১৪ মার্চ ২০২৬, ১৬:৫২

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হঠাৎ ‘সনদবিহীন সভাপতি’ নিয়োগের ভাবনা কেন?

রেজাউল ইসলাম  © টিডিসি সম্পাদিত

ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সমস্ত অলিগলি, অফলাইন-অনলাইন, হাঁটে-মাঠে-ঘাটে প্রায় সব জায়গায় একই আলোচনা ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে এখন আর লাগবে না কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা!’ বিষয়টির সূত্রপাত ঘটেছে গত ১০ই মার্চে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি সভা থেকে, যেখানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব আ ন ম এহছানুল হক মিলন সশরীরে উপস্থিত ছিলেন! 

মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিতে উক্ত সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচনসংক্রান্ত এমন বিস্ময়কর প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি যদিও এখন পর্যন্ত আলাপ-আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে, তবুও অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায়, এটি স্বভাবতই জনসাধারণের মানসপটে একটি শক্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

সার্থক আলোচনার জন্য এখানে উল্লেখ করে রাখা ভালো যে ২০২৪ সনের মে মাসে নিম্ন-মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা ২০০৯ সংশোধন করে সভাপতি হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে এইচএসসি বা সমমানের (উচ্চমাধ্যমিক) ডিগ্রি করা হয়েছিল। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সনের আগস্ট মাসে সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা আরও বাড়ানো হয়। সেবার গভর্নিং বডির সভাপতি হওয়ার জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা চার বছর মেয়াদি স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। আর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হয়।

নানাবিধ কাজের ধরন ও পদের সৌন্দর্য, মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মতো বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার জায়গায় আপোষ করার কোনো সুযোগ নেই।

এখন ২০২৬ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে বিদ্যমান এই প্রবিধানমালায় পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের যুক্তি হচ্ছে যে সে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে সৎ ব্যক্তিদের বসাতে চায় এবং এর জন্য যদি ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতার সাথেও আপোষ করতে হয়, তবুও সে তা করতে রাজি। কিন্তু নানাবিধ কাজের ধরন ও পদের সৌন্দর্য, মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মতো বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতার জায়গায় আপোষ করার কোনো সুযোগ নেই। কেন সেই সুযোগ নেই, সেটাই এই লেখার মূল আলোচ্য বিষয়।

প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি উক্ত প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ। এটি অধ্যক্ষ এবং প্রধান শিক্ষকেরও উপরের পদ। বস্তুত, সভাপতিই উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান অধিকর্তা। তিনিই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। তার মাধ্যমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক-সচেতনমহলের মধ্যে একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে— যা একটি যুগোপযোগী, টেকসই ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বৃহত্তর জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বলয়ের প্রধান নেতাই যদি শিক্ষা-দীক্ষায়, চিন্তা-চেতনায়, চলন-বলনে অন্য সদস্যদের কাছে আদর্শ না হন, তাহলে সেই বৃহত্তর জাতীয় আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য বলয়ের প্রধান নেতার প্রতি অন্য সদস্যদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আনুগত্য আসবে কোথা থেকে?

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই একজন অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষক এবং তার নেতৃত্বে শিক্ষকদের একটি দক্ষ, যোগ্য ও চটপটে দল থাকার পরেও কেন সেখানে একজন সভাপতির নেতৃত্বে একটি গভর্নিং বডি কিংবা ম্যানেজিং কমিটির প্রয়োজন হয়, তা কিন্তু একটা গভীর ভাবনার বিষয়। এটা যদি আমরা না বুঝি, তাহলে একজন সভাপতির যোগ্যতা প্রকৃতপক্ষে কেমন হওয়া উচিত সেটাও আমরা বুঝব না। একজন দক্ষ ও যোগ্য সভাপতির নেতৃত্বে পরিচালিত গভর্নিং বডি কিংবা ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষকের চৌকস টিমের বিপরীতে সমান্তরালে ক্ষমতার চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের কাজ করে থাকেন। 

একজন অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষক একক ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে যাতে স্বেচ্ছাচারী না হয়ে উঠতে পারেন এবং সরকারি-বেসরকারি তহবিল তছরুপ করতে না পারেন -সেটাই দেখভালের দায়িত্ব পালন করে সভাপতির নেতৃত্বে পরিচালিত এই গভর্নিং বডি কিংবা ম্যানেজিং কমিটি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন উচ্চশিক্ষিত অধ্যক্ষ কিংবা প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে একজন অক্ষরজ্ঞানহীন কিংবা স্বল্পশিক্ষিত সভাপতি ক্ষমতার 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' এর মতো এমন দুঃসাহসিক কাজ সম্পাদনে কুলিয়ে উঠতে পারবেন?

তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক কর্মপরিকল্পনা, শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের ছুটি মঞ্জুর, দীর্ঘদিনের ইচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি, অসদাচরণ, দায়িত্বপালনে অবহেলা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য চাকরি থেকে অব্যাহতি কিংবা বরখাস্তের প্রস্তাব প্রেরণ, আর্থিক খাতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও তদারকি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকরী যোগাযোগ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ- প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পর্কিত বিধিবিধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করে সেই মোতাবেক কার্য সম্পাদনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতিকে অতি অবশ্যই উচ্চশিক্ষিত হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে তিনি যদি এ সকল জরুরি বিষয় আত্মস্থ করতে না পারেন, তাহলে সেখানে একটা বিরাট শূন্যতা তৈরি হবে— যার অন্যায্য সুযোগ গ্রহণ করতে পারে তৃতীয় কোনো পক্ষ। আর নিঃসন্দেহে একজন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন সভাপতিই পারেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাসংক্রান্ত এই জরুরি বিষয়গুলো অতি দক্ষতার সাথে আত্মস্থ করতে।

চতুর্থত, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানেই অধিক ভালো ব্যক্তি সন্ধানের অভিপ্রায়ে শিক্ষাগত যোগ্যতায় শিথিলতা প্রদর্শন করা হয়, সেখানেই সেই সুযোগ অন্যায্যভাবে গ্রহণ করতে চান স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও শুধু স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি হওয়ার বদৌলতে একপ্রকার গায়ের জোরেই অনেকে রাতারাতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি বনে যান! মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জনাব ববি হাজ্জাজের যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যার পরে হয়ত ধরে নেওয়া যায় যে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি নির্বাচনে সরকার শিক্ষাগত যোগ্যতার উপরে ব্যক্তির ভালো দিক ও গুণাবলিকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে প্রস্তাবটি হয়ত একেবারে খারাপ নয়। 

কারণ, স্বল্পশিক্ষিত কিংবা একেবারে নিরক্ষর ব্যক্তিদের মাঝেও অনেক শিক্ষানুরাগী থাকতে পারেন, থাকতে পারেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমূল বদলে দেওয়ার মতো কোনো মহৎ প্রাণ। কিন্তু, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই সংখ্যাটি হয়ত নিতান্তই কম। এখন কথা হচ্ছে, স্বল্পশিক্ষিত ও নিরক্ষর ব্যক্তিদের মধ্য থেকে গুটিকতক শিক্ষানুরাগীকে শিক্ষার উন্নয়নের মতো মহৎ কাজে সুযোগ দিতে গিয়ে যদি ব্যাপকহারে অযোগ্য ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তি খাটিয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢুকে সেগুলো জিম্মি করে ফেলে, তাহলে তার দায় কে নেবে? 

শিক্ষা একটি দেশের দর্পণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তার ধারক। একটি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভিতর থেকে ভেঙে পড়লে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সেদেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি একেবারে থেমে যায়। তাই আধুনিক বিশ্বের চোখে সে আর সেভাবে ধরা পড়ে না। তাই একটি দেশকে বিশ্বের দরবারে কার্যকর উপায়ে তুলে ধরতে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই উন্নয়নের বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল দক্ষ, যোগ্য ও শিক্ষিত সভাপতি নিয়োগের মাধ্যমেই সেই উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব।