ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত সংকট: আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং জোরপূর্বক বহিষ্কারের রাজনীতি
‘ভাই, আমার ছেলেটা খুব তৃষ্ণার্ত। দয়া করে একটা পানির বোতল এনে দেবেন? আমি টাকা দিয়ে দেব। না হলে ওকে এই পচা পানি খেতে হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন শামসুল আলম, বাংলা ভাষাভাষী এক মুসলিম ব্যক্তি, যাকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জোরপূর্বক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। তার কোলে ছিল ছোট ছেলে আবদুস সালাম। তৃষ্ণায় শুকিয়ে যাওয়া মুখ, পানির জন্য আকুল কণ্ঠ। এটি কেবল একজন শামসুল আলমের গল্প নয়; বরং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখায় অমানবিকভাবে আটকে থাকা শত শত মানুষের করুণ বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত মানুষকে জড়ো হতে দেখা গেছে। নবগঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কথিত অবৈধ অভিবাসীবিরোধী অভিযানের জেরে সেখানে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। গত ২৯ মে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে “অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত, ভোটার তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কার”—এই স্লোগান ছিল বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।এবং দলটি উভয় রাজ্যেই জয়লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা গড়ে তোলেন তথাকথিত “মুসলিম বিদেশি” ও “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” ইস্যুকে কেন্দ্র করে। ৪ জুন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কথিত অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী সন্দেহে মানুষকে আটক ও গোপনে বহিষ্কারের সমন্বিত অভিযান শুরু হয়েছে।
চলতি মাসে বিএসএফ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের যাদের অনেকে ভারতের বৈধ নাগরিক তাদের অপহরণ ও জোরপূর্বক বাংলাদেশে “পুশ-ইন”- করেছে। এসব ঘটেছে কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া, যাচাই বা বিচারিক সুযোগ ছাড়াই। ফলে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এখন সহিংসতার এক ভয়াবহ মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করে ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘন সংঘটিত হচ্ছে।
এর আগেও, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভারত বড় পরিসরে পুশ-ইন অভিযান চালায়। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত প্রায় ২ হাজার ৪৭৯ জন বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমকে “অবৈধ অনুপ্রবেশকারী” আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়, যদিও তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এই ধরনের কর্মকাণ্ড বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত অমানবিকীকরণের দৃষ্টান্ত, যা সীমান্ত এলাকায় গুরুতর মানবিক সংকট সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এসব অভিযানকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, যাচাই ছাড়া কোনো বাংলাদেশিকে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে বাংলাদেশ তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে। পুশ-ইন আন্তর্জাতিক আইন ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তির পরিপন্থী।
ভারতের বর্তমান পুশ-ইন অভিযান একদম নতুন নয়; বরং ১৯৯২ সালের “অপারেশন পুশ ব্যাক”-এর পুনরাবৃত্তি, যেখানে ১৩২ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। ২০০২-২০০৩ সালেও, যখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার ক্ষমতায় ছিল, একই ধরনের ঘটনা দেখা যায়। ২০০৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিএসএফ সদস্যরা অস্ত্রের মুখে প্রায় ২০০ বাংলা ভাষাভাষী নারী-পুরুষ ও শিশুকে মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তবে বর্তমান অভিযানের ব্যাপ্তি অতীতের সব নজির ছাড়িয়ে গেছে। এই সহিংসতার প্রভাবে পুশ ইনের শিকার পরিবারগুলো শোক ও আতঙ্কে বিপর্যস্ত,তাদের জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে, আর সীমান্তবর্তী জনপদে তৈরি হওয়া ভয়ের সংস্কৃতি স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
ভারতের “পুশ-ইন” অভিযান যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে
বিএসএফের অবৈধ আটক ও পুশ-ইন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (IHRL) এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (IHL) সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তির (ICCPR) ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। কাউকে ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না এবং আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
কিন্তু বিএসএফ বাংলা ভাষাভাষী মানুষ, বৈধ ভারতীয় নাগরিক এবং শরণার্থীদের কোনো যাচাই, আইনি সহায়তা বা প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা ছাড়াই বহিষ্কার করছে। এই ধরনের সমষ্টিগত বহিষ্কার আন্তর্জাতিক আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতির পরিপন্থী। আইসিসিপিআরের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ক কনভেনশনের ২২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির বিষয়ে আলাদা মূল্যায়ন, আইনি প্রতিকার এবং বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়—যা ভারত উপেক্ষা করছে।
এসব কর্মকাণ্ড “নন-রিফাউলমেন্ট” নীতিরও লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের এই মৌলিক নীতি এবং ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে এমন জায়গায় ফেরত পাঠানো যায় না যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি মানবাধিকার সনদের (UDHR) ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আশ্রয় চাওয়ার অধিকারেরও পরিপন্থী।
বিএসএফের বহুল সমালোচিত “দেখামাত্র গুলি” নীতিও গভীর উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি কেবল তখনই ব্যবহার করা যায়, যখন তা মানবজীবন রক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। আইসিসিপিআরের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ জীবনের অধিকারকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে আইসিসিপিআরের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের (CAT) ১ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্যাতন, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিএসএফের হাতে নির্যাতন, হত্যা ও অমানবিক আচরণের অভিযোগ এসব মৌলিক সুরক্ষাকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি ব্যাখ্যা করেছে যে, এই সুরক্ষা শুধু নাগরিকদের জন্য নয়; দীর্ঘদিন বসবাসকারী অনথিভুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশই আইসিসিপিআরের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র, ফলে চুক্তিটির বিধান মানতে তারা আইনগতভাবে বাধ্য।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তির লঙ্ঘন
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একাধিক আনুষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের যৌথ সীমান্ত নির্দেশিকা এবং ২০১১ সালের সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (CBMP) উল্লেখযোগ্য। এসব চুক্তির মাধ্যমে মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সিবিএমপি অনুযায়ী, ভারতীয় বিএসএফ ও বাংলাদেশের বিজিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (নোডাল অফিসার) অবৈধ অনুপ্রবেশ বা মানবপাচারের মতো বিষয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেবেন এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন। কিন্তু একতরফাভাবে গণহারে পুশ-ইন এসব বিদ্যমান চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। এতে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অতএব, দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের জোরপূর্বক ঠেলে দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইন, রীতি ও কনভেনশনের একাধিক বিধান স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছে।
বাংলাদেশের করণীয়
অবৈধ পুশ-ইন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার ধারাবাহিকতা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ন্যায়বিচারের ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘন করছে না; বরং নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রহীন, বাস্তুচ্যুত ও অসহায় করে তুলছে।
বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্থাপন করতে হবে। জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করে এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার অভিযোগ এবং বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের অবৈধভাবে বহিষ্কারের মতো কর্মকাণ্ডের জন্য ভারতকে আন্তর্জাতিক জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
লেখক : রজব আল ফাহিম
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়