এইচএসসিতে ১৩০০ নম্বর কলেজে, আলিমে ১৭০০; এসএসসিতে ১২৫০, দাখিলে ১৪০০, বড় ‘বৈষম্য’ ১ম থেকে ৮ম শ্রেণিতেও
প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার তুলনায় বেশি নম্বরের সিলেবাসে পড়াশোনা করছে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিভেদে এই ব্যবধান ১০০ থেকে ৪০০ নম্বর পর্যন্ত। ধর্মীয় শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যেই মাদ্রাসার সিলেবাসে অতিরিক্ত বিষয় ও নম্বর যুক্ত করা হয়েছে। তবে বেশি নম্বরের এই পাঠ্যক্রম শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে সিলেবাসের কনটেন্ট অপরিবর্তিত রেখে নম্বর কমানোর সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই করছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।
আলিয়া মাদ্রাসা ও স্কুল-কলেজের সিলেবাস যাচাই করে দেখা যায়, ইবতেদায়ীর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৬ বিষয়ে মোট নম্বর ৬০০; যেখানে সাধারণ শিক্ষায় ৭ বিষয়ে বরাদ্দকৃত মোট নম্বর ৫০০। মাদ্রাসা ও সাধারণে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত এই তিন বিষয়ে ১০০ করে নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। মাদ্রাসায় কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ, আকাইদ ও ফিকহ, আরবিসহ ৩ বিষয়ে ১০০ করে ৩০০ নম্বর বন্টন করা হয়েছে। সাধারণে ৪ বিষয়ে (সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্মশিক্ষা, শিল্পকলা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা) ৫০ করে মোট ২০০ নম্বর বন্টন করা হয়েছে।
এক সময় ঢাবিতে ভর্তিতে বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট বিভাগে ভর্তির জন্য মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের বাদ দিতে বা নিরুৎসাহিত করতে এসএসএসসি ও এইচএসসি স্তরে নির্দিষ্ট নম্বরের (বাংলা ও ইংরেজি ২০০ নম্বর) শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো। এসব শর্তের কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো, ফলে তাদের সামনে অপশন সীমিত হয়ে পড়ত। উচ্চশিক্ষায় এই ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ভর্তি পরীক্ষা বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল নির্দিষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের শর্ত না রেখে সার্বিক যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সুযোগ তৈরি করা জরুরি।— অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে মাদ্রাসা-সাধারণে মোট ৮ বিষয় হলেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১০০ করে মোট ৮০০ নম্বর পড়েন, আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ৮ বিষয়ে মোট ৭০০ নম্বরে পড়াশোনা করে। এ দুই শ্রেণিতে উভয়ের জন্য ৫ বিষয়ে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান) মিল রয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ, আকাইদ ও ফিকহ, আরবি ১০০ করে নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। সাধারণের জন্য ইসলাম শিক্ষায় ১০০ নম্বর, শিল্পকলা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা এই ২ বিষয়ে ৫০ করে নম্বর বরাদ্দ রাখা রয়েছে। অর্থ্যাৎ বিষয় ৮টি হলেও ১০০ নম্বর বেশি বরাদ্ধ রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য।
পঞ্চম শ্রেণি
পঞ্চম শ্রেণিতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ৯ বিষয়ে ৯০০ নম্বর পড়লেও সাধারণের জন্য ৮ বিষয়ে ৭০০ নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এই শ্রেণিতে উভয়ের জন্য ৫ বিষয়ে (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বিজ্ঞান) মিল রয়েছে। এই শ্রেণির মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বাকি ৪ বিষয়ে (কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ, আকাইদ ও ফিকহ, আরবি-১ম, আরবি-২য়) ১০০ করে মোট ৪০০ নম্বরে অধ্যয়ন করছে। সাধারণের শিক্ষার্থীরা বাকি তিন বিষয়ে (ইসলাম শিক্ষা-১০০, শিল্পকলা-৫০, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা-৫০) মোট ২০০ নম্বরে পাঠদান করছে।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি
৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১৩ বিষয়ে ১১০০ নম্বরে, সাধারণের জন্য ১০ বিষয়ে ৮০০ নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এই ৩ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ৮টি কমন বিষয় পড়ছে। এই আট বিষয়ের বাইরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা চার বিষয়ে (কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ, আকাইদ ও ফিকহ, আরবি-১ম, আরবি-২য়) ১০০ করে মোট ৪০০ নম্বরে পড়াশোনা করছে। আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম শিক্ষায় ৫০ নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। আর অতিরিক্ত যেকোনো একটি বিষয় ৫০ নম্বরের সিলেবাসে মাদ্রাসা-সাধারণ শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে। এসব শ্রেণিতেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সাধারণের তুলনায় ৩০০ নম্বর বেশি অধ্যয়ন করছে।
নবম-দশম শ্রেণি (সাধারণ-মানবিক)
মাদ্রাসার নবম-দশম শ্রেণির (সাধারণ) শিক্ষার্থীরা মোট ১৫ বিষয়ে ১৩৫০ নম্বরে, আর সাধারণের (মানবিক) শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪ বিষয়ে ১২৫০ নম্বরের সিলেবাস যুক্ত করা হয়েছে। এই দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ৮ কমন বিষয় পড়ছে। এরমধ্যে ৫ বিষয় ১০০ নম্বর করে, বাকি ৩ বিষয় ৫০ করে অধ্যয়ন করছে তারা। এসব শ্রেণিতে মাদ্রাসার জন্য বাকি ৭ বিষয়ে ১০০ করে মোট ৭০০ নম্বর, সাধারণের জন্য বাকি ৬ বিষয়ে ১০০ করে মোট ৬০০ নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এখানেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১০০ নম্বর বেশি পাঠদান করছে।
নবম-দশম শ্রেণি (বিজ্ঞান)
মাদ্রাসার নবম-দশম শ্রেণির (বিজ্ঞান) শিক্ষার্থীরা ১৪০০ নম্বর পড়লেও সাধারণের বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ১২৫০ নম্বরে অধ্যয়ন করছে। মাদ্রাসা ও সাধারণের শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজির দুই পত্র, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান বা উচ্চতর গণিত কমন বিষয় হিসেবে অধ্যয়ন করছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও এ শ্রেণিতে ১৫০ নম্বর বেশি পড়ছে।
বেশি নম্বরে পাঠদানের কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, এতে অনেক শিক্ষার্থী মাদ্রাসা থেকে ঝরে পড়ছে। সিলেবাস থেকে নম্বর কমাতে হবে। তবে মাদ্রাসার আরবি বা ইসলামের মৌলিক বিষয় থেকে নম্বর কমানোর সুযোগ নেই। তবে জেনারেল বিষয় থেকে যেমন ইংরেজি ও বাংলার ২০০ নম্বর থেকে কমানো যেতে পারে। এমন আরও অনেক বিষয় আছে, যেখান থেকে সরকার কমাতে পারে।—মো. মিজানুর রহমান, অধ্যক্ষ, তা’মীরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদ্রাসা
আলিম (সাধারণ), একাদশ-দ্বাদশ (মানবিক)/ আলিম (বিজ্ঞান) ও একাদশ-দ্বাদশ (বিজ্ঞান)
মাদ্রাসার আলিমের (সাধারণ) শিক্ষার্থীরা ১৫০০ নম্বর, সাধারণের (মানবিক) জন্য ১৩০০ নম্বর সিলেবাসে যুক্ত রয়েছে। এ শ্রেণিতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ২০০ নম্বর বেশি অধ্যয়ন করছেন। আলিমের বিজ্ঞানের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১৭০০ ও সাধারণে একাদশ-দ্বাদশে ১৩০০ নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এ বিভাগেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ৪০০ নম্বর বেশি পাঠদান করছেন।
সবমিলিয়ে প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ৬০০, সাধারণের শিক্ষার্থীরা ৫০০ নম্বর। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জন্য মাদ্রাসা ৮০০, সাধারণ ৭০০। পঞ্চম শ্রেণির মাদ্রাসার জন্য ৯০০ ও সাধারণ ৭০০। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১০০ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ২০০ নম্বরের বেশি সিলেবাসে অধ্যয়ন করছে তারা।
ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির সিলেবাসে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য ১১০০ ও সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য ৮০০ নম্বর সিলেবাসে যুক্ত করা হয়েছে। এ তিন শ্রেণির মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় ৩০০ নম্বর বেশি পড়ছে। নবম-দশম শ্রেণির (সাধারণ-মানবিক) মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ১০০ নম্বর ও বিজ্ঞান বিভাগে ১৫০ নম্বর বেশি অধ্যয়ন করছে।
আলিমের সাধারণ বিভাগের শিক্ষার্থীরা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির (মানবিক) শিক্ষার্থীদের তুলনায় ২০০ নম্বর এবং আলিমের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির (বিজ্ঞান) শিক্ষার্থীদের তুলনায় ৪০০ নম্বর বেশি অধ্যয়ন করছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা শর্ত পূরণ না করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেতেন না। বাংলা ও ইংরেজিতে ২০০ নম্বর না থাকায় তারা বাদ পড়তেন । এ বিষয়সহ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে তুলতে ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম দাখিল ও আলিমে ২০০ নম্বরের বাংলা এবং ইংরেজি মাদ্রাসার সিলেবাসভুক্ত করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড।
আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস সময়োপযোগী হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বুয়েট-মেডিকেলসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে পারছে। যেসব শিক্ষার্থী অনেক পরিশ্রমি ও মেধাবী; তারা এ অর্জন করছে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তবে তারা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হলে তাদের সমস্যাও কেটে যাবে।— অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান, চেয়ারম্যান, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড
জানা যায়, প্রতিযোগিতামূলক এ বাজারে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজের তুলনায় বেশি নম্বরে পড়ছে। তবে উচ্চশিক্ষা কিংবা চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের টিকিয়ে রাখতেই নম্বর বিভাজনে এ অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে। মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র বজায় রাখতেই ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর কনটেন্ট সিলেবাসে যুক্ত করা হয়েছে এবং বিষয়ভিত্তিক ১০০ নম্বরে বণ্টন করা হয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল-বুয়েট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় যুক্ত করতেও জেনারেলের বিষয়গুলোতেও ১০০ নম্বরে বিভাজন করা হয়েছে। এতে সাধারণের তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বেশি নম্বরের সিলেবাসে পড়াশোনা করছে।
বেশি নম্বর ও কনটেন্টের কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য চাপ বা বোঝা তৈরি হলেও সামগ্রিক বাস্তবতায় নম্বর কমানোর সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়েছেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সিলেবাসে অন্যদের তুলনায় নম্বর বেশি রয়েছে, এটার বাস্তবতাও রয়েছে। তবে নম্বর কমানো যায় কিনা তা আমরা যাচাই-বাছাই করছি। নম্বর কমলেও কনটেন্ট কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আর নম্বর কমলে এমন হতে পারে, যে বিষয়ে ১০০ নম্বর, সে বিষয়ে ৭০ করা হতে পারে। তবে এই বিষয়টা মাদ্রাসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট স্কলারসহ অন্যদের সঙ্গে আগে আলোচনা করা হবে। পরে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। এই বিষয়টি এখনো প্রাথমিক একটা চিন্তা-ভাবনা।’
তা’মীরুল মিল্লাত মহিলা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বেশি নম্বরে পাঠদানের কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, এতে অনেক শিক্ষার্থী মাদ্রাসা থেকে ঝরে পড়ছে। সিলেবাস থেকে নম্বর কমাতে হবে। তবে মাদ্রাসার আরবি বা ইসলামের মৌলিক বিষয় থেকে নম্বর কমানোর সুযোগ নেই। তবে জেনারেল বিষয় থেকে যেমন ইংরেজি ও বাংলার ২০০ নম্বর থেকে কমানো যেতে পারে। এমন আরও অনেক বিষয় আছে, যেখান থেকে সরকার কমাতে পারে।
জেনারেল বিষয়ে নম্বর কমালে উচ্চশিক্ষা ভর্তিতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষায় প্রতিযোগিতাকে উন্মুক্ত করতে হবে। যে শিক্ষার্থী তাদের নেয়া ভর্তি পরীক্ষায় পাস করবে তারা ভর্তি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক যে শর্ত রয়েছে, তা সরকার ও সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নিতে হবে। না হলে মাদ্রাসাগুলো দিনে দিনে শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈষম্যমূলক নীতির কারণে মাদ্রাসা বোর্ড ১২টি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত চাপ নিয়ে প্রস্তুতি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল করছে। তাই শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত পটভূমি নয়, মেধার ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে ভর্তি পরীক্ষা আরও উন্মুক্ত ও বৈষম্যহীন করা উচিত।-মো. রফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এ বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস সময়োপযোগী হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বুয়েট-মেডিকেলসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে পারছে। তারা বেশি নম্বরে পাঠদান করেও উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। আমাদের যেসব শিক্ষার্থীরা অনেক পরিশ্রমি ও মেধাবী তারা এ অর্জন করছে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তবে তারা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হলে তাদের সমস্যাও কেটে যাবে। ক্লাসে উপস্থিতির কোনো বিকল্প নেই, এটা শুধু মাদ্রাসা নয়, সব শিক্ষার্থীর জন্যই এ কথা প্রযোজ্য।
তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সাধারণের তুলনায় বেশি নম্বরে পাঠদান করছে। মাদ্রাসার সিলেবাস থেকে নম্বর কমানোর সুযোগ নেই। কারণ প্রতিযোগিতার এ বাজারে টিকে থাকতে হলে জেনারেল বিষয়গুলোর নম্বর যেমন কমানোর সুযোগ নেই, তেমনি ধর্মীয় জ্ঞানের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বিষয়গুলো সিলেবাসে রাখা হয়েছে তা থেকেও বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বাস্তবতা মেনেই আমাদের শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর ড. মো. রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অতীতে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া হতো, তখন মাদ্রাসায় সিলেবাসে ২০০ নম্বরের পরিবর্তে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা ছিল। পরবর্তীতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা স্কুলের সিলেবাস অনুযায়ী ইংরেজি ও বাংলায় ২০০ নম্বরের পরীক্ষা দেওয়া শুরু করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনসহ মোট ১২টি বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে একসময় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সাথে বৈষম্য করা হতো এবং ১০০ মার্কের শর্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি করা হতো।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পরবর্তীতে মাদ্রাসা বোর্ড বিষয়টিকে হ্যান্ডেল করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কনভিন্স করার চেষ্টা করে যাতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতিও তৈরি হয়েছে যে, ভালো কিছু করতে হলে তাদের অতিরিক্ত চাপ নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে অনেকেই চ্যালেঞ্জ জয় করে ভালো ফলাফল করছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে সুযোগ পাচ্ছে। ভর্তি পরীক্ষাকে আরও উন্মুক্ত ও বৈষম্যহীন করা উচিত, যাতে একজন শিক্ষার্থী যে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকেই আসুক না কেন, তার মেধার মূল্যায়নে কোনো বাধা তৈরি না হয়।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও নীতিগত বৈষম্য রয়েছে। এক সময় ঢাবিতে ভর্তিতে বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ করা হয়। অতীতে কিছু নির্দিষ্ট বিভাগে ভর্তির জন্য মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীদের বাদ দিতে বা নিরুৎসাহিত করতে এসএসএসসি ও এইচএসসি স্তরে নির্দিষ্ট নম্বরের (বাংলা ও ইংরেজি ২০০ নম্বর) শর্ত জুড়ে দেওয়া হতো।
এসব শর্তের কারণে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো, ফলে তাদের সামনে অপশন সীমিত হয়ে পড়ত। উচ্চশিক্ষায় এই ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ভর্তি পরীক্ষা বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল নির্দিষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের শর্ত না রেখে সার্বিক যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সুযোগ তৈরি করা জরুরি। যেমন মাস্টার্সে ভর্তি হতে হলে যেকোনো বিষয়ে অনার্স করেই পরীক্ষা দিয়েই ভর্তি হতে পারে। এ নিয়মটা যদি অনার্সের ক্ষেত্রে করা হয়, তাহলে যারা যোগ্য তারা ভর্তি হবে। এককথায় ভর্তি পরীক্ষা উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
ইউটিএলের সদস্য সচিব ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় ধর্মীয় বিষয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া যৌক্তিক। একই ধরনের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যভার ও শিক্ষার সুযোগে যুক্তিসংগত সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। বেশি নম্বর মানেই বেশি জ্ঞান নয়; বরং তা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিষয় ও নম্বর বণ্টন পুনর্বিবেচনা করা দরকার। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, পুনর্বণ্টন করা হলে যাতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য করা না হয়।
বর্তমান সময়ের বিবেচনায় বাংলা ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন জরুরি। তার মতে, সমস্যা সমাধানে সামগ্রিক বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে যেকোনো পত্রের বিষয়বস্তু পুনর্বিন্যাস, নম্বর হ্রাস কিংবা একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ইংরেজিতে কিংবা বা বাংলায় ২০০ নম্বার পড়েনি, এমন অজুহাতে যাতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা না হয়।’