শুধু স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করে কি শাস্তি দেওয়া যায়?
যেহেতু শিশু রামিসার ধর্ষক-খুনি দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (Confession) দিয়েছে, সেহেতু তাকে শাস্তি দিতে বাধা কোথায়? এভাবে অনেকেই পোস্ট-কমেন্ট করছে। একজন ধর্ষক ও খুনির শাস্তি চাওয়ার পক্ষে অবস্থা নেওয়াকে শ্রদ্ধা করে জানাচ্ছি, আইন খুবই জটিল বিষয়৷ আইনের চোখ আর সাধারণ মানুষের চোখ এক নয়৷ দেশে প্রচলিত আইনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে কী বলা আছে, তা জেনে নেওয়া যাক।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সরাসরি কোনো প্রমাণ নয়; বরং এটি সমর্থনমূলক সাক্ষ্য মাত্র। আলামত, সাক্ষ্য, প্রমাণ এ সবকিছু বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই করতে হয়। রায়ের আগে গ্রাউন্ড দেখিয়ে যেকোনো সময় আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহার করতে পারে। অন্য সকল তথ্য, সাক্ষ্য ও ফরেনসিক প্রতিবেদন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সঙ্গে মিলে গেলে তখন এ জবানবন্দি আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ বলে গণ্য হবে, অন্যথা নয়।
শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির উপর নির্ভর করে শাস্তি দেওয়া যায় না। বিভিন্ন সেকশন ও মামলার পর্যালোচনা দেখা যাক।
পুলিশের নিকট স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা:
আইনে স্বীকারোক্তি (confession) কার সামনে দেওয়া হয়েছে, তার ওপর গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিকে আইন ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে। পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিকে সাধারণত অবিশ্বস্ত (inherently unreliable) ধরা হয়। কারণ সেখানে ভয়ভীতি, চাপ, নির্যাতন বা প্রলোভনের আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই Evidence Act, 1872-এর ২৫ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, "কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।"
Md. Badsha v. State [9 DLR SC 11] মামলায় দেখা যায় যে, আসামি নিজে থানায় গিয়ে স্বেচ্ছায় পুলিশের নিকট দোষ স্বীকার করে এবং পুলিশ তা লিপিবদ্ধ করে। তবে আসামির বিপক্ষে এরূপ স্বীকারোক্তি অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হয়। কী বুঝলেন? পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
Sitaram v. State [AIR (1966) SC 1906] মামলায় দেখা যায় যে, আসামি দোষ স্বীকারোক্তিটি চিঠির মাধ্যমে পুলিশের ঠিকানায় প্রেরণ করে। পুলিশ চিঠির মাধ্যমে আসামির স্বীকারোক্তির বিষয়ে জানতে পারে, কিন্তু স্বীকারোক্তিটি প্রদানের সময় পুলিশ সেখানে উপস্থিত ছিল না। সংখ্যাধিক্য বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, স্বীকারোক্তিটি পুলিশের নিকট প্রদত্ত হয়েছে, তাই তা গ্রহণযোগ্য নয়; যদিও সেখানে কোনো পুলিশ উপস্থিত ছিল না।
২৫ ধারা প্রয়োগের জন্য পুলিশের নিকট স্বীকারোক্তিটি সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে প্রদত্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই, অনুমিত হলেই যথেষ্ট হবে। এমনকি পুলিশ স্বীকারোক্তিটি গোপনে শুনলে কিংবা আসামির আচরণের মাধ্যমে স্বীকারোক্তিটি পুলিশের নিকট প্রকাশ পেলেও তা পুলিশের নিকট প্রদত্ত হয়েছে মর্মে গণ্য হবে। এই ধারায় পুলিশ অফিসারের নিকট প্রদত্ত স্বীকারোক্তিটি আসামি কর্তৃক পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন হতে পারে, কিংবা অন্য যেকোনো সময় হতে পারে।
Deokinandan v. R [AIR (1963) All 753] মামলায়, একজন গ্রাম চৌকিদারকেও সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারার অর্থে পুলিশ অফিসার হিসাবে গণ্য করা হয়।
তবে ২৫ ধারার ব্যতিক্রম আছে। Evidence Act-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, "যদি আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা আলামত উদ্ধার হয়, তাহলে সেই অংশ আদালতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।" যেমন: আসামি যদি বলে চুরি করা জিনিস কোথায় লুকানো আছে এবং তার দেখানো স্থান থেকে সত্যিই সেই জিনিস উদ্ধার হয়, তাহলে সেই তথ্যের সংশ্লিষ্ট অংশ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তি:
Mia Mohiuddin v. State 75 DLR (AD) 2023 এই মামলায় আপিল বিভাগ বলেছেন, Confession is admissible only if it is voluntary and true. It can not be the sole basis of conviction unless corroborated by other evidence.
অর্থাৎ কোনো স্বীকারোক্তি তখনই আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তা স্বেচ্ছায় ও সত্যভাবে দেওয়া হয়। পুলিশি চাপ, ভয়ভীতি বা নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে আদালত বলেন, শুধু স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না; স্বীকারোক্তির সঙ্গে সাক্ষ্য, আলামত, ফরেনসিক রিপোর্ট বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের সমর্থন থাকতে হবে।
"It can not be the sole basis of conviction...”
অর্থাৎ শুধু "আমি অপরাধ করেছি" এমন বক্তব্যই কাউকে সাজা দেওয়ার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। কারণ মানুষ নানা কারণে মিথ্যা স্বীকারোক্তিও দিতে পারে। যেমন: ভয়, চাপ, কাউকে বাঁচানো, মানসিক বিভ্রান্তি, নির্যাতন ইত্যাদি। তাই আদালত শুধু স্বীকারোক্তি শুনেই দ'ণ্ড দেন না।
“...unless corroborated by other evidence.” অর্থাৎ স্বীকারোক্তির সঙ্গে অন্য প্রমাণের মিল থাকতে হবে। যেমন: উদ্ধার হওয়া আলামত, সাক্ষীর বক্তব্য, ফরেনসিক রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ (যদি থাকে), মোবাইল লোকেশন, ডাক্তারি রিপোর্ট, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি যদি স্বীকারোক্তিকে সমর্থন করে, তখন আদালত সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করতে পারেন।
উদাহরণ দিয়ে বুঝাই:
একজন বলল, “আমি ছুরি দিয়ে হত্যা করেছি।” কিন্তু হত্যার অস্ত্র পাওয়া গেল না, ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির প্রমাণ নেই, ফরেনসিক রিপোর্ট মিলল না, কোনো সাক্ষীও নেই, তাহলে শুধু ওই স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, যদি তার দেখানো মতে ছুরি উদ্ধার হয়, আঙুলের ছাপ মিলে যায়, সিসিটিভিতে দেখা যায়, সাক্ষ্য-প্রমাণ মিলে যায়, তাহলে স্বীকারোক্তি শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হয়।
অর্থাৎ আপিল বিভাগ এখানে মূলত বলেছেন, স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও, সেটি একা যথেষ্ট নয়; আদালত আরও সমর্থনকারী প্রমাণ খোঁজেন। তাই রামিসার ধর্ষণকারী-হত্যাকারী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও শুধু এটার উপর নির্ভর করে শাস্তি দেওয়া যাবে না। আরও প্রমাণ জরুরি। আমরা চাই, অতিদ্রুত সকল আইনি বিষয় নিষ্পন্ন করে হত্যাকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক।