১৫ মে ২০২৬, ০৯:৩২

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতার কালানুক্রমিক ইতিহাস ও তাদের বর্তমান হালচাল

নাজমুল হাসান গোলজার  © টিডিসি সম্পাদিত

পাকিস্তান আমলে বেসরকারি শিক্ষকেরা সরকারি কোষাগার থেকে মাসিক মাত্র পাঁচ টাকা মহার্ঘ ভাতা পেতেন। ১৯৫৭ বা ১৯৫৮ সালে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে ব্যাপক শিক্ষক আন্দোলন হয় যার ফলে ভাতার পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে মাধ্যমিকের শিক্ষকদের ১৫ টাকা ও কলেজের শিক্ষকদের ২০ টাকা করা হয়। ষাটের দশকে কলেজ শিক্ষকেরা মাসিক ৩০ টাকা ও মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা ২০ টাকা সরকারি অনুদান পেতেন। 

স্বাধীনতার পর শিক্ষকদের ভাগ্যের বিশেষ উন্নতি হয়নি তবে অনুদান কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে কলেজ শিক্ষকেরা ৫০ টাকা ও স্কুল শিক্ষকেরা ৩০ টাকা পান।

১৯৭৭ সালের সংস্কার হিসেবে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা প্রায় দ্বিগুন করা হয় কলেজের শিক্ষকেরা ২০০ টাকা ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকেরা ১১০ টাকা ভাতা পেতে শুরু করেন। ১৯৮০ সালে প্রথম বারের মতো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাদের বেতনের ৫০ শতাংশ সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। এটি বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে গন্য হয়। 

১৯৮২ সালে ১৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা চালু হয় যা ১৯৮৩ সালে শিক্ষকদের দাবির মুখে বেড়ে ৩০ শতাংশ হয়। ১৯৮৪ সালে এমপিও প্রথার সূচনা হয়। সরকারি অংশ সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া শুরু হয়, যা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা কলেজের গভর্নিং বডির একচ্ছত্র আধিপত্য কমায় ও চাকরির নিরাপত্তা বাড়ায়। ১৯৮৬ সালে মেডিকেল ভাতা ৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় উন্নীত করা হয় এবং সরকারি বেতনের অংশ ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়। সেই সাথে শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য একটি কল্যাণ ট্রাস্ট  গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

নব্বই এর দশকের আন্দোলনের তীব্রতা ও অগ্রগতিতে ১৯৯৪ সালে ১০০ শতাংশ বেতনের দাবিতে একটি শক্তিশালী আন্দোলন হয় যাতে পাবলিক পরীক্ষা বর্জন ও হরতালের মতো কঠিন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ ১৯৯৪ সালে মেডিকেল ভাতা ১৫০ টাকায় উন্নীত করা হয় এবং টাইম স্কেল দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে সরকারি বেতনের অংশ আরো ১০ শতাংশ বেড়ে ৮০ শতাংশ করেন তৎকালীন বিএনপি সরকার। 

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে সিদ্ধান্ত নেন বেসরকারি শিক্ষকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করার। বেতনের সরকারি অংশ সরাসরি শিক্ষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা, যা অনিয়ম দূর করে এবং শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। এই দশকে শিক্ষক সংগঠনগুলো একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা আন্দোলনের একতাকে দুর্বল করে।

২০০০ সালে একটি গোল টেবিল বৈঠকের মাধ্যমে সরকারি বেতনের অংশ ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ২০০২ সালে আরো ২টি বড় অর্জন হয়-বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবসর সুবিধা চালু করা হয়, উৎসব ভাতা চালু করা হয় (শিক্ষকদের ২৫%, কর্মচারীদের ৫০%) বিএনপি সরকারের আমলে। শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে সরকারি বেতনের অংশ ১০০% করা হয় তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে যা একটি ঐতিহাসিক মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়।

পরবর্তী ২০১২-১৩ সালে বাড়ি ভাড়া ৩০০ টাকা ও মেডিকেল ভাতা ৩০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক -কর্মচারীরা অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৬ সালে বাড়ি ভাড়া ১ হাজার টাকায় ও মেডিকেল ভাতা ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। পরিবর্তে ইএফটি চালু করা হয়। ২০২৫ সালে শিক্ষকদের আন্দোলনের ফল স্বরুপ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাড়ি ভাড়া শতকরা হারে প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যা ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস হতে বেসিকের ৭.৫ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে জুলাই মাস হতে অতিরিক্ত আরো ৭.৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া পাবেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ বেতন পাচ্ছেন। বাড়ি ভাড়া ১৫ শতাংশ, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা বেসিকের ৫০ শতাংশ, বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ পাচ্ছেন যদিও সরকারি শিক্ষকদের সাথে তুলনা করলে পাহাড় সম বৈষম্য রয়ে গেছে।

শিক্ষা হলো রাষ্ট্রের সব নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার। আর এই শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকা শক্তি হলো শিক্ষক সমাজ। যাদের সম্মানজনকভাবে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ আখ্যা দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৪ বছর পরও বেসরকারি খাতের শিক্ষকদের তাদের ন্যূনতম জীবিকার দাবি ও অধিকার নিশ্চিত করতে বারবার আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হয়েছে। তাদের প্রাপ্য অধিকাংশই তারা আন্দোলনের মাধ্যমেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও বেসরকারি-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন সরকার প্রদান করছে, তবুও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বৈষম্য এখনো অব্যাহত রয়েছে। দেশে প্রায় ৩৬ হাজার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে ৬ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। অপরদিকে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাজারখানেক বা একটু বেশি। এ পরিসংখ্যানটি ইঙ্গিত করে যে, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তাদের শিক্ষা গ্রহন করে থাকে।

বেসরকারি শিক্ষকেরা শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণ জাতীয়করণ চান। সরকারি শিক্ষকদের মত চাকুরি শেষে পেনশন, বেসিকের উপর বিধি মোতাবেক বাড়ি ভাড়া, ১০০ শতাংশ উৎসব বোনাস, সন্তানের জন্য শিক্ষা ভাতা, চিত্তো বিনোদন ভাতাসহ আরো অনেক আর্থিক -অনার্থিক সুযোগ সু্বিধা থেকে তারা বঞ্চিত। বাড়ি ভাড়া ভাতা ও মেডিকেল ভাতাকে অসম্মানজনক মনে করা হয় এবং বেসিকের শতকরা হারে এগুলো চালুর দাবি অব্যাহত রয়েছে। আজ শিক্ষকদেরকে বলা হচ্ছে এটা সম্মানের পেশা কিন্তু শিক্ষকদের প্রতি উত্তর হলো সম্মান ধুয়ে কি পানি খাব যদি বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা না পাই।

সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষকদের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধার অনেক বৈষম্য রয়েছে। অথচ একই কারিকুলাম ও সিলেবাসে পাঠদান করেন। পাহাড়সম বৈষম্য দূর করণের একটিই সমাধান তা হলো জাতীয়করণ। বেসরকারি শিক্ষকেরাও মানুষ, তাদের ভালো ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে, চারটা ডাল ভাতার খাওয়ার অধিকার আছে, সুস্থ থাকার অধিকার আছে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বর্তমান বিপুল ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার যেন বেসরকারি শিক্ষকদের আকুল আকুতি শোনেন। শিক্ষা জাতি যেন মাথা উচু করে বাস করতে পারে। আমরা সবাই যেমন কোনো না কোনো মায়ের সন্তান, ঠিক তেমনি কোনো না কোনো শিক্ষকের ছাত্র। আমাদের শিক্ষকেরা রাস্তায় থাকলে, অভাব অভিযোগ করলে, চাকরি ও জীবন নিয়ে লজ্জিত বোধ করলে আমরা পুরো জাতিই লজ্জিত হই। তাদের, আমাদের তথা সমগ্র জাতির প্রত্যাশা অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমেই হোক।

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, তেঁতুলঝোড়া কলেজ, সাভার, ঢাকা