ক্লাবের পদ-পদবি দখল নিয়ে মারামারিতে জড়ানোর পর ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এটি বিলুপ্ত করা হয়েছে বলে জানালেও দুটি ক্লাবের কমিটিতে পদ-পদবি ভাগাভাগি নিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মারামারিতে জড়ানোর পর কেন্দ্র থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। শীঘ্রই মেডিকেল ইউনিটটির নতুন কমিটি দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
আজ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা) মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক আদেশে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় বিলুপ্ত ঘোষণা করা হল। শীঘ্রই উক্ত ইউনিটের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
এদিকে এই ঘোষণার একদিন আগে গত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধানী ও মেডিসিন ক্লাবের দখলকে গঠনকে কেন্দ্র করে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রদলের দুটি গ্রুপ। এদিন রাত ৯টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের ভেতর-বাইরে এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দফায় দফায় মারামারি চলে। এতে কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে নাহিদ ইসলাম ও সিফাত নামে দুইজনকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শাখা ছাত্রদল ও কলেজ সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন ক্লাবের কমিটি নিয়ে কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে ছাত্রদলের একটি অংশ ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে। দিনাজপুর সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠজন দাবি করে মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক নুরুজ্জামান সরকার নুর নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। এর ধারাবাহিকতায় সন্ধানী ও মেডিসিন ক্লাব দখলের চেষ্টা চালান তিনি।
নুর মেডিসিন ক্লাবের বর্তমান সভাপতি নাহিদ হাসানকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য ধারাবাহিক চাপ প্রয়োগ করেন। এ কাজে সহকারী হোস্টেল সুপার ডা. রাসেল তার সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কয়েকদিন ধরে নাহিদকে মেডিসিন ক্লাব থেকে পদত্যাগ করে নতুন কমিটি গঠনের জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
এর জেরে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে কলেজের অদূরে হাউজিং শপিং মলে খাবার খেতে গিয়ে ইন্টার্ন ডাক্তার মো. ফারহান শাহরিয়ারের অনুসারী গ্রুপের সঙ্গে ছাত্রদলের আহ্বায়ক নুর ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক পাভেলের গ্রুপের কথা কাটাকাটি হয়। তা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নিলে ৩২তম ব্যাচের সিফাত আহত হন।
পরে রাত ১১টার দিকে নূর পাভেল তাদের অনুসারীদের নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে নাহিদ হাসানের ওপর হামলা চালান। এ সময় জুলাইযোদ্ধা ডা. রুকাইয়া তামান্না নাহিদকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে জীবন নামে একজন তাকে মারতে উদ্যত হয়। পাশাপাশি ঘটনার ভিডিও প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ৩২তম ব্যাচের মিশুক জোরপূর্বক তার হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে। ঘটনার সময় কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. শেখ সাদেক আলী, হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফজলুর রহমান এবং হল সুপার প্রফেসর হাবিবুল্লাহ রাসেল উপস্থিত ছিলেন। পরে ওসি নুর নবী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার জের ধরে রাতে নাহিদ হাসানের কক্ষে আগুন দিয়ে বই-খাতা ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
হামলায় ছাত্রদলের আহ্বায়ক ডা. নূর এবং সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক পাভেলের নেতৃত্বে ২৫তম ব্যাচের জীবন, ৩১তম ব্যাচের হাবিব, ৩২তম ব্যাচের মিশুক ও রিয়াদ এবং ৩৩তম ব্যাচের জাহিন সরাসরি অংশগ্রহণ করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।
তবে এক ফেসবুক পোস্টে ৩২তম ব্যাচের রিয়াদুল ইসলাম রিয়াদ লিখেছেন, আমার সহপাঠী ৩২তম ব্যাচের সিফাত, ফাহিম, অন্তর, মেহেদীর ওপর বহিরাগত ১৫-২০ জন দিয়ে হামলা করায় আমাদের মেডিকেলেরই কিছু সিনিয়র। হামলার সময় উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দেন ৩১তম ব্যাচের নাহিদ ভাই, ২৭তম ব্যাচের মুমিন ভাই ও সজীব ভাই। হাউজিং কমপ্লেক্সে ২ তলার ছাদ থেকে সিফাত ও অন্তরকে ১৫-২০ জনের মত ধরে হামলা চালায়। এ সময় চড়-থাপ্পড়, লাত্থি দিয়ে মারার পরে চেয়ার দিয়ে কোমর ও মাথায় আঘাত করে। সবশেষে সিফাতের গলা ধরে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে ফেলে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হয়।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদল সভাপতি নুরুজ্জামান সরকার ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক পাভেল দাবি করেন, খাবার খাওয়ার সময় কথাকাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত। অন্যদিকে ফারহান শাহরিয়ার অভিযোগ করেন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ থেকেই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আব্দুল হালিম জানান, মেডিসিন ক্লাবের বিরোধ থেকেই সংঘর্ষ হয়েছে। কয়েকজন আহত হয়েছেন। এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. শেখ সাদেক আলী বলেন, মেডিসিন ক্লাব নিয়ে বিরোধের কথা আগে জানা ছিল না। ঘটনার পর প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।