১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:০৮

মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ নেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরই

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা।  © ফাইল ছবি

দাখিল পর্যায় পেরোনোর পরই মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা ঝড়ে যাচ্ছে। কেউ সাধারণ শিক্ষায় কলেজে ভর্তি হচ্ছে, আবার কেউ আলিমে ভর্তি হয়ে অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছেন। গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দাখিলের তুলনায় আলিম পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আরবি বিষয়ে দুর্বলতা ও ভীতি, সিলেবাসের অতিরিক্ত চাপ, উচ্চশিক্ষায় সীমিত বিষয় এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আলিমের পর সাধারণ শিক্ষা ধারায় চলে যাচ্ছে। এতে ফাজিল ও কামিল পর্যায়েও শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ও অন্য শিক্ষা ধারায় চলে যাওয়ার কারণে মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের দাখিল ও আলিম পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দাখিল পর্যায়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আলিমে এসে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে দাখিলে ২ লাখ ৪২ হাজার ৩১৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জন এবং ২০২৬ সালে আরও বেড়ে হয় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮২ জন। বিপরীতে আলিম পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাখিলের তুলনায় অনেক কম। ২০২৪ সালে আলিমে পরীক্ষার্থী ছিলেন ৮৫ হাজার ৫৫৮ জন, ২০২৫ সালে তা কমে ৮২ হাজার ৮০৯ জনে দাঁড়ায়। তবে ২০২৬ সালে আলিম পরীক্ষায় অংশ নেন ৯২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।

তিন বছরের তথ্য বলছে, দাখিল থেকে আলিম পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শিক্ষা ধারার পরিবর্তন করছে অথবা ঝরে পড়ছে। ২০২৬ সালে দাখিল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার হলেও একই বছরে আলিম পরীক্ষার্থী ৯২ হাজারের কিছু বেশি—অর্থাৎ দুই স্তরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যে ব্যবধান প্রায় ২ লাখ।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দাখিল শেষ করার পর প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আলিম পর্যায়ে এসে ঝরে পড়ছে অথবা সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে স্থানান্তরিত হচ্ছে। ফলে দাখিল পর্যায়ে একটি প্রতিষ্ঠানে যেখানে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকে, পর্যায়ক্রমে কামিল বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গিয়ে সেই সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জনে নেমে আসছে।

মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা মো. নুরুল হক বলেন, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে আরবি ভীতি অন্যতম কারণ। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।

তিনি বলেন, টানা পাঁচ বছর আরবি না পড়ে হঠাৎ ষষ্ঠ শ্রেণির জটিল আরবি সিলেবাসের মুখোমুখি হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা গুছিয়ে উঠতে পারে না। ষষ্ঠ শ্রেণির সেই ঘাটতি নিয়ে কোনোভাবে দাখিল পাস করলেও আরবি ব্যাকরণ ও মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতার কারণে আলিমে পড়ার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তারা।

মাদ্রাসার সিলেবাস ও কাঠামোগত সমস্যার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। আরেক মাদ্রাসা শিক্ষক মো. জাহিদ হাসান বলেন, শুধু আরবি ভীতি নয়, অগোছালো সিলেবাসও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

তার ভাষ্য, সাধারণত মেধাবী শিক্ষার্থীরাই দাখিলে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে। তবে তাদের বড় একটি অংশ ভবিষ্যতে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আলিমে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলে সাধারণ কলেজের তুলনায় তাদের অতিরিক্ত আরবি বিষয়ের পড়াশোনা করতে হয়। এতে মেডিকেল বা প্রকৌশল শিক্ষায় যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় বাড়তি চাপের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কলেজে চলে যায়। তাদের অনুসরণ করে সাধারণ বিভাগের শিক্ষার্থীরাও কলেজমুখী হয় বলে জানান তিনি।

উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ কমছে মাদ্রাসায়
সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী তাশফিকুল ইসলাম বলেন, আরবি ভীতির পাশাপাশি অতিরিক্ত বিষয়ের চাপও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়াও বড় কারণ।

তিনি বলেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মাত্র ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। এসব কোর্সও দেশের সব মাদ্রাসায় নেই; নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ মাদ্রাসায় মাত্র দুটি বিষয়ে অনার্স কোর্স রয়েছে, যা মূলত জেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান। উপজেলা পর্যায়ের মাদ্রাসায় এ সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের সনদ নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী নুর আহমেদ বলেন, মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষার সনদের কর্মসংস্থানমুখী মান এবং সাধারণ ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ এখনো সীমিত।

তিনি বলেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মনে করেন, শুধু ইসলামিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিলে পরবর্তী সময়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে। এ কারণে দাখিল বা আলিমের পরই তারা সাধারণ ধারার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এর ফলে আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিচ্ছে।

দেশের শিক্ষাখাতের তথ্য ও পরিসংখ্যান সংগ্রহ, সংকলন এবং প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩-এ দেয়া তথ্যে মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের বিমুখিতার এই চিত্র উঠে এসেছে। সারাদেশে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসা মিলে রয়েছে ৯ হাজার ২৫৯টি। যার মধ্যে উচ্চশিক্ষার কামিল প্রতিষ্ঠান রয়েছে মাত্র ২৭০টি। এর মধ্যে নারীদের জন্য রয়েছে মাত্র ১৬টি। 

এ ছাড়া মাদ্রাসার মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৫০ শিক্ষকের মধ্যে কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৭ হাজার ৩১৯ জন। নারী শিক্ষকের সংখ্যা আরো কম। মাত্র ৭ হাজার ৩১৯ জন।

মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দাখিল থেকে আলিম এবং পরবর্তী সময়ে ফাজিল ও কামিল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে হলে আরবি শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

এ দিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার বদলে স্থানান্তরিত হচ্ছে বলে মনে করছেন ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর। তিনি বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষায় দাখিল ও আলিম পাসের পর শিক্ষার্থীদের ‘ঝরে পড়া’র বিষয়ে প্রচলিত ধারণা সঠিক নয়। শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে না; বরং দাখিল ও আলিম পাসের পর একটি বড় অংশ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে স্থানান্তরিত (শিফট) হচ্ছে। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও একটি বিশাল অংশ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি ইনস্টিটিউটে চলে যায়।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা উল্লেখ করে তিনি জানান, বিগত এক-দেড় দশকের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা দাখিল পাসের পর কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ফাজিল ও কামিল স্তরে প্রায় ৪ লাখ শিক্ষার্থী এভাবে পড়াশোনা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বে প্রশংসনীয় অবদান রাখছে।  তবে প্রান্তিক পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলোতে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব এবং স্কাউটিং বা বিএনসিসির মতো সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

উপাচার্য আরো বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজ করার লক্ষ্যে একনেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ৬৫৪টি মাদ্রাসাকে আধুনিক রূপ দেওয়া হবে। 

তিনি জানান, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার তাগিদে ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা বোর্ড যৌথভাবে ইংরেজি, আরবি এবং জাপানি ভাষা শেখানোর বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।