২৬ মার্চ ২০২৬, ১৯:১৭

বাংলাদেশ, মায়ের কোলে বেঁচে ফেরা যেখানে অনিশ্চিত

মুহম্মদ সজীব প্রধান  © টিডিসি সম্পাদিত

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। আপনি সকালে ঘর থেকে বের হলেন। আপনার গন্তব্য অফিস, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা আত্মীয়ের বাড়ি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার মা বললেন, সাবধানে যেও বাবা। এই সাবধানে যেও কথাটা বাংলাদেশে এখন শুধু একটি শুভ কামনা  নয়, বরং এক ধরনের অনিশ্চয়তার স্বীকৃতি। কারণ এখানে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না সে আবার ঘরে ফিরে আসবে, নাকি গণমাধ্যমের খবর হয়ে আসবে! বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্বাভাবিক মৃত্যু যেন বিরল, আর অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রতিদিনের ঘটনা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোই তার নির্মম প্রমাণ। 

এবার ঈদ যাত্রায় মাত্র ৮ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৬ শতাধিক মানুষ। পদ্মা নদীতে ফেরিতে ওঠার সময় বাস ডুবি, কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষ এবং সদরঘাটে লঞ্চ দূর্ঘটনার দৃশ্য অত্যন্ত লোমহর্ষক। এছাড়াও ঈদ যাত্রায় সারা দেশে সংঘটিত অন্যান্য দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দৃশ্যপট নয়; বরং একটি বৃহত্তর সংকটের অংশ। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী এখন বাস্তবতা এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রতি বছর ৯ হাজারের কাছাকাছি মানুষ মারা যাচ্ছে শুধু সড়ক দুর্ঘটনায়। জলে কুমিড়, ডাঙায় বাঘ বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন পরিস্থিতিতে। স্থল পথে দুর্ঘটনা এড়াতে অনেকে নৌ পথে যাতায়াত করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নৌপথও নিরাপদ নয়। 

অর্থাৎ বাংলাদেশে এখন এমন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে স্থল, রেল, জল সব পথেই মৃত্যু ওত পেতে আছে। এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশে ভবন ধস ও অগ্নিকাণ্ডও ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, পুরান ঢাকার চকবাজার ট্র্যাজেডি, বেইলি রোডে আগুন, কিংবা বিভিন্ন গার্মেন্টস ও কারখানায় অগ্নিকাণ্ড প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিরাপত্তাহীনতা শুধু পথে নয়, চার দেয়ালের ভেতরেও। চারপাশের এসব করুণ মৃত্যু দেখলে মনে হয়, এই ভূ-খণ্ড এমন এক মৃত্যুপুরী যেখানে ঘরে আপন মানুষের সামনে থেকে আত্মা বের করতে মৃত্যুদেবতার বড্ড মায়া হয়! তাই তিনি পথে, ঘাটে, মাঠে ও জলে তার দায়িত্ব পালন করেন।

যদি চিন্তা করি তাহলে দেখবো যে, এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এগুলো মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দাহ্য রাসায়নিকের অবাধ মজুত, ফায়ার সেফটির অভাব এসব কারণে আগুন লাগলে তা মুহূর্তেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হলো, এগুলো কি সত্যিই দুর্ঘটনা? শতভাগ সচেতন থাকা সত্ত্বেও এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও যেটা প্রতিরোধ করা যায়নি সেটা দুর্ঘটনা। 

অন্যদিকে যখন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটে, তখন তা আর দুর্ঘটনা থাকে না, তা হয়ে যায় অসচেতনতা ও অব্যবস্থাপনার ফল। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অদক্ষ ও নেশাগ্রস্ত চালক, লাইসেন্স বাণিজ্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। একইভাবে রেলপথে গেটম্যানের অনুপস্থিতি, সিগন্যালিংয়ের ত্রুটি এবং অবৈধ লেভেল ক্রসিং বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, পুরোনো ও অনিরাপদ লঞ্চ এবং দুর্বল তদারকি দুর্ঘটনার মূল কারণ। আর অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধি না মানা, অবৈধ স্থাপনা এবং তদারকির অভাবই প্রধান দায়ী। উপর্যুক্ত কারণগুলো ‘দুধখাওয়া শিশু’ পর্যন্ত জানে! কিন্তু মুশকিল হলো, আমরা এগুলো সমাধান করা নিয়ে সচেষ্ট না। 

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর আমরা শোক জানাই, তদন্ত কমিটি গঠন করি, কিছুদিন আলোচনা হয় এবং তারপর সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে। কিন্তু এই চক্র ভাঙা জরুরি। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। তাই এখানে যেকোনো সমস্যা সমাধানে সরকার ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টা অপরিহার্য। এটি কেবল তাত্ত্বিক কথা নয়, বাস্তবতার কঠিন দাবি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ঠিক এই জায়গাতেই। 

সরকার ও জনগণের মধ্যে যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সমন্বয় ও দায়িত্ববোধ থাকার কথা, সেখানে রয়েছে একটি স্পষ্ট ফাঁটল; আর এই ফাঁটলই বহু সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল করে তুলছে। দুর্ঘটনার মতো ভয়াবহ ও জীবনঘাতী সমস্যার ক্ষেত্রে এই সমন্বয়ের অভাব আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে।

কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা সহজভাবে বুঝা যাবে। সরকার ট্রাফিক আইন প্রণয়ন করেছে, হেলমেট বাধ্যতামূলক, সিটবেল্ট ব্যবহার, নির্দিষ্ট গতিসীমা, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক মোটরসাইকেল চালক হেলমেট পরেন না, বাসচালকরা অতিরিক্ত গতি তোলেন, পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও রাস্তা পার হন। আবার উল্টো চিত্রও আছে। কখনো ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্বে অবহেলা করে, কিংবা আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয় না। ফলে আইন থাকলেও কার্যকারিতা কমে যায়, আর দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকে। 

নৌপথে, প্রতি বছর ঈদ বা উৎসবের সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। সরকার নির্দিষ্ট যাত্রীসংখ্যা নির্ধারণ করে দিলেও মালিকপক্ষ বেশি লাভের আশায় নিয়ম ভাঙে, আর যাত্রীরাও ঝুঁকি জেনেও অতিরিক্ত ভিড়ে ওঠে। এখানে যেমন তদারকির ঘাটতি আছে, তেমনি জনগণের অসচেতনতাও স্পষ্ট। রেলপথও এর ব্যতিক্রম নয়। রেলক্রসিংয়ে গেট থাকা সত্ত্বেও অনেক পথচারী বা যানবাহন চালক তাড়াহুড়ো করে ঝুঁকি নিয়ে পার হতে যান। 

অন্যদিকে, অনেক জায়গায় গেটম্যান অনুপস্থিত থাকে বা সিগন্যালিং ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকে। ফলে উভয় পক্ষের ব্যর্থতা মিলেই দুর্ঘটনা ঘটায়। একইভাবে বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড বা ভবনধসের ঘটনায় প্রায়ই দেখা যায় নিরাপত্তা বিধি মানা হয়নি। সরকার নিয়ম করে দিলেও অনেক মালিক তা অনুসরণ করেন না, আর শ্রমিকরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। আবার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারির ঘাটতিও বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

প্রতিটি দূর্ঘটনা বিশ্লেষণ করলে একটা সাধারণ কারণ পাওয়া যাবে, সেটা হলো এই সমন্বয়হীনতা। তাই দূর্ঘটনা কমাতে প্রথম কাজ হবে এই সমন্বয়হীনতা দূর করা। মনে রাখতে হবে, একটি জীবন হারানো মানে আদমশুমারি থেকে শুধু একটি সংখ্যা কমে যাওয়া নয় বরং একটি পরিবার ভেঙে যাওয়া, একটি স্বপ্ন থেমে যাওয়া এবং মাতৃভূমির একটি অপার সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়া। আমরা যদি সত্যিই এই দুর্ঘটনার এই নিষ্ঠুর চক্র ভাঙতে চাই, তাহলে শোককে অভ্যাসে পরিণত না করে পরিবর্তনকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। 

প্রতিটি দুর্ঘটনার পর ‘ইন্নালিল্লাহ’ বলে থেমে গেলে চলবে না; বরং প্রশ্ন করতে হবে—কেন ঘটল, কীভাবে থামানো যায়, এবং আমি নিজে কী করছি তা রোধ করতে? একটি রাষ্ট্র তখনই নিরাপদ হয়, যখন তার জনগণ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘সাবধানে যেও’ শুনে ভয় পায় না, বরং নিশ্চিন্ত থাকে ফিরে আসার ব্যাপারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়া, যেখানে মায়ের এই কথাটি শুধুই ভালোবাসার প্রকাশ হবে, আশঙ্কার নয়।

লেখক: কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম