২৯ জুন ২০২৬, ১৩:০৪

হারিয়ে যাওয়া মক্তব শিক্ষা: সরকার কি দৃষ্টি দেবে

রাসেল ইব্রাহীম  © সংগৃহীত

মক্তব মুসলিম সমাজের এক ঐতিহ্যবাহী প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। সাধারণত স্থানীয় এই শিক্ষালয়ে শিশুদের আরবি হরফ চেনা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-কালাম এবং প্রাথমিক ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞান শেখানো হয়। সমাজে নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার মজবুত ভিত্তি তৈরিতে এর ভূমিকা অপরিসীম। 

এটি ছিল ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য একটি উন্মুক্ত ও প্রায় স্বল্পমূল্যে শিক্ষার এক অনন্য মাধ্যম, যা সামাজিক বৈষম্য দূর করত।মক্তবের কারণে গ্রামের সব বাড়ির শিশুরা একসঙ্গে বসত। এতে তাদের মধ্যে শৈশব থেকেই চমৎকার ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক মেলবন্ধন তৈরি হতো।

এক সময় আমাদের গ্রামীণ সমাজের প্রতিটি এলাকা বা বাড়ির আঙিনায় মক্তব ছিল। সকালের আলো ফুটতেই চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠত শিশুদের কণ্ঠে আরবি হরফের উচ্চারণ আর শুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াতের মিষ্টি সুরে। সেখানে কেবল রিডিং পড়াই হতো না, বরং সালাম দেওয়ার নিয়মকানুন থেকে শুরু করে নামাজ আদায়ের সঠিক পদ্ধতিও শেখানো হতো। মক্তবের সেই সম্মিলিত পড়ার আওয়াজ বাড়ির নারীদের কানেও পৌঁছাত, যার মাধ্যমে তাঁরাও নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতেন। দুঃখের বিষয়, আধুনিকতার করাল গ্রাসে সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ বিলীন হওয়ার পথে।

মক্তব কেবল পড়াশোনার জায়গা ছিল না, ছিল এক জীবন্ত আদালত। মাঝেমধ্যে পড়া শেষে সেখানে ছোটখাটো অপরাধের বিচার হতো। কেউ গালিগালাজ করলে, নামাজ না পড়লে কিংবা বড়দের সাথে বেয়াদবি করলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকত। এই ভয়ে আমরা অন্তত বন্ধুদের সামনেও কখনো মুখ খারাপ করতাম না। কারণ হুজুর জেনে ফেললে রক্ষা নেই! আর গুরুজনদের সাথে বেয়াদবি করার তো প্রশ্নই আসত না।

হুজুরের সেই স্নেহের শাসনের ভয়ে আমরা সকালেই ঘুম থেকে উঠতাম, ফজরের নামাজ পড়তাম এবং সময়মতো মক্তবে হাজির হতাম। পড়া শেষে বাড়ি ফিরে নাস্তা করে  স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম। এমনকি মাগরিব ও এশার আজান দেওয়ার দায়িত্বও অনেক সময় আমরা শিক্ষার্থীরাই ভাগাভাগি করে নিতাম। কী চমৎকার আর সুশৃঙ্খল এক লাইফস্টাইল ছিল আমাদের!

আজ আধুনিকতার দোহাই দিয়ে গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মক্তবের সেই সুশৃঙ্খল শিক্ষা ব্যবস্থা; হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের নীতি-নৈতিকতার বুনিয়াদি চর্চা। বর্তমান প্রজন্মের চরম নৈতিক অবক্ষয় রোধে এই ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন আজ সময়ের দাবি।

মক্তব ব্যবস্থা চালু হলে সরকারের বাড়তি খরচ হবে না বরং উৎসাহ দিলে মানুষ এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে উৎসাহিত হবে। আমাদের কোনো জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য (এমপি) যদি জাতীয় সংসদে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তুলে ধরেন এবং সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিটি এলাকায় মক্তব ব্যবস্থা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেন, তবে সমাজ আবার তার হারানো শৃঙ্খলা ও সুন্দর পরিবেশ ফিরে পাবে।

লেখক: রাসেল ইব্রাহীম
শিক্ষক, কলামিস্ট ও গীতিকার