সেমাইয়ের গন্ধ নেই, আছে স্মৃতির ভার—ঈদে প্রবাসীর নিঃশব্দ গল্প
দেশ ও পরিবার ছেড়ে একা ঈদ উদযাপন করা যে কতটা বেদনার, তা কেবল প্রবাসীরাই উপলব্ধি করতে পারেন। ইউরোপে ঈদ পালন যেন সেই কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেশের বাইরে এই রমজানের ঈদ আমার তৃতীয় ঈদ। পরিবারের সান্নিধ্য ছাড়া এর আগে দুটি ঈদ কাটিয়েছি ইউরোপের মাটিতে। একা ঈদ পালন আমার মনে মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়, যা দেশে ঈদ উদযাপনের সময় কখনোই অনুভব করিনি।
প্রথম অনুভূতিটি তীব্র বিষাদের। দেশের ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই পরিবারের মধ্যে যে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, এখানে তা একেবারেই অনুপস্থিত। ঈদের সকালে বাবা-চাচাদের সঙ্গে ঈদগাহে যাওয়া, নামাজ শেষে এলাকার কেন্দ্রীয় কবরস্থানে জিয়ারত করা এবং মায়ের হাতের তৈরি সেমাই ও চালের রুটি খাওয়া, বড়দের থেকে সালামি আদায় করা, বন্ধুদের সাথে পাশের এলাকায় ঘুরতে যাওয়া।স্মৃতিগুলো আমাকে ভীষণভাবে আবেগাপ্লুত করে তোলে। ইউরোপে এসবের কিছুই সম্ভব নয়, তাই মন বিষাদে ভরে ওঠে।
ইউরোপে প্রবাসী হওয়ার কারণে ঈদের জন্য বিশেষ কোনো ছুটি পাওয়া যায় না। ফলে অনেক প্রবাসী মুসলমান ঈদের নামাজও ঠিকমতো আদায় করতে পারেন না, যা সত্যিই দুঃখজনক।
তবে, এর পাশাপাশি সুখের অনুভূতিও কাজ করে। যদিও দেশ ও পরিবার ছেড়ে ঈদ করতে খারাপ লাগে, তবুও যখন দেখি আমার পাঠানো রেমিট্যান্সে পরিবারের সদস্যরা আনন্দে ঈদ উদযাপন করছে, তখন মন খুশিতে ভরে ওঠে। সারা মাস পরিশ্রম করে অর্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।
মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে প্রবাসীরা ঈদের আংশিক আমেজ উপভোগ করতে পারলেও, ইউরোপে তা সম্ভব নয়। এখানে ঈদের জন্য কোনো ছুটি না থাকায় কাজের ব্যস্ততায় ঈদের কেনাকাটার সময়টুকুও পাওয়া যায় না।
ইউরোপে ঈদের আনন্দ বলতে বন্ধুদের সঙ্গে একত্র হয়ে রান্না করা এবং খাওয়া-দাওয়া শেষে আড্ডা দেওয়াটুকুই।
রান্নার মেনুতে গরুর মাংস, পোলাও, চিকেন রোস্ট, বিরিয়ানি বা তেহারির মতো মুখরোচক খাবার প্রাধান্য পায়। মিষ্টি খাবারের মধ্যে থাকে সেমাই, পায়েস, দই, হালুয়া ও ফিরনি।
ইউরোপে পরিবার নিয়ে বসবাস করা প্রবাসীরা ঈদের দিন পরিবারের সঙ্গ পেলেও, আমার মতো ব্যাচেলরদের সেই সুযোগটুকুও হয় না। তবে, একই এলাকায় বসবাসকারী পরিচিত কিছু প্রবাসী পরিবার যখন ব্যাচেলরদের ঈদের দাওয়াতে আমন্ত্রণ জানায়, তখন মন কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে।
ইউরোপে ঈদ একদিকে যেমন প্রিয়জনদের অনুপস্থিতির বেদনা বয়ে আনে, অন্যদিকে পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করে। সেই সাথে ইউরোপের বিভিন্ন শহরের মসজিদগুলোতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের দিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও খাবার প্রদর্শন করে।
লেখক: গেইট গ্রুপ স্টার ফোড এয়ারলাইন্স নামক খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
রোম, ইতালী