শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে অশিক্ষিত? ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক এক সিদ্ধান্ত
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সিদ্ধান্ত জনমনে বিস্ময় ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সিদ্ধান্তটি হলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য আর কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি শিক্ষাগতভাবে অযোগ্য হলেও তিনি একটি স্কুল বা কলেজের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পদে বসতে পারবেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু বিতর্কিত নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে। এখানে শুধু পাঠদানই হয় না; এখানে গড়ে ওঠে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ এবং নেতৃত্বের চেতনা। তাই যে ব্যক্তি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবেন, তার মধ্যে অন্তত ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা কি অযৌক্তিক কোনো দাবি?
আরও একটি বাস্তবতা আমাদের সামনে আছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়মই বহাল ছিল গভর্ণিং বডির সভাপতির জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই দীর্ঘ সময়ে আমরা বাস্তবে কী দেখেছি?
আমরা কি দেখিনি টাকার বিনিময়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ? আমরা কি দেখিনি দলবাজি, প্রভাব খাটানো, টেন্ডারবাজি? আমরা কি দেখিনি স্কুল বা কলেজের তহবিল তছরুপ, প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার? দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে এমন কোনো অনৈতিক কাজ নেই যা কিছু অযোগ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি করেনি। যদি বাস্তব অভিজ্ঞতা এত নেতিবাচক হয়, তাহলে সেই একই ব্যবস্থাকে আবারও শক্তিশালী করার যুক্তি কোথায়?
যখন একজন স্কুল বা কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হবেন, তখন তাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেমন শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা কার্যক্রমের মান বজায় রাখা, প্রশাসনিক সমস্যা সমাধান, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন। এসব বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে অন্তত মৌলিক শিক্ষা ও জ্ঞান থাকা জরুরি। যদি সেই নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি শিক্ষাগতভাবে অপ্রস্তুত হন, তবে তিনি কীভাবে শিক্ষাসংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো বুঝবেন?
অনেকে যুক্তি দেন, অনেক দাতা ব্যক্তি আছেন যারা স্কুল বা কলেজের জন্য জমি বা অর্থ দান করেন। তাদের অবদান অবশ্যই সম্মানের দাবি রাখে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ কেউ যদি একটি প্রতিষ্ঠানের জমি দান করেন, তাহলে তিনি দাতা সদস্য হিসেবে গভর্ণিং বডিতে থাকতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তাকে অবশ্যই সভাপতি করতে হবে এই যুক্তি কতটা যৌক্তিক? দানের বিনিময়ে নেতৃত্ব দেওয়া কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সঠিক নীতি হতে পারে? যদি তাই হয়, তাহলে কি নেতৃত্বের মাপকাঠি হবে যোগ্যতা ও জ্ঞান, নাকি অর্থ ও প্রভাব?
একটি প্রশ্ন এখানে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে যে দেশে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্যও স্নাতক ডিগ্রি প্রয়োজন, সেখানে সেই শিক্ষকের ওপর কর্তৃত্ব করবেন এমন একজন ব্যক্তির জন্য কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হবে না কেন? এই দ্বৈত মানদণ্ড কি শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে না?
শিক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক ক্ষেত্র। একজন অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত ব্যক্তি হয়ত সমাজে প্রভাবশালী হতে পারেন, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বোঝা তার জন্য কঠিন হতে পারে। ফলে বাস্তবে দেখা যেতে পারে, সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষাগত যুক্তির ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে জ্ঞানের কেন্দ্র থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে প্রায়ই একটি অভিযোগ শোনা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম বাড়ছে। যদি সভাপতির পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে এই পদটি সহজেই প্রভাবশালী কিন্তু শিক্ষাগতভাবে অযোগ্য ব্যক্তিদের দখলে চলে যেতে পারে। তখন প্রশ্ন উঠবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি জ্ঞানচর্চার জায়গা থাকবে, নাকি স্থানীয় ক্ষমতার রাজনীতির একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে?
আরও একটি বাস্তবতা আমাদের সামনে আছে। দেশের অনেক শিক্ষকই সীমিত বেতনে কঠোর পরিশ্রম করে শিক্ষার্থীদের মানুষ করে তোলেন। কিন্তু যদি সেই শিক্ষকদের ওপর কর্তৃত্বকারী ব্যক্তি শিক্ষাগতভাবে তাদের চেয়েও পিছিয়ে থাকেন, তাহলে তা কি শিক্ষকদের সম্মান ও মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না? একজন শিক্ষক কি তখন নিজেকে যথাযথভাবে মূল্যায়িত মনে করবেন?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা কোনো বিষয় না হয়, তাহলে কি আগামী দিনে অন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য হবে? উদাহরণস্বরূপ, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান হতে কি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো ধারণা প্রয়োজন হবে না? অথবা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বে কি শিক্ষার কোনো যোগ্যতা দরকার হবে না?
এই প্রশ্নগুলো শুধু তাত্ত্বিক নয়; এগুলো একটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ শিক্ষার মান কমে গেলে তার প্রভাব শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে পুরো সমাজ ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা মানে দুর্বল মানবসম্পদ, আর দুর্বল মানবসম্পদ মানে একটি দেশের উন্নয়নের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়া।
অবশ্যই সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা হয়ত উচ্চশিক্ষিত নন, কিন্তু অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। তাদের অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই বাস্তবতা স্বীকার করেও বলা যায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী পদে অন্তত ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা একটি যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয় শর্ত। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব এমন কারো হাতে থাকা উচিত, যিনি শিক্ষার মূল্য বোঝেন, জ্ঞানের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।
সুতরাং প্রশ্নটি আজ আমাদের সবার সামনে আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে নেতৃত্বের জন্য শিক্ষার কোনো গুরুত্ব নেই? নাকি আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষা পরিচালনা করবেন শিক্ষার মূল্য বোঝেন এমন মানুষ?
এই সিদ্ধান্ত হয়ত প্রশাসনিকভাবে সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে গভীর হতে পারে। তাই সময় এসেছে নিজেদের কাছে সৎভাবে প্রশ্ন করার আমরা কি এমন এক ভবিষ্যৎ তৈরি করছি, যেখানে জ্ঞানের চেয়ে প্রভাব, যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতাই শিক্ষার ওপর কর্তৃত্ব করবে? সময় এসেছে বিষয়টি নতুন করে ভাবার। শিক্ষার উন্নয়ন এবং প্রগতি নিশ্চিত করার জন্য সিদ্ধান্ত নিন রাজনীতিক নেতাদের মনবসনা পূরণের জন্য নয়, বরং দেশের শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষ্যে। কারণ শিক্ষা নিয়ে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমানের জন্য নয়; তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্যও নির্ধারণ করে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।