০১ জুলাই ২০২৬, ২১:২৫

আজ ‘ফক্কা-মক্কা’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

খালিদ মাহমুদ পলাশ  © সংগৃহীত

পূর্ববঙ্গ ও আসামের অবহেলিত, নিপীড়িত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা করা হয় এবং রাজধানী নির্ধারণ করা হয় ঢাকা। উচ্চবর্ণীয় সাম্প্রদায়িক জমিদার ও তথাকথিত সুশীল সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়ে এর বিরোধিতায়। এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাদের রক্তচোষা জমিদারি হারানোর ভয়ে এবং ব্রিটিশ ভারতের ‘যবন’ ও ‘ম্লেচ্ছ’ অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ ও বৃহত্তর আসামের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের প্রচেষ্টাকে রুখে দেয়। এই সাম্প্রদায়িক, অত্যাচারী, ইংরেজদের দালাল গোষ্ঠী বঙ্গভঙ্গের এই উদ্যোগকে নাম দেয় ‘ভারতমাতার অঙ্গচ্ছেদ’। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা’, চালু করলেন ‘রাখিবন্ধন’, যা বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছিল।

বঙ্গভঙ্গ রদের কারণে মুসলিম সমাজে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়, তা প্রশমনের জন্য বড়লাট হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সেই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।

হিন্দু সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রতিবাদসভার আয়োজন করেন এবং সভার সিদ্ধান্তগুলো ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রেরণ করতে থাকেন। বাবু গিরিশচন্দ্র ব্যানার্জী, ড. স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা বড়লাট হার্ডিঞ্জের কাছে ১৮ বার স্মারকলিপি প্রদান করেন। তারা যুক্তি দেখান, পূর্ববঙ্গের মুসলমানগণ অধিকাংশই কৃষক। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে তাদের কোনো উপকার হবে না। (Report of the Calcutta University Commission)

এ ছাড়া পূর্ববঙ্গের দুই শত গণ্যমান্য হিন্দু, ঢাকার প্রখ্যাত উকিল বাবু আনন্দচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের তীব্র বিরোধিতা করে ভাইসরয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি দেন। (A History of Freedom Movement, চতুর্থ খণ্ড)

১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার কিছুদিন পর, ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে হিন্দুরা প্রতিবাদসভার ডাক দেয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (নীরদ চৌধুরী, The Autobiography of an Unknown Indian)

যদিও কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু সাহিত্যকর্মের রেফারেন্স দিয়ে বলেন, তিনি ২৮ মার্চ কলকাতায় ছিলেন না। কিন্তু নীরদচন্দ্রের মতো একজন ব্যক্তি যখন লিখে গেছেন যে তিনি গড়ের মাঠের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন, তখন অভিযোগটি সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রচণ্ড মুসলিমবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাজারো বিরোধিতার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ চলতে থাকে। নবাব সলিমুল্লাহর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে বড়লাটের চরম মতবিরোধ হয় এবং উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ঘটে। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহকে বড়লাটের নির্দেশে বড়লাটের বাসভবনে গুলি করে হত্যা করা হয়। আবার কারও মতে, তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়।

নবাবের মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। নবাবের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তখন এগিয়ে আসেন নওয়াব আলী চৌধুরী। ১৯১৭ সালের ২০ মার্চ সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি পুনরায় উত্থাপন করেন এবং অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিল পাসের দাবি জানান।

কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন।

অবশেষে ‘নাথান কমিশন’-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস হয়। সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ নয় বছর পর, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বাধার মুখে রমনার বিশাল সবুজ চত্বরে ৬০০ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত, বহু সংগ্রামের ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে এবং এক বছর পরে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। (মেজর জেনারেল (অব.) এম. এ. মতিন, বীরপ্রতীক, পিএসসি, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা)

১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ভাষণদানকালে লর্ড লিটন বলেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলো বঙ্গভঙ্গ রদের কিছুটা ক্ষতি পূরণ। এ অঞ্চলের মানুষ একে মনেপ্রাণে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করে, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নানাভাবে এর ক্ষতি করতে তৎপর হয়।’

১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সরকার সে সময়ে ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেয়, অথচ সেই সময়ের শিক্ষামন্ত্রী প্রভাষ সিং তা সমগ্র বাংলা প্রদেশের শিক্ষা বিস্তারের জন্য বরাদ্দ দেন।’ (ড. মো. মাকসুদুর রহমান, বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালির ঐক্য)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিদ্বেষ থামেনি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেন, ‘এসেছিলাম ‘ডাক্কা’ (Dacca) ইউনিভার্সিটিতে, এসে দেখি ‘মক্কা’ ইউনিভার্সিটি। কিছুদিন পরে দেখলাম ‘ফক্কা’ ইউনিভার্সিটি, এখন দেখছি ‘ধাক্কা’ (Dhaka) ইউনিভার্সিটি।’

শ্রী ভাণ্ডারকর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য মি. ফিলিপ হার্টগকে একজন ‘অসুর’ বলেন এবং পূর্ববঙ্গকে ‘অসুরদের স্থান’ বলে উল্লেখ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা চাকরি করতে আসবেন, তারাও ‘অসুর’ হয়ে যাবেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। (আবুল আসাদ, একশ বছরের রাজনীতি)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এর ছাত্রসংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। তখন ১৯২৩ সালে মুসলিম ছাত্রদের জন্য একটি হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়, যা নির্মাণের পর ১৯২৯ সালে নামকরণ করা হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। এই হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকেই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী মন্তব্য করতে থাকে—এই প্রকাণ্ড হল নির্মাণের কোনো প্রয়োজন নেই; ছাত্রের অভাবে একসময় এখানে গরু-ছাগল থাকবে। অথচ এই হল পরবর্তীকালে পৃথিবীখ্যাত ও দেশবরেণ্য বহু ব্যক্তিকে বুকে ধারণ করেছে। (ড. মো. মাকসুদুর রহমান, বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালির ঐক্য)

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ এই পর্যায়ে এসেছে।এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হলে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই বাংলাদেশ।

এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। লেখকের বক্তব্য, তথ্য বিশ্লেষণ ও মতামতের সাথে সম্পাদকীয় নীতিমালার মিল নাও থাকতে পারে।।