২১ জুন ২০২৬, ২০:২৭

বাবার আদরের কন্যা থেকে অবহেলিত নারী

প্রতীকী ছবি   © সংগৃহীত

বাবাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা আমরা প্রায়ই বলি। বাবা দিবসে সেই অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোও আমাদের দায়িত্ব। তবে এই দিনটি আমাদের সামনে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়, যে বাস্তবতা নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি।

চারপাশে একটু তাকালেই দেখা যায়, একজন কন্যাসন্তান তার বাবার কাছ থেকে যে আদর, যত্ন ও স্নেহ পেয়ে বড় হয়ে ওঠে, সেই সম্মানের সামান্য অংশটুকুও অনেক নারী পরবর্তীকালে তাদের জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে পান না। আরও দুঃখজনক হলো, অনেক ক্ষেত্রে যে বাবা নিজের মেয়ের জন্য পৃথিবীর সব সুখ কামনা করেন, তিনিই আবার নিজের স্ত্রীকে সেই মর্যাদা ও সম্মান দিতে ব্যর্থ হন। ফলে এক অদ্ভুত চক্রের সৃষ্টি হয়। একজন বাবার আদরের কন্যাই আরেকজন বাবার পরিবারের সদস্য হয়ে অবহেলা, অসম্মান কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।

বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, অনেক পরিবারে কন্যাসন্তানকে সমান মর্যাদায় দেখা হয় না। কোথাও কোথাও মেয়েশিশুকে বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার স্বপ্ন, ইচ্ছা কিংবা ব্যক্তিসত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ একটি মেয়ের আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশের পেছনে বাবার দৃষ্টিভঙ্গি গভীর প্রভাব ফেলে। একজন বাবা যদি নিজের মেয়েকে সম্মান করতে শেখেন, তবে তিনি শুধু একটি সন্তানের জীবনই সুন্দর করেন না; তিনি একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণেও অবদান রাখেন।

একটি মেয়ের জীবনে বাবার স্থান নিঃসন্দেহে অনন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার জীবনে আরেকজন মানুষ আসেন, যিনি হয়ে ওঠেন তার সবচেয়ে কাছের আশ্রয়— তার জীবনসঙ্গী। অনেক নারী আছেন, যারা খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন কিংবা বাবার স্নেহ-ভালোবাসা অনুভব করার সুযোগ পাননি। তাদের কাছে জীবনসঙ্গীই হয়ে ওঠেন সেই মানুষ, যার কাছে তারা ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সম্মান, যত্ন ও মানসিক আশ্রয়ের পূর্ণতা খোঁজেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় না। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের নানা স্তরে অসংখ্য নারী এখনও অবহেলা, অসম্মান, বৈষম্য ও অমানবিক আচরণের মুখোমুখি হন। যে ভালোবাসা ও মর্যাদা তারা প্রাপ্য, তা অনেক সময় তাদের নাগালের বাইরেই থেকে যায়।

এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য বাবা দিবসের আনন্দকে ম্লান করা নয়, কিংবা বাবাদের অবদানকে খাটো করা নয়। বরং এটি আত্মসমালোচনার একটি সুযোগ। কারণ একজন বাবা যদি সত্যিই নিজের মেয়েকে ভালোবাসেন, তবে তার উচিত অন্যের মেয়েকেও একই মানবিকতা, সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা।

সমাজ তখনই বদলাবে, যখন আমরা নিজেদের পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে মানবিকতার চর্চা করব। যেদিন একজন পুরুষ নিজের কন্যার জন্য যে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা কামনা করেন, সেদিন তিনি অন্যের কন্যার প্রতিও একই আচরণ করবেন— সেদিনই হয়ত ‘আদরের কন্যা থেকে অবহেলিত নারী’ হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ সামাজিক চক্র ভাঙতে শুরু করবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়