০১ মার্চ ২০২৬, ১৫:৪৭

নবীন ট্রেইনি ডাক্তারদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী— ‘মমত্ববোধ দিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হবে’

প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল  © সংগৃহীত

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নবাগত রেসিডেন্ট প্রশিক্ষণার্থীদের শপথ অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসকদের শিখতে হবে। শেখার ইচ্ছা থাকতে হবে।

আজ রবিবার (১ মার্চ) রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে নবাগত রেসিডেন্ট প্রশিক্ষণার্থীদের ‘ইনডাকশন প্রোগ্রাম’ বা শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। এতে মোট ১৩০৬ জন রেসিডেন্ট শপথ গ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসকদের শিখতে হবে। শেখার ইচ্ছা থাকতে হবে। ডাক্তারি বিদ্যায় শেখার কোনো শেষ নাই। অনেক জানতে হয়। শেখায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, পেশাগত বিদ্যা ও মানবিক বিদ্যার সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেকে মানবিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রোগীদের প্রতি মমত্ববোধ দিয়ে ভাল ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হবে। রোগীদের যাতে চিকিৎসাসেবার জন্য বিদেশে যেতে না হয় সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।

এ সময় ভারতের বেঙ্গালুরুতে বিনা অপারেশনে সুস্থ হওয়ার গল্প শোনান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঘর থেকে বের হতে পারিনি, বাড়ির ভিতরে ছিলাম। পুলিশ ভিতরে ড্রিল প্রবেশ করে রাইফেল দিয়ে আমার ডান পায়ের ওপর আঘাত করে, আমার ডান পায়ের টেন্ড্রুল ছিড়ে যায় এবং আমি মাটিতে পড়ে যাই, আর উঠতে পারলাম না। নির্বাচনের দিন থেকে আমার বন্ধু এবং অর্থপেডিক্সের চিকিৎসকরা গেলেন এবং সবার সিদ্ধান্ত অপারেশন করতে হবে। কীভাবে অপারেশন করতে হবে সবকিছু দেখালেন। আর আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম, ইবনে সিনাতে ভর্তি হব এবং পরে অপারেশন হবে। এর মধ্যে আমার একজন বন্ধু বললেন, আমি তোমাকে ভারতের বেঙ্গালুরু নিয়ে যেতে চাই, আর আমি যেতে চাইনি। বলল, তুমি চল, তোমার অপারেশন লাগবে না।

তিনি বলেন, আমার স্ত্রী আমাকে অনুরোধ করে পাঠালেন এবং গেলাম। দেখলাম, নরমাল পোশাক পরে একজন চিকিৎসক বসে আছে। আমার পা দেখলেন। আমি চেয়ারে বসা এবং চিকিৎসক ফ্লোরে বসে আছে। চিকিৎসক নিজ হাতে আমার ডান পা দেখলেন এবং নড়াচড়া করলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডাক্তার আমাকে বললেন, এমআরআই করব। আমি বললাম, করান। আমি এমআরআই করলাম, আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পর রিপোর্ট নিয়ে আসলাম। দেখে বললেন, আপনার কোনো অপারেশন লাগবে না, ওকে। আমি বললাম, কী ওকে? আমি দাঁড়াতে পারছি না। চিকিৎসক বললেন, আপনাকে আমি একটা জুতা দেই। চিকিৎসক কাকে যেন ফোন করলেন, জুতা চলে আসল। জুতা পরে আমি হাঁটলাম। চিকিৎসক বললেন, ২১ দিন জুতা পরবেন। বললেন, ২১ দিন পরলেও আপনি দাঁড়াতে পারবেন না এবং ৭ দিনের অনুশীলন দিলেন। ৭ দিন জুতা ছাড়া অনুশীলন করলাম, কোনো অপারেশন লাগে নাই।

সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি কথাটা এই জন্য বললাম, যারা আমাকে অপারেশন করতে বলেছিল, তারা ভালো চিকিৎসক এবং অপারেশনের আগেও যে চিকিৎসা আছে, ওইটা হয়তো জ্ঞানে ছিল না। এজন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসকদের শিখতে হবে এবং শিখার ইচ্ছা থাকতে হবে। ডাক্তারি বিদ্যায় শেখার কোনো শেষ নাই। এবং অনেক জানতে হয়। শেখায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মলিউকুলার ল্যাবরেটরি, আধুনিক লাইব্রেরি ও রেসিডেন্টদের জন্য  আবাসিক হোস্টেল প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস প্রদান করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের জন্য মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চায়। সেই লক্ষ্য পুরণ করতে নবাগত রেসিডেন্টবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সেজন্য রেসিডেন্টগণকে উচ্চতর মেডিক্যাল শিক্ষা জীবনের সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। চিকিৎসাসেবার জ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে গবেষণায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। নিজেকে আন্তর্জাতিকমানের বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবটিকস এর ব্যবহারের বিষয়েও জ্ঞান থাকা জরুরি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ রেসিডেন্টরা আগামীদিনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্তমান সরকারের স্বপ্নযাত্রায় নেতৃত্ব দেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল তার বক্তব্যে মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রেসিডেন্টদেরকে সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। 

বিএমইউ ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, আজকের রেসিডেন্টরা আগামীদিনের জ্ঞানভিত্তিক মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিজেকে গড়ে তুলবেন সেটাই কাম্য। ই-লগ বুক ও ই-আইআরবি চালু, বিএমইউ জার্নাল, আইআরবি এবং ইভিডেন্স বেইসড মেডিসিনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনসহ বিএমইউতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে নবাগত রেসিডেন্টদের আন্তর্জাতিমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে তৈরি করার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। গত ১৫ বছরে বিএমইউতে ৩ হাজার গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে এর মধ্যে গত ৫ বছরে ১১শত গবেষণার ফলাফল ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ইনডাকশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ তৈরি হবেন তাদের প্রধান কাজ দেশের জনগণের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখতে হবে। চিকিৎসাসেবা করাতে গিয়ে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ রোগীরা দারিদ্রসীমার নিচে চলে যায়। তাই কম খরচে কীভাবে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে করে রোগীদের চিকিৎসাব্যয় বর্তমান সময় থেকে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।