০১ মে ২০২৬, ১৯:৫৩

শিক্ষকদের ডিভাইস প্রদানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠি

অধ্যাপক ড. মো. আকতারুজ্জামান  © টিডিসি সম্পাদিত

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, 
সশ্রদ্ধ সালাম গ্রহণ করবেন।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি সত্যিকারের ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করার জন্য সরকার শিক্ষকদের জন্য ডিভাইস প্রদানের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে বিনীতভাবে আমি মনে করি, শুধুমাত্র প্রতিটি শিক্ষককে একটি ট্যাব দেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যালয়ভিত্তিকভাবে ক্রোমবুক (নেটবুক ল্যাপটপ) প্রদান করা আরও কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি এবং জাতীয়ভাবে লাভজনক হবে। 

যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অন্ততঃ এক হাজার স্কুলে আমেরিকান ও অস্ট্রেলিয়ান সরকারের বিভিন্ন ফেলোশিপের অধীনে আমি সরেজমিনে এই মডেল সফলভাবে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। বাংলাদেশও চাইলে একইভাবে একটি শক্তিশালী, টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। 
 
একটি ট্যাব মূলত ব্যক্তিগত ব্যবহারের ডিভাইস হয়ে যায়, কিন্তু একটি ক্রোমবুক ল্যাপটপ পুরো স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য যৌথভাবে ব্যবহারযোগ্য একটি শিক্ষা-সম্পদে পরিণত হতে পারে। যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে পর্যায়ক্রমে  ১০০টি ক্রোমবুক দেওয়া হয়, তবে তা শুধু শিক্ষকদের নয়, শিক্ষার্থীদেরও ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ তৈরি করবে। ধরুন একটা হাইস্কুলে ২০টা ক্লাস একসাথে চলছে, সেক্ষেত্রে ২০টা ল্যাপটপ শিক্ষকদের জন্যে রেখে বাকি ৮০টা ল্যাপটপ অনেকগুলো ক্লাসের শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রুপ আকারে দেয়া যায়। যদি ৩জন করে গ্রুপ হয়, তবে ২৪০ জন শিক্ষার্থী একই সময়ে ক্লাসে এই ডিভাইসের সুবিধা পাবে। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী যেই লগইন করুন, সেটা ঐ সময়ের জন্যে তার ডিভাইস হবে এবং চাইলে অনুমতি সাপেক্ষে বাসায় নিতে পারবে।

ক্রোমবুক ল্যাপটপের বড় সুবিধা হলো এর মূল্য। সাধারণভাবে একটি ক্রোমবুকের দাম ট্যাবের চেয়ে বেশি নয়।অনেক ক্ষেত্রে ১০০-১৫০ ডলারের মধ্যেই ভালো মানের ক্রোমবুক পাওয়া যায়। এইচপি, লেনোভোসহ বিশ্বের বহু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ক্রোমবুক ল্যাপটপ তৈরি করে। সরকার চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা করে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে যৌথভাবে উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, দেশীয় কর্মসংস্থান বাড়বে এবং প্রযুক্তি খাতে নতুন শিল্পভিত্তি গড়ে উঠবে।

ক্রোমবুক ল্যাপটপের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর পূর্ণাঙ্গ কিবোর্ড। শিক্ষকরা প্রতিদিন প্রশ্নপত্র তৈরি, পাঠ পরিকল্পনা লেখা, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন, রিপোর্ট প্রস্তুত, উপস্থাপনা তৈরি এবং প্রশাসনিক কাজ করেন। এসব কাজ ট্যাবের তুলনায় কিবোর্ডসহ ক্রোমবুকে অনেক দ্রুত, সহজ ও কার্যকরভাবে করা যায়। এছাড়া গুগল ডকস, স্লাইডস, মিট ভিডিও কনফারেন্সিং ও গুগল ক্লাসরুম-এর মতো বিনামূল্যের সফটওয়্যার ব্যবহার করে শিক্ষকরা সহজেই ক্লাস পরিচালনা, অনলাইন অ্যাসাইনমেন্ট, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন এবং সহযোগিতামূলক শিক্ষা চালাতে পারেন। এতে আলাদা সফটওয়্যার লাইসেন্স কেনার প্রয়োজন হয় না এবং ব্যয়ও কমে যায়। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - ক্রোমবুক শুধুমাত্র অনলাইনে নয়, অফলাইনেও কাজ করতে পারে। ইন্টারনেট না থাকলেও শিক্ষকরা লেখা সংরক্ষণ করতে পারেন, নথি পড়তে পারেন, ফাইল হার্ডডিস্কে সেভ করতে পারেন এবং পরে ইন্টারনেট সংযোগ পেলে সেগুলো (সমন্বয়) সিঙ্ক হয়ে যায়। বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট এখনও স্থিতিশীল নয় - সেখানে এই সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

ক্রোমবুকে যে কেউ নিজের অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করতে পারে। ফলে এটি ব্যক্তিগত মালিকানার ডিভাইস নয়, বরং বিদ্যালয়ের সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে ডিভাইস ব্যবস্থাপনা সহজ হয়, জবাবদিহিতা বাড়ে এবং শিক্ষার্থীরাও একই সম্পদ ব্যবহার করতে পারে। তারা টাইপিং, গবেষণা দক্ষতা, উপস্থাপনা তৈরি, অনলাইন সহযোগিতা, এমনকি প্রাথমিক কোডিংয়ের মতো ভবিষ্যতমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পারে, যা শুধুমাত্র ট্যাব দিয়ে যথাযথভাবে সম্ভব নয়। 

অবশ্যই কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন ইন্টারনেট, চার্জিং ব্যবস্থা, নিরাপদ সংরক্ষণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডিভাইস রক্ষণাবেক্ষণ। তবে এগুলো চ্যালেঞ্জ ট্যাবের ক্ষেত্রেও রয়েছে। পরিকল্পিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগুলো সহজেই সমাধানযোগ্য। বরং শুধুমাত্র ট্যাব বিতরণ করলে সেটি একটি ডিভাইস বিতরণ প্রকল্প হয়ে থাকবে কিন্তু ক্রোমবুকভিত্তিক ল্যাপটপ ব্যবস্থা একটি জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলবে। 

আজ প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কে একটি ডিভাইস পাবে?’ নয়, বরং ‘কীভাবে পুরো স্কুল ডিজিটালি সক্ষম হবে?’

আমার বিনীত বিশ্বাস, ট্যাবের পরিবর্তে ক্রোমবুকভিত্তিক ল্যাপটপ বিদ্যালয়-কেন্দ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামোই বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করবে। 
আপনার দূরদর্শী নেতৃত্বে এ বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে-এই প্রত্যাশা রইল। 

নিবেদক, 
অধ্যাপক ড. মো. আকতারুজ্জামান
সাবেক ফ্যাকাল্টি মেম্বার–আইইউটি, ড্যাফোডিল ও ফ্রন্টিয়ার টেক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
স্কুল, কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া