্ভব।

*ফলজ ও বনজ বৃক্ষরোপণ: ক্যাম্পাসের খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করে সবুজায়ন ও অর্থনৈতিক লাভ—দুই-ই নিশ্চিত করা যায়।

*এই রাজস্বের একটা অংশ যেমন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষার মান উন্নয়নে ব্যয় করা যাবে, তেমনি অন্য অংশটি জমা হতে পারে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এতে সরকারের ওপর শিক্ষা খাতের একক আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে।

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভাষা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও শিক্ষক সমাজের ভূমিকা
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের একাধিক বিদেশী ভাষা শেখার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে দূরদর্শী পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবলমাত্র দেশে বিদ্যমান হাতেগোনা কয়েকটি ভাষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট দিয়ে এত বিশাল জনসংখ্যার একটি দেশে এই যুগান্তকারী প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।

এর জন্য প্রয়োজন আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষা অবকাঠামোকে ব্যবহার করা। দেশে বিদ্যমান প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দকে যদি যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করা যায়, তবে প্রতিটি অঞ্চলেই বিদেশী ভাষা শেখার কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। আর শিক্ষকবৃন্দকে এই অতিরিক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত সম্মানী প্রদান করা হলে, তা তাদের কাজে দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব ও গতিশীলতা আনয়নে দারুণ সহায়ক হবে।

তবে শুধু ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নিলেই হবে না, পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের সনাতন শিক্ষা কাঠামো ও পদ্ধতিতে। আমাদের দেশে ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে শেখানো হলেও, সিংহভাগ শিক্ষার্থী এই ভাষাটি আয়ত্ত করতে পারে না। বরং তাদের মনে ভাষা নিয়ে কাজ করে এক ধরণের অনীহা ও আতঙ্ক।

যেকোনো ভাষা শেখার স্বাভাবিক বুনিয়াদ বা প্রাকৃতিক নিয়ম হচ্ছে প্রথমে শোনা (Listening) এবং পরে বলা (Speaking)। অথচ আমাদের বিদ্যমান কাঠামোতে বাচ্চাদের ইংরেজি শেখানো হয় উল্টো দিক থেকে অর্থাৎ প্রথমে পড়া (Reading) এবং পরে লেখা (Writing) দিয়ে। তদুপরি, শিক্ষার্থীরা ভাষা শেখার আগেই জট পাকিয়ে ফেলে কঠিন সব গ্রামারের নিয়মের সাথে। ফলাফল? শিক্ষার্থীরা ইংরেজির নাম শুনলেই আতঙ্কে ভোগে, পরীক্ষার আগের রাত কাটে নির্ঘুম। তাই শুধু বর্তমান প্রজন্মের মেধার সমালোচনা না করে প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতিগত পরিকল্পনা এবং যথাযথ দিকনির্দেশনা।

আইটি ল্যাব, ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষ জনশক্তি
ভাষা দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল দক্ষতা যুক্ত হলে আমাদের তরুণ সমাজ অপরাজিত শক্তিতে পরিণত হবে। অনেক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মেধাবী শিক্ষার্থীর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেবল ল্যাপটপ বা ভালো ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে তারা ফ্রিল্যান্সিং বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্ত হতে পারছে না।

এখানেই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের বড় বড় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত 'হাই-টেক কম্পিউটার ল্যাব' স্থাপন করে সেগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য (Accessible) করা যেতে পারে। একটি সরকারি পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মেন্টর দ্বারা ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং বা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।

একদিকে ভাষা জ্ঞান এবং অন্যদিকে আইটি দক্ষতা এই দুইয়ের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। এই আয়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী সার্ভিস চার্জ বা ট্যাক্স নির্ধারণ করা যেতে পারে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। বিনিময়ে গরিব শিক্ষার্থীরা ল্যাবে পাবে একদম বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে প্রবেশের অধিকার।

সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেবল ‘বাজেট গ্রাসকারী’ খাত হিসেবে না দেখে একে স্বনির্ভর, আধুনিক ও উৎপাদনশীল করার সময় এসেছে। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা।

পরিত্যক্ত পড়ে থাকা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, ভাষা শিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার এবং তরুণদের আইটি শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আর কেবল 'ব্যয়ের খাত' থাকবে না; বরং তা হয়ে উঠবে দেশের দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি রচনার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই ধরনের বাস্তবমুখী উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।


লেখক:  বিভাগীয় প্রধান, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর