২০ বছর ধরে মৃত সহকর্মীর বেতন তোলার অভিযোগে সেই জামায়াত সেক্রেটারি-শিক্ষককে শোকজ
ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মো. ভেলা ওমরিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ২০ বছর ধরে মৃত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ও ইনডেক্স নম্বর ব্যবহার করে দীর্ঘদিন সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলাধীন মো. ভেলা ওমরিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে মৃত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ও ইনডেক্স নম্বর ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগে গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
এ অবস্থায় নিয়োগ-সংক্রান্ত সব মূল কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদিসহ নোটিশ পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে সশরীরে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ও মৌখিক ব্যাখ্যা দিতে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা যায়, তজুমদ্দিন উপজেলার মো. ভেলা ওমরিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ১৯৯৪ সালের ১৩ মার্চ জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান মো. মহিউদ্দিন নামে এক শিক্ষক। পরবর্তীতে তার মৃত্যু হলে পদটি শূন্য হয়ে যায়। এরপর ২০০৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তজুমদ্দিন ডিগ্রি কলেজের অফিস সহকারী মো. মহিউদ্দিন ওই মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি তজুমদ্দিন উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করছেন।
মৃত শিক্ষকের ইনডেক্স ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ২০ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ২০০৫ সালে শিক্ষক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও তথ্য গোপন করে তিনি ২০০৬ সালের নিয়োগে বিধিবহির্ভূতভাবে মৃত শিক্ষকের ইনডেক্স ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে এমপিওভুক্ত বেতন-ভাতা উত্তোলন শুরু করেন। এমনকি ২০২৬ সালের জুন মাসের এমপিও কপিতেও মৃত শিক্ষকের ওই ব্যাংক হিসাব নম্বর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে ।
মাদ্রাসার সুপার মাওলানা মো. নুরুজ্জামান বলেন, “আমি এখানে যোগদানের পর বিষয়টি আমার নজরে আসে। এরপর মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। আমার বিশ্বাস, গত দুই দশকে সরকারের লাখ লাখ টাকা অনৈতিকভাবে উত্তোলন করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং সরকার তার পাওনা অর্থও ফেরত পাবে।
এদিকে গত রবিবার (২ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমার এমপিও ইনডেক্স নম্বর ৬০২৭৮২। নিয়োগের সময় আমার ব্যাংক হিসাব নম্বর ছিল ৪৫৭৭। পরবর্তীতে নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে ৮০৫ নম্বর হিসাবের মাধ্যমে আমি গত ১৬ বছর ধরে বৈধভাবে বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছি। সংবাদে যে ৪৬০৬ নম্বর ব্যাংক হিসাবের কথা বলা হয়েছে, সেই হিসাব থেকে আমি কখনো কোনো বেতন উত্তোলন করিনি।
তিনি বলেন, মূল বিষয়টি হচ্ছে, মৃত মহিউদ্দিন এবং আমার নাম এক হওয়ায় অতীতে অফিসিয়াল তথ্য সংরক্ষণের সময় একটি প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হয়। সেই কারণেই ভুলবশত আমার এমপিও রেকর্ডে ৪৬০৬ নম্বর হিসাব যুক্ত হয়েছিল। এই ভুল সংশোধনের জন্য ২০১১ সালে তৎকালীন মাদ্রাসা সুপারের আবেদনের ভিত্তিতে জেলা শিক্ষা অফিসার, ভোলা মহাপরিচালক বরাবর আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংক হিসাব সংশোধনের সুপারিশ করেন। সরকারি নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ৪৬০৬ ছিল ভুল হিসাব নম্বর এবং ৪৫৭৭ ছিল আমার সঠিক হিসাব নম্বর। অর্থাৎ, এটি ছিল একটি প্রশাসনিক রেকর্ড সংশোধনের বিষয়, কোনো জালিয়াতির ঘটনা নয়।
তিনি আরও বলেন, মৃত ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব থেকে অন্য একজনের দীর্ঘদিন বেতন উত্তোলনের কোনো সরকারি বা অফিসিয়াল প্রক্রিয়া নেই। তাই "মৃত শিক্ষকের হিসাব থেকে ২০ বছর ধরে বেতন উত্তোলন"-এই অভিযোগ বাস্তবতা ও সরকারি নথির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট। আমার ব্যক্তিগত, পেশাগত ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এই অপপ্রচার চালানো হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি কাজী হারুনুর রশিদ বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা একটি তদন্ত টিম গঠন করেছি৷ তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ঘটনার সঙ্গে মাদ্রাসার সুপার জড়িত রয়েছেন। তাছাড়া দীর্ঘ ২০ বছর পর কেন বিষয়টা আলোচনায় আসলো?
এ বিষয়ে তজুমদ্দিন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থ আদায়সহ প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।