৩২০ টাকার কাচ্চি: ৪৬ জীবনের বিনিময়ে মূল্য চোকানোর গল্প
বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের দুই বছর পর আদালতের চার্জশিটে একটি ভয়াবহ সত্য উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্যমতে, রেস্তোরাঁ মালিক ও ম্যানেজারসহ অন্তত ২২ জন ব্যক্তি এমন তীব্র অবহেলার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, যা একটি ভবনকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছিল। সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে— জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ কাচ্চি ভাইয়ের কর্মীরা মূল গেট বন্ধ করে দিয়েছিলেন যাতে গ্রাহকরা তাদের বিল না চুকিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারেন।
সেই রাতে ৪৬ জন তরতাজা মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। অধিকাংশই জ্বলন্ত আগুনে নয়, ফাঁদে পড়ে পালাতে না পেরে ধোঁয়ায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, যখন বাঁচার তাগিদে গ্রাহকরা পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কাচ্চি ভাইয়ের সর্বাধিক গুরুত্ব ছিল তাদের উপার্জন রক্ষা করা। এক প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানির দাম প্রায় ৩২০ টাকা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির সেই রাতে অনেকেই তাদের জীবন দিয়ে বিল চুকিয়েছেন।
এটি শুধুমাত্র দুর্ঘটনার গল্প নয়, একটি সিস্টেম্যাটিক লোভ এবং অপরাধমূলক উদাসীনতার গল্প। আট তলা ভবনটি কোনো নিরাপত্তার দিকে খেয়াল না রেখেই পরিচালিত হচ্ছিল। রেস্তোরাঁগুলো যথাযথ লাইসেন্স ছাড়া চলছিল, পালানোর জন্য তৈরি সিঁড়িগুলো গ্যাস সিলিন্ডার এবং অন্যান্য পণ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। কার্যকর বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না, সহজে জ্বালানযোগ্য উপকরণ ভেতরে সাজানো ছিল। এমনকি ছাদও অবৈধভাবে ডুপ্লেক্স রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত হয়েছিল।
অগ্নিকাণ্ডটি গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটি ছোট কফি শপ থেকে শুরু হয়, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো ভবনকে গ্রাস করে। কিন্তু প্রতিটি এক্সিট খুলে দেওয়ার পরিবর্তে কিছু কর্মী কাচ্চি ভাইয়ের গেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন, যেখানে বিশেষ ‘Leap Year’ ডিসকাউন্টের জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন গ্রাহকরা। ছাদের গেটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই চরম ভয়ঙ্কর মুহূর্তে মানুষের জীবন বিল মেটানোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি।
এই চার্জশিট কেবল একটি আইনি নথি নয়। এটি গড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অভিযোগ, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধ্বসে পড়েছে এবং লাভকে মানব মর্যাদার ওপরে রাখা হয়েছে। ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে এমন বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো আইনি গ্রে-জোনে কাজ করছে— কোনো ফায়ার এক্সিট, জরুরি পরিকল্পনা বা জবাবদিহিতা ছাড়াই। বেইলি রোডের আগুন একা ঘটেনি। এটি বহু বছরের অবহেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক উপেক্ষার পূর্বাভাসযোগ্য ফলাফল।
অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একজন রেস্তোরাঁ মালিক দাবি করেছেন, তার কর্মীরা মানুষকে পালাতে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রমাণ হিসেবে ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। কিন্তু সিআইডির তদন্ত অন্য ছবি ফুটিয়ে তোলে, যেখানে কয়েক হাজার টাকার ক্ষতির ভয় মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে বেশি ছিল।
দুই বছর পর নিহতদের পরিবার এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে। বেঁচে থাকা ব্যক্তিরা এমন ট্রমা বহন করছেন, যা কোনো ক্ষতিপূরণ মুছে দিতে পারবে না। আর আমরা বাকি সবাই বিব্রত প্রশ্ন করছি— ঢাকার রেস্তোরাঁ ও ভবন মালিকরা মানবতা ও নিরাপত্তার মৌলিক মান পূরণ করার আগে আর কতগুলো ‘কাচ্চি ভাই’য়ের মত কতগুলো ঘটনা ঘটতে হবে?
২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট একটি প্রয়োজনীয় প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে যখন এত বড় অবহেলাকে কেবল দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে নৈতিক ও অপরাধমূলক অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। জীবনের মূল্য কখনো এক প্লেট খাবারের দামে ধরা উচিত নয়, যতই সুস্বাদু কাচ্চি হোক না কেন।