০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০

পছন্দের প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ সীমিত, বদলি নিয়ে বেশি সংকটে নারী শিক্ষকরা

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর  © টিডিসি সম্পাদিত

বেসরকারি মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির সুযোগ তৈরি হলেও পছন্দের প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত শূন্য পদ না থাকায় অনেকে কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সংকটটি আরও প্রকট। স্বামীর কর্মস্থল, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্বের সঙ্গে চাকরি সমন্বয়ের প্রয়োজন থাকলেও পছন্দের এলাকায় একই পদ ও বিষয়ের শূন্য পদ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বদলির ক্ষেত্রে ‘সমস্তর’ শর্ত।

ময়মনসিংহের নান্দাইল চকমতি ডিএস ফাজিল মাদ্রাসার জীববিজ্ঞানের প্রভাষক মাহফুজা মোর্শেদা এরই একটি উদাহরণ। তার বাবা ও শ্বশুরবাড়ি রাজশাহীতে। স্বামী গাজীপুরে চাকরি করেন। বর্তমান কর্মস্থল ময়মনসিংহ হওয়ায় চাকরি ও পারিবারিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে তার সমস্যা হচ্ছে। তাই স্বামীর কর্মস্থলের কাছাকাছি টাঙ্গাইলে বদলি হতে চান তিনি।

মাহফুজা মোর্শেদা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমার স্বামী গাজীপুরে চাকরি করেন। অন্যদিকে বাবা ও শ্বশুরবাড়ি রাজশাহীতে। তাই বর্তমান কর্মস্থল ময়মনসিংহ থেকে চাকরি করে পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি দাম্পত্য জীবন সামলানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘স্বামীর কর্মস্থলের এলাকায় বদলি হতে চাই। তাহলে চাকরির পাশাপাশি পারিবারিক বিষয়গুলোও সহজে সামলাতে পারব। কিন্তু গাজীপুরে কোনো প্রতিষ্ঠানে আমার বিষয়ের পদ শূন্য নেই। তাই গাজীপুরের কাছাকাছি টাঙ্গাইলের একটি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছি। তবুও কিছুটা কষ্ট কমবে।’

আরেক নারী শিক্ষক মাকসুরাতুম মাখপিয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন। নারায়ণগঞ্জের বিশ্বনবী (স.) ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায় প্রায় ১৯ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর আগে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জে থাকা সম্ভব না হওয়ায় ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। এখন রাজধানী থেকে প্রতিদিন যানজট পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে মাদ্রাসায় দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে।

দীর্ঘদিন পর বদলির সুযোগ আসায় এবার ঢাকার কাছাকাছি কোনো মাদ্রাসায় যেতে চান মাকসুরাতুম মাখপিয়া। তবে তিনি সহকারী অধ্যাপক হওয়ায় উপযুক্ত শূন্য পদ পাওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে বদলি হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

মাহফুজা মোর্শেদা ও মাকসুরাতুম মাখপিয়ার পরিস্থিতি এক নয়। একজন স্বামীর কর্মস্থলের কাছে যেতে বদলি চান। অন্যজন বিবাহবিচ্ছেদের পর ঢাকায় বসবাস করায় রাজধানীর কাছাকাছি যেতে চান। তবে দুজনের সংকটের জায়গা একই পছন্দের এলাকায় উপযুক্ত শূন্য পদ সীমিত।

নারী শিক্ষকদের সংকট যে কারণে বেশি

নারী শিক্ষকদের কর্মস্থল নির্ধারণে শুধু যাতায়াতের দূরত্ব বিবেচনার বিষয় নয়। স্বামীর কর্মস্থল, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব, বাবা-মা বা শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বদলির সময় অনেক নারী শিক্ষক নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেন। কিন্তু সেসব প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত শূন্য পদ না থাকলে তাদের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যায়। এর সঙ্গে ‘সমস্তর’ শর্ত যুক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

‘সমস্তর’ শর্তে সীমিত বদলির সুযোগ

মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪২ হাজার শূন্য পদ প্রকাশ করা হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট থেকে আবেদন শুরু হয়েছে। আবেদন চলবে ৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত। তবে বদলি আবেদনে ‘সমস্তর’ শর্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই শর্তের কারণে একজন শিক্ষক যে স্তরের মাদ্রাসায় কর্মরত, মূলত সেই স্তরের মাদ্রাসাতেই বদলির সুযোগ পাচ্ছেন।

অর্থাৎ, আলিম মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষক আলিম স্তরের মাদ্রাসায় বদলি হতে পারবেন। একইভাবে ফাজিল বা কামিল মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষক অন্য স্তরের মাদ্রাসায় একই পদে শূন্য পদ থাকলেও সেখানে বদলি হতে পারবেন না। ফলে বর্তমান প্রতিষ্ঠানের স্তরের বাইরে একই পদ ও বিষয়ে শূন্য পদ থাকলেও শিক্ষক সেটি পছন্দের তালিকায় রাখতে পারছেন না। এতে বদলির সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও কমে যাচ্ছে।

একই যোগ্যতায় নিয়োগ, বদলিতে স্তরের বাধা

বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের প্রশ্ন, নিয়োগের সময় একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও একই বিষয়ের ভিত্তিতে একজন শিক্ষক আলিম, ফাজিল বা কামিল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে পারেন। তাহলে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর একই পদ ও বিষয়ে শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও শুধু প্রতিষ্ঠানের স্তর ভিন্ন হওয়ার কারণে বদলির সুযোগ থাকবে না কেন এটি তাদের বোধগম্য নয়।

তাদের দাবি, জনস্বার্থে বদলি হলে যোগ্যতা ও পদের সামঞ্জস্য থাকা সাপেক্ষে অন্য স্তরের মাদ্রাসাতেও বদলির সুযোগ দেওয়া উচিত। পরে ইনডেক্স পরিবর্তন, এমপিও বা বেতন-ভাতায় যাতে কোনো জটিলতা না হয়, সে জন্য প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

শিক্ষকদের আশঙ্কা, ‘সমস্তর’ শর্ত বহাল থাকলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক বাস্তবে বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। কারণ একই বিষয়ের শূন্য পদ থাকা এবং সেটি বর্তমান প্রতিষ্ঠানের স্তরের সঙ্গে মিলে যাওয়া—দুই শর্ত একসঙ্গে পূরণ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন।

শর্ত পরিবর্তনের এখতিয়ার অধিদপ্তরের নেই

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বদলির ক্ষেত্রে ‘সমস্তর’ শর্তটি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমে নির্ধারিত বা পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার অধিদপ্তরের নেই।

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ‘সমস্তর’ শর্ত না থাকলে আবেদনের সংখ্যা আরও বেড়ে যেত। এতে প্রতিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করতে দীর্ঘ সময় লাগত। তবে এ শর্তের কারণে অনেক শিক্ষক কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন না এ বিষয়টিও অধিদপ্তরের জানা আছে।

নারী শিক্ষকদের ওপর প্রভাব বেশি

বদলি ব্যবস্থায় ‘সমস্তর’ শর্তের সঙ্গে একই বিষয়ে শূন্য পদের বাধ্যবাধকতা থাকায় নারী শিক্ষকদের একটি বড় অংশ বাস্তব সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে স্বামীর কর্মস্থলের কাছাকাছি যেতে চান এমন নারী শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে।

অন্য বাস্তবতায় থাকা নারী শিক্ষকরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে বদলির সুযোগ থাকলেও পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়ার সুযোগ অনেকের জন্য সীমিত হয়ে পড়ছে।

মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘নারীদের জন্য অবশ্যই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ তাঁদের স্বামী ও উভয় পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তাঁদের বদলির ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান প্রতিষ্ঠানের স্তর বা বিষয়ের শূন্য পদ নয়, পারিবারিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বিবাহিতই নয়, অবিবাহিত কিংবা তালাকপ্রাপ্ত সব নারী কর্মজীবীর জন্য সুবিধাজনক আইন রাখা প্রয়োজন। তাহলেই অংশগ্রহণ বাড়বে। দেশও সমৃদ্ধ হবে।’