২৯ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৭

তেলের সংকট নাকি সিন্ডিকেটের খেলা? জেলায় জেলায় মজুতের চিত্র

পাপে তেল না থাকার চিত্র  © টিডিসি সম্পাদিত

দেশজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল সরবরাহ ঘাটতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্নটা আরও গভীরে, সংকটটি কি সত্যিই বাস্তব, নাকি পরিকল্পিতভাবে তৈরি। একদিকে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না, অন্যদিকে প্রশাসনের অভিযানে বারবার মিলছে বিপরীত চিত্র, দেশের বিভিন্ন এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে শত শত, কোথাও আবার হাজার লিটার জ্বালানি তেল। এতে স্পষ্ট হয়, সমস্যাটি কেবল ঘাটতির নয়; বরং ঘাটতির আড়ালে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য বাণিজ্যচক্র।

জেলায় জেলায় একই চিত্র: সংকট না কৃত্রিম মজুত?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি বিস্তৃত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক মুদিদোকানির বাড়ি থেকে প্রায় ৩৭০ লিটার পেট্রল জব্দ করা হয়েছে, যা অতিরিক্ত দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় প্রায় ৮০০ লিটার পেট্রল অবৈধভাবে মজুত ও লাইসেন্স ছাড়া বিক্রির দায়ে এক ব্যবসায়ীকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে দিনাজপুরের বিরলেও, যেখানে রাতের আঁধারে জ্বালানি তেল বিক্রির ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জামালপুরে তেল না পেয়ে ক্ষুব্ধ মোটরসাইকেল চালকেরা সড়ক অবরোধ করলে পরে একটি দোকানেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ লিটার তেলের মজুত পাওয়া যায়; কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে সেখানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কুড়িগ্রামের রৌমারীতেও গোয়ালঘরে ড্রামভর্তি পেট্রল মজুতের ঘটনা ধরা পড়ে। এসব উদাহরণ আলাদা আলাদা নয়, বরং একটি ছড়িয়ে পড়া প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ।

অভিযান হচ্ছে, কিন্তু থামছে না কেন?
বাস্তবতা হলো, যেখানে তেল মজুত আছে, সেখানে মানুষ তা পাচ্ছে না। এটি কেবল বাজার ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়; বরং একটি পরিকল্পিত অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। মজুত করে সরবরাহ সীমিত করা, বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা এবং লাইসেন্সবিহীন বাণিজ্য, সব মিলিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন, অন্যদিকে একটি গোষ্ঠী অস্বাভাবিক মুনাফা করছে।

সিন্ডিকেটের ছায়া কি অস্বীকার করা যায়?
প্রশ্ন উঠছে, এসব কি শুধুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের চিত্র বারবার সামনে আসে, তখন সেটিকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ থাকে না। বরং ধারণা জোরালো হয়, এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। এই মজুতদাররা এতটা সাহস পায় কোথা থেকে। তারা কি কেবল সুযোগ নিচ্ছে, নাকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাই তাদের শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে।

অভিযান হচ্ছে, কিন্তু থামছে না কেন?
প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, জরিমানা করছে, কারাদণ্ড দিচ্ছে এবং জব্দ করা তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগও নিচ্ছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এগুলো কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে। কারণ এক এলাকায় অভিযান শেষ হতে না হতেই অন্য এলাকায় একই ধরনের ঘটনা সামনে আসছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যার শিকড় আরও গভীরে এবং তা আরও বিস্তৃত।

ভোগান্তির ভার সাধারণ মানুষের কাঁধে কেন?
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মোটরসাইকেল চালক, কৃষক, পরিবহন শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিদিনই সংকটের চাপ বহন করছেন। জামালপুরে সড়ক অবরোধের ঘটনা শুধু ক্ষোভ নয়; এটি সাধারণ মানুষের অসহায়তারই প্রতিফলন।

আইন আছে, প্রয়োগ কতটা কার্যকর?
আইন অনুযায়ী অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে জ্বালানি তেল বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতায় আইনের প্রয়োগ কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা যেত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হতো, তাহলে কি এত সহজে হাজার লিটার তেল মজুত করা সম্ভব হতো।

সংকট নয়, প্রয়োজন ব্যবস্থার শুদ্ধি
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি একটি নৈতিক সংকটও। যেখানে কিছু মানুষ সংকট তৈরি করে লাভবান হয় এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে, সেখানে কেবল অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শুদ্ধি, কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর শাস্তির সমন্বিত প্রয়োগ। অন্যথায় এই সংকট বারবার ফিরে আসবে, নতুন নামে ও নতুন কৌশলে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়, তেলের সংকট, নাকি সংকটকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক সুপরিকল্পিত ব্যবসা।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক