ভিনদেশের ঈদ আনন্দ
ঈদ মানেই খুশি। সারাবিশ্বে নানা দেশে নানা কায়দায় মানুষ ঈদ উদযাপন করে থাকে। তবে ঈদ আনন্দের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ হল পরিবার। পৃথিবীর সব দেশেই মানুষ কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে যায় নিজের চিরচেনা বাড়িতে, প্রিয় পরিবারের কাছে। কিন্তু প্রবাসীদের ঈদ কাটে ভিনদেশে, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব থেকে হাজারো মাইল দূরে। তাইতো প্রবাসের বা বিদেশের ঈদ একটু ভিন্ন। আমি এ নিয়ে পঞ্চম ঈদ দেশের বাহিরে কাটালাম। নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে কিছু কথা লিখব।
আমাদের দেশে ঈদের আমেজ শুরু হয় মূলত ঈদের কেনাকাটার মাধ্যমে। বিদেশে এই আমেজটুকু তেমন থাকে না। কারণ, এখানের ঈদের পোশাক এদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্য অনুযায়ী তৈরি হয়, যা আমাদের ততটা আকর্ষিত করে না। এখানকার মার্কেটগুলোতে নেই উপচে পড়া ভীড়। মানুষদের মধ্যে নেই ঘরে ফেরার তাড়া। এখানেও মানুষ ঘরে ফিরে, স্কুল-কলেজ ছুটি হয় কিন্তু সীমিত সময়ের জন্য। ঈদের দুদিন আগে ছুটি শুরু হয়ে ঈদের দুদিন পর শেষ হয়ে যায়।
সব দেশে অবশ্য একরকম না। মুসলিম প্রধান দেশগুলো ও অমুসলিম দেশগুলোতে এর তারতম্য হয়। যাইহোক, আমাদের নতুন পোশাক পরে ঈদের জামায়াতে অংশ নিতে ইচ্ছে করে কিন্তু বেশিরভাগ প্রবাসী এটি নিয়ে এত গুরুত্ব দেন না। তবুও সকলে পছন্দমত ও মানানসই পোষাকটিই বেছে নেন। ছেলেদের ক্ষেত্রে ঈদের নামাজের জন্য সবচে উপযোগী ও ভাল লাগার পোষাক হল পাঞ্জাবি। সকলের নিকটই পাঞ্জাবি থাকে, অথবা কারো মাধ্যমে দেশ থেকে আনার ব্যবস্থা করেন।
এখানে আমরা ঈদের জামাতের সময় হলে একা একা অথবা সহপাঠী বা সহকর্মীসহ ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে বের হই। প্রতি কদমে দেশকে মিস করা হয়। ইমাম সাহেবের চিরচেনা খুতবা থেকে নামাজ শেষে বাবা-ভাই, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে সকলের সাথে কোলাকুলির স্মৃতি মনে পরে বারবার।
এ তো গেল একটি অনুষঙ্গ। প্রবাসে ঈদ দেশের ঈদের সঙ্গে সবচে বেশি পার্থক্য ও ব্যতিক্রম হল পরিবারের অনুপস্থিতি! নামাজ শেষে আমরা যেভাবে দলবেঁধে বাড়ির মুরুব্বি হতে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশি, আত্নীয়-স্বজন সকলকে সালাম ও কুশল বিনিময়ের জন্য এদিক-ওদিক যাই, সেই সুযোগ এখানে নাই। তাইতো, প্রবাসীর ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে হয় অনলাইনে। আমরা নামাজ শেষে পরিবারকে কল করি, ভিডিও বার্তায় আনন্দ বিনিময়, সকলের খোঁজ খবর নেওয়া ও বাচ্চাদের উল্লাস দেখে আনন্দ ভাগাভাগির চেষ্টা করি। অনেক সময় কাটাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ঈদের ছবি শেয়ার ও বন্ধুবান্ধবের ছবিতে প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যের মাধ্যমে।
সর্বশেষ, প্রবাসীর ঈদ আনন্দে সবচে বেশি ইমপ্যাক্ট পড়ে দেশের খাবার-দাবার ও মায়ের হাতের অমৃত মিস করার মাধ্যমে। ঈদের সকালের সেমাই, পিঠা-পায়েস ও অসংখ্য খাবারের তাড়না আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে এখানেও ছোটখাটো উদ্যোগে বন্ধুবান্ধব বা বাংলাদেশি কমিউনিটি মিলে হালকা সেমাই-চিনির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু, মায়ের হাতের অমৃতের তুলনা কি কিছুতে হয়!
সর্বোপরি, প্রবাসে ঈদ শুধুই বেদনাবিধুর নয়। দেশে দেশে বাংলাদেশি প্রবাসী; কেউবা কর্মরত, কেউবা শিক্ষার্থী কেউ অন্য কোন উদ্দেশ্যে, যারাই মাতৃভূমি থেকে দূরে ঈদ করেন সকলের প্রচেষ্টা থাকে মুসলিম বিশ্বের এই সর্ববৃহৎ ঈদ উৎসবকে নিজেদের মত করে উদযাপন করতে। তাইতো, আমরা ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করি এক প্রবাসীর সঙ্গে অপরের, একত্রে ঈদের নামাজে অংশ নেওয়া হতে, একত্রে খাবারের আয়োজন ও আড্ডা ও ঘুরাঘুরির মাধ্যমে। এভাবেই পরিবার ছাড়াও ঈদ হয়ে উঠে অর্থবহ ও সীমাহীন আনন্দের।
আলী আকবর গাজী
শিক্ষার্থী
আল-বুখারী ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এ.আই.ইউ)
মালেশিয়া।