শিক্ষকের রোষানলে এক বিষয়ে ৫ বার ফেইল, অভিমানে জীবনটাই দিয়ে দিলেন নওশিন
এক-দুই নয়, একটি বিষয়ে পাঁচবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে অর্পিতা নওশিনকে। কিন্তু উত্তীর্ণ হওয়ার মত নম্বর মেলেনি শিক্ষকের পক্ষ থেকে। আবারও ফরম ফিলআপের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বাড়ি থেকে টাকা নিয়েছিলেন নওশিন। কিন্তু এরই মধ্যে অভিমানে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
আজ শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় হোস্টেলের নিজ কক্ষ থেকে তাকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয় বন্ধুরা। কিন্তু ততক্ষণে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন নওশিন। বন্ধুরা জানিয়েছেন, নওশিন মানসিক যন্ত্রণা ভুলতে ১০৯ পিস এভেন্ডার ৪০ মিলিগ্রাম ওষুধ সেবন করেছিলেন।
অর্পিতা নওশিন কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি খুলনা সদরে। এক ভাই-এক বোনের মধ্যে অর্পিতা ছোট। খুলনার সরকারি করোনেশন গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি ও খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি দিয়েছিলেন নওশিন। এরপর সাদা এপ্রোনের মায়ায় পড়ে ভর্তি হয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিতে। কিন্তু চিকিৎসক না হয়েই বাড়ি ফিরছে নওশিনের নিথর দেহ। ইতোমধ্যে খুলনার বাড়ি থেকে লাশ নিতে রওনা দিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
নাম প্রকাশ হলে শিক্ষকের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থাকায় উহ্য রাখার অনুরোধ জানিয়ে অর্পিতা নওশিনের বন্ধুরা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, প্রথম বর্ষেই কলেজের এনাটমি বিভাগের প্রধান ডা. মনিরা জহিরের রোষানলে পড়েন নওশিন। এরপর প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় সকল বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও এনাটমি বিষয়ে অকৃতকার্য হতে হয় তাকে। এরপর গত তিন বছরে আরও ৪ বার এনাটমির পরীক্ষা দিয়েছেন নওশিন। কিন্তু প্রত্যেকবারই পরীক্ষায় ফেইল এসেছে। যদিও কী কারণে এই রোষানলে পড়তে হয়েছে তার সুস্পষ্ট কারণ জানেন না কেউ। তবে বলছেন, মনিরা শারমিন প্রথম বর্ষে থাকতে প্রকাশ্যেই অর্পিতা নওশিনকে ফেইল করার হুমকি দিয়েছিলেন।
তারা বলছেন, গত ৮ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ব্যাচের তৃতীয় প্রফের ফল প্রকাশ করে। ২০২১-২২ সেশনের সবাই এখন পঞ্চম বর্ষে পড়ছেন। কিন্তু অর্পিতা নওশিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি এখনও প্রথম প্রফ পরীক্ষাই উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
অর্পিতা নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান খুলনা থেকে মুঠোফোনে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমার বোনের এরকম কোনো মানসিকতা নাই যে সে আত্মহত্যা করবে। মূলত কলেজের মানসিক চাপ থেকে এটা করেছে। নওশিন বারবার এনাটমি বিভাগের মনিরা ম্যাডামের কথা বলত। একদম ফার্স্ট ইয়ার থেকে আমার বোনকে মানসিক নিপীড়ন করেছেন তিনি। সবাইকে পাস করে দেয়, আমার বোন প্রত্যেকটা সাবজেক্ট পাস করে, কিন্তু ওই একটা সাবজেক্টে আটকে রাখে। আমি বলেছি যে আমার বোনের সমস্যা কোথায় বলেন, তাও বলবে না। প্রেসার দিতে দিতে আমার বোনকে মেন্টালি নিপীড়ন যারা করেছে, তারাই এই মার্ডার করেছে।
শাহরিয়ার আরমান বলেন, গতকালও ওর সাথে আমি কথা বলেছি। ফর্ম ফিলআপের জন্য টাকা নিয়েছে। আমাকে বলল যে ভাই আমি তো বাড়িতে বলতে পারছি না, আব্বুর ভয়ে, এখন তুই একটু ম্যানেজ কর। আমি বললাম, ঠিক আছে, তুই তোর বন্ধুর সাথে ফর্ম ফিলআপটা কর, আমি টাকা পাঠাচ্ছি। আর আজকে এরকম খবর পাব কোনোদিন কল্পনা করিনি।
এ বিষয়ে সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক লিটন ও এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মনিরা জহিরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি।